ইন্দিরা গান্ধী বহুবার সতর্ক করলেও বঙ্গবন্ধু বললেন…

0
122
Print Friendly, PDF & Email

বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এমন খবরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বহুবার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু আত্দবিশ্বাসী শেখ মুজিব তা আমলে নেননি। ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র’ বা ‘মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা’ গ্রন্থে এমন সব তথ্য ঠাঁই পেয়েছে। ১৯৭৮ সালে আনন্দবাজারের আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত এ বই নিয়ে সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত বলেছেন, গ্রন্থখানি এত দেরি করে বেরোল কেন এ প্রশ্ন তাকে সেদিন অনেকেই করেছেন। প্রশ্নটিকে তিনি সঙ্গত মনে করেন। তার বক্তব্য, এ জন্য তিনি দায়ী নন। দায়ী ভারতের সেদিনের জরুরি অবস্থা। বঙ্গবন্ধু হত্যার আগেই সেখানকার সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সাংবাদিককে রোখা যায় না। চাপা দেওয়া যায় না সত্যকে। জরুরি অবস্থা সেখানে উঠে গেছে। পট পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশেও। দেরিতে পরিশ্রম কিছুটা বেশি হলেও সংবাদ সংগ্রহে আটকায়নি। বইটির ৫৪ পৃষ্ঠায় সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছেন_ “মুজিব খুন হয়ে যাওয়ার পর একটা প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে, একটা চক্রান্ত যে চলছে এ কথা জানা সত্ত্বেও ভারত সরকার মুজিবকে বাঁচানোর জন্য কিছু করল না কেন? ‘৭৭-এর ৩০ নভেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে আমিও এ প্রশ্নটা তুলি তার কাছে। শ্রীমতী গান্ধী আমাকে বলেন, কিছু একটা যে ঘটতে যাচ্ছে আমরাও তা জানতাম। মুজিবকে আমি এ সম্পর্কে বহুবার সতর্কও করে দিই। কিন্তু তিনি বরাবর আমাকে বুঝিয়েছেন, ‘পাকিস্তানের জেল থেকেই যখন বেরিয়ে আসতে পেরেছি, নিজের দেশের জল্লাদদের নিশ্চয়ই এড়াতে পারব।’ এর বেশি কিছু বলতে চাইলেন না শ্রীমতী গান্ধী। একবার কেবল মন্তব্য করলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা বিভাগও খুব সতর্ক ছিল না।’ মুজিব খুন হয়ে যাওয়ার কিছু দিন পর কলকাতায় রুস্তমজির সঙ্গে আমার দেখা হলো। তাকে বললাম, দেখলেন তো তাজউদ্দীনের খবর কত সঠিক ছিল। এরপর তার সঙ্গে আমার ফের দেখা হয় দিলি্লতে মাসতিনেক পর। এই সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগের চার নেতা জেলখানায় খুন হন। রুস্তমজিকে এবার বলতে হলো, হ্যাঁ, তাজউদ্দীনের খবরে ভুল ছিল না। ওই ষড়যন্ত্রে জিয়া আর মোশতাকই ছিলেন নাটের গুরু।” রুস্তমজি ছিলেন সেই সময় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য অনেকের অভিযোগ ছিল, ওই সময়ে ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগ ও তাদের যোগসূত্রগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সোভিয়েত গোয়েন্দা চক্র কী করল তখন? তাদের কেজিবির মতো দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা চক্রও ব্যর্থ হলো কেন? কারও কারও কথা ওদের সঙ্গে শেখ ফজলুল হক মণির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনিও মুজিব পরিবারের হত্যার দিন নিহত হন। সুতরাং ব্যাপারটি বিতর্কমূলক। এসব তর্ক তুললেও ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের দায়মুক্তি ঘটে না। তখন ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে বিশেষ গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বে যে লোকটি ছিলেন তিনি অত্যন্ত জুনিয়র ও কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এর ওপর সেই সময় তিনি ছিলেন ছুটিতে। অবশ্য এই সময়কার বহু ঘটনা অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিতর্কিত এবং অত্যন্ত গোপনীয়। এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনা আদৌ এড়ানো সম্ভব ছিল কি না তার সঠিক উত্তর দিতে পারেন কেবল শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, ওয়াই বি চবন ও তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষাকারী গোয়েন্দা বিভাগ। তার ভাষায়_ বহু ত্যাগ ও দুঃখদায়ক ঘটনার মধ্য দিয়ে ২৫ বছরের তিক্ততার অবসান ঘটিয়ে দুটি দেশের মধ্যে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা আবার বিবর্ণ হয়ে গেল।

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছেন_ “এক নৃশংস হত্যা অভিযান শেষে খন্দকার মোশতাক নফলসহ সাত ওয়াক্ত নামাজ পড়ে রাষ্ট্রপতির আসনে বসলেন। বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি তখন কলকাতায়। খুনি মেজররা সুপ্রিমকোর্টের আরেকজন বিচারপতিকে পাকড়াও করে শপথ অনুষ্ঠান করাল। তাদের দেরি সইছিল না। মন্ত্রিসভা সাজাতে খুনিরা ধাওয়া করল প্রাক্তন মুজিব মন্ত্রিসভার সদস্যদের বাড়ি। তাদেরও জবরদস্তি করে এনে শপথ পাঠ করানো হলো। বাধ্য হয়ে তারা মন্ত্রী হলেন। এদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন একজন, মনোরঞ্জন ধর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় ছিলেন। বাইরের লোককে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ওদের জোর করে রাখা দরকার। কিন্তু জোরজবরদস্তির কাছেও মাথানত করলেন না পঞ্চপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, মনসুর আলী এবং ফণীভূষণ মজুমদার। মাথা নোয়ালেন না বলে তাদের ছেড়ে দিলেন, তা নয়_ নিক্ষিপ্ত হলেন কারাগারে। দেশের ওপর সামরিক আইনের খড়গ ঝুলিয়ে দেশশাসন শুরু করলেন মোশতাক। মুজিব হত্যার পর দিনই জিয়া বকশিশ পেলেন তার কাছ থেকে। জেনারেল সফিউল্লাহকে অপসারণ করে জিয়াকে করা হলো চিফ অব আর্মি স্টাফ এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। আসল ক্ষমতা রইল ‘সপ্ত খুনি মেজরের’ হাতে। এই সপ্ত খুনি কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট থেকে গেল বঙ্গভবনে। তারা প্রশাসনের নীতি-নির্দেশ স্থির করে। এদের নেতা জিয়া। জিয়ার মাধ্যমে সেই নির্দেশ পেঁৗছানো হয় মোশতাকের কাছে। তিনি সেই মতো কাজ করেন। কাজ কীরকম চলছিল? বাংলাদেশে তখন যারা ছিলেন তাদের সেই দুর্বিষহ জীবনের অভিজ্ঞতা ভুলবার নয়। অত্যাবশ্যক সামগ্রী হয় নেই, না হয় দাম তুঙ্গে। আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। চতুর্দিকে ক্ষোভ, গোপনে বিক্ষোভের দিকে এগুচ্ছে দেশ আর মোশতাক চালাচ্ছেন জঙ্গি আইন_ টানা তিন মাসের কারফিউ বজায় রেখে। ‘৭৫-এর অক্টোবরে মোশতাক সংসদ সদস্যদের ডাকলেন বঙ্গভবনে। ২৯০ জন সদস্যের মধ্যে ১৪০ জন হাজির হলেন অধিবেশনে। খুনি চক্র পরিবেষ্টিত মোশতাক প্রবেশ করলেন সভাকক্ষে। কিন্তু তাকে সম্মান দিতে উঠে দাঁড়ালেন না কেউ। চোটটা হজম করতে চেষ্টা করছিলেন মোশতাক। কিন্তু কাহাতক পারবেন? তিনি আসন গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সদস্যরা মুজিব হত্যার জবাব চাইতে শুরু করলেন। মুজিব হত্যার জন্য তাকেই দায়ী করলেন। তারা হত্যার বিচার চাইলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মোশতাক বৈঠক স্থগিত করে চলে গেলেন। আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে সে রাতেই সংসদ ভেঙে দিলেন। গুনে গুনে সে রাতেই ৭৫ জন এমপিকে গ্রেফতার করা হলো।” বইটির ১৮ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন_ ‘স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মোশতাককে সরিয়ে দেন। মুজিবনগরের ষড়যন্ত্রে তিনি ঢুকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধকালে ঢিলেঢালা পাকিস্তানি কনফেডারেশনের মধ্যেই বাংলাদেশকে রাখবার জন্য ইয়াহিয়ার সঙ্গে মোশতাকের ষড়যন্ত্রটা ফাঁস হয়ে যায়। স্বাধীন হয়েই তিনি কোনোরকম মার্কিন সাহায্য নেওয়ার বিরোধিতা করে বিবৃতি দিলেন। মার্কিন প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত সেই বার্তা দেশের মানুষকে দিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হারিয়ে মোশতাক কয়েক দিন হম্বিতম্বি করলেন কিন্তু তাতে কেউ কান দিল না। এবার তিনি গেলেন বেগম মুজিবের কাছে তাজউদ্দীনের নামে বিষ ঢালতে। বললেন, তাজউদ্দীন মুজিবের মুক্তি চাইছে না, তার ভয় মুজিব এলেই প্রধানমন্ত্রী পদ খোয়াতে হবে। আর সেটি ওই ক্ষমতালোভী লোকটা হতে দেবেন না। ভদ্রমহিলা বোধহয় বিশ্বাস করলেন কথাটা। তার পরিবারের অন্যরাও সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল তাজউদ্দীন সম্পর্কে। এককথায় তাজউদ্দীনকে আর বিশ্বাস করছে না মুজিব পরিবার। এদিকে মুজিব ফিরে এলেন, তাজ সানন্দে তাকে বরণ করলেন নেতৃত্বে। মুজিব প্রধানমন্ত্রী হলেন। আর মোশতাক? না, মুজিবও যেন তাকে ভরসা পাচ্ছেন না। পররাষ্ট্র দফতরের বাইরেই তাকে থাকতে হলো। ক্ষুব্ধ মোশতাক খুব চালাক লোক। উচ্চবাচ্য করলেন না। মুজিবের তখন প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা। তাই তিনি ডুবসাঁতার দিলেন। তার কাজ হলো মুজিব আর তাজউদ্দীনের মধ্যে অবিশ্বাসের ঘোলা জল তৈরি করা। আড়াই বছরের অক্লান্ত কসরতে মোশতাকের উদ্দেশ্য হাসিল হলো। ‘৭৪-এর শেষে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত এমপি আর পুলিশ অফিসারের চাপের কাছে নতি স্বীকার করলেন মুজিব। তাজউদ্দীনকে সরিয়ে দিলেন মন্ত্রিসভা থেকে। একজন মহান আদর্শবান মানুষ বিদায় নিলেন। সংগ্রামের দিনে যিনি শত দুঃখ বরণ করেছেন স্বাধীনতার জন্য, বিপদে দায় নিয়েছেন কাঁধে, গত ১৫ বছর ধরে যিনি ছিলেন মুজিবের ছায়াসঙ্গী, সংকটে দিয়েছেন সৎ পরামর্শ, যার আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত সেই বিপদের বন্ধুকেই বিদায় দিলেন বঙ্গবন্ধু! সেদিন মোশতাক শিবিরে কী উল্লাস! দলের নেতৃত্বে একধাপ ডিঙিয়ে গেলেন তিনি। আর মুজিব? ছাঁটাই করলেন নিজেরই একটা ডানা।’ সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছেন_ “সে দিনটি আমার আজও চোখের ওপরে ভাসছে। দ্রুতগতিতে এক সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলো নতুন গণভবনে। বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করবেন। উত্তেজনাময় পরিবেশ। ক্যাবিনেট সচিব তৌফিক ইমামকে দেখা যাচ্ছে একগাদা অফিসারের সঙ্গে ফাইল নিয়ে ছোটাছুটি করতে। সাংবাদিকদের তদারকিতে ব্যস্ত লিয়াজোঁ অফিসার তোয়াব খান। এমন সময় মুজিবের প্রবেশ। গোয়েন্দা দফতরের প্রধান ছুটে গেল তার কাছে। নিবেদন করল, স্যার, তাজউদ্দীন সাহেব তার সমর্থকদের নিয়ে আত্দগোপন করে আছেন, এড়িয়ে যাচ্ছেন পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে। স্বভাবসুলভ হাঁক দিলেন মুজিব। আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘জেন্টেলম্যান, তাজউদ্দীনকে আমি পদত্যাগ করতে বলেছি, যদি সে তা না করে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করব।’ কথাগুলো বলে চিরচেনা পাইপে দমকা টান দিলেন। দরজায় তখন আরেক মূর্তি ফাইল হাতে হাজির। তাকে দেখেই বললেন, ‘কী চাই তোমার, হাতে কী নিয়ে এলে?’ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি তৌফিক ইমাম নরম সুরে কথা বলার লোক। ধমকে মিইয়ে গিয়ে বললেন, ‘হুজুর, অর্থমন্ত্রী পদত্যাগপত্রে সই লাগিয়েছেন। তার বাড়ি যেতেই আর দেরি করেননি। সেটি আপনার সামনে পেশ করতে এসেছি হুজুর।’ একটা গম্ভীর পরিবেশ। আমরা কেবল এ-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি। ‘৭২-এর জানুয়ারির সেই দিনগুলো আমি ভুলতে পারি না। মুজিব কেবল দেশে ফিরেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শপথ অনুষ্ঠান হচ্ছে বঙ্গভবনে। তাজউদ্দীন সপরিবারে সে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন। তার মুখাবয়ব আনন্দে উজ্জ্বল। হেসে হেসে সবার সঙ্গে কথা বলছেন। অনুষ্ঠান শেষ হলে ভারতীয় সাংবাদিকদের কাছে এগিয়ে তিনি বললেন, ‘আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। আমাদের নেতা যখন কারান্তরালে, তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পেরেছি, মুক্তিযুদ্ধে সফল হয়েছি, প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলাম তারই অপেক্ষায়। আজ তার যোগ্য হাতে সে দায়িত্ব দিতে পারলাম, এই আমার আনন্দ যত নগণ্যই হোক, ইতিহাসে অন্তত এইটুকু স্থান আমার রইল’।” সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের মন্তব্য_ ‘হায়, ইতিহাস! তিন বছর পর সেই তাজকে তাড়িয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধু। তাজের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী জনগণ হারাল মন্ত্রিসভায় তাদের পরম বন্ধুকে। জাতীয়তাবাদী কণ্ঠ ক্ষীণতর হলো ক্যাবিনেটে। বঙ্গবন্ধু যুক্তরাষ্ট্র সফরের অব্যবহিত পরেই তাজউদ্দীনের অপসারণ ব্যাপারটার মধ্যে কেমন একটা কুৎসিত চক্রান্তের আভাস মেলে। সেদিন মুজিব জানালেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর করার জন্য সরকার এবার নতুন ব্যবস্থা নেবে। এর পরই সংবাদ সম্মেলন শেষ করে দিলেন। আমরা বেরিয়ে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই খন্দকার মোশতাক আহমদ, কে এম ওবায়দুর রহমান, তাহের উদ্দিন ঠাকুরদের দেখা গেল সদলবলে মুজিবের ঘরে ঢুকতে। পরদিন ঢাকার বেশ কয়েকটি খবরের কাগজ একযোগে আক্রমণাত্দক বিষোদগার করল তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য সব দায় তাজউদ্দীনের_ এই তাদের জেহাদের জিগির। মুজিবনগর দক্ষিণপন্থিদের দখলে গেল। চক্রান্তকারীরা এবার দাবড়ে বেড়াতে লাগল জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে। তাজউদ্দীনের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হলো ইতিহাসের এক অধ্যায়। এর পরের অধ্যায়? মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, যা সাম্প্রতিককালের ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায়।’ বইটিতে বারবার দেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা আর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। ২৪ পৃষ্ঠার এক জায়গায় লিখেছেন_ ‘৭৩-এর প্রথম দিকে এক বিকেলে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক বঙ্গভবনের ব্যালকনিতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলছি। সামনে সবুজ লনে অস্তমিত সূর্যের রঙ। সেদিন অনেক গল্পের মধ্যে বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, ‘জানো, বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়া কঠিন কাজ, কিন্তু একবার চড়ে বসলে তার পিঠ থেকে নামা আরও কঠিন। হয় তুমি বাঘকে বাগ মানিয়ে রাখবে, না হয় বাগে পেলে সে তোমায় খেয়ে ফেলবে। মাঝামাঝি কোনো উপায় নেই।’ আবার চুপ। বললেন, ‘এবার আমায় বলো আমার প্রশাসনের কোথায় ত্রুটি?’ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন স্যার। আপনার দিলটা শেরেবাংলা ফজলুল হকের মতো, মায়ের হৃদয়। আপনি যদি শাহানশাহ আওরঙ্গজেবের মতো নির্মম হতে পারতেন, অনেক কাজ করতে পারতেন এ দেশে।’ আরেকজন সাংবাদিক এবার ভরসা পেয়ে বললেন, ‘কাদের প্রতি দয়া দেখাচ্ছেন আপনি ভেবে দেখছেন না স্যার। ওরা সব বিষাক্ত সাপ।’ এবার মুজিব চেঁচিয়ে উঠলেন। “তোমরাই তো আমাকে শেষ করে দিয়েছ। কেন আমায় ‘জাতির পিতা’ বানালে?” পাইপটা টেবিলে টুকে রেখে দিলেন। বললেন, ‘দেখ চিলিতে ওরা আলেন্দেকে শেষ করেছে কিন্তু অত সহজে আমাকে সরানো যাবে না। নিজে থেকে যদি আমি কখনো সরে আসতে চাই তখন সেনাপ্রধানরা এসে বলবে, এতদিন আপনি সরকার চালিয়েছেন। এখন ক্লান্ত। এই কাগজে সই করুন। চিরদিন আপনি জাতির পিতা হয়ে থাকবেন। এভাবেই তারা আমার সইটি বাগাবে। তারপর কী হবে বুঝবে। তোমাদের মতো জাতীয়তাবাদীদেরই আগে জবাই দেবে তারা। তখন আমার মূল্য বুঝবে যখন আমি থাকব না। এখন সবাই চালার তলায় আছে। চালা না থাকলে বুঝতে পারবে বাইরের তুফান কী ভয়ঙ্কর আক্রমণ করে।’ কিছু দিনের মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকায় এলেন। ২২ ঘণ্টার সফর শেষে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি কথা বললেন, তা কেবল মুজিবের প্রশংসা। তাজউদ্দীনের প্রস্থান ও কিসিঞ্জারের মুজিব-প্রশস্তি কেমন যেন তাৎপর্যময় মনে হয়েছিল সেদিন অনেকের। তাজউদ্দীনের বাড়িতে বসে কিসিঞ্জারের ঢাকা সফর নিয়ে একদিন কথা হচ্ছিল। দেখলাম তাজউদ্দীনের খুব লেগেছে। ক্ষুব্ধ। বললেন, ‘কিসিঞ্জারের আগমনে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মার্কিন দূতাবাস দুটো পার্টি দিল। সব এমপিই আমন্ত্রিত ছিলেন। আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। আমাকে বাদ দিয়েছে দুঃখ নেই কিন্তু আমার কিসিঞ্জারের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল। তাকে শুধু বলতাম, দেখে যান, আপনাদের সব বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ স্বাধীন’।”

শেয়ার করুন