গুলশান-বনানীতে সরকারি জমি দখলের মচ্ছব

0
58
Print Friendly, PDF & Email

বনানীতে সরকারি শিল্প ঋণ সংস্থার ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি হরিলুটের মচ্ছব চলছে। দুটি সরকারি সংস্থাসহ ১২টি গ্রুপ ওই জমির মালিক দাবিদার সেজেছে। সেখানে সকালে আনিসুর রহমান নামে এক মালিকের সাইনবোর্ড ঝুলছে তো বিকালেই টাঙানো হচ্ছে আরেক মালিকের ব্যানার। রাতে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রটি বেড়া-সাইনবোর্ড ভেঙে বঙ্গবন্ধুর বিশালকায় ছবি টাঙিয়ে পুরো জায়গা জবরদখল করলেও রাত পোহালেই আবার জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে রাজউক। আবার দুপুর না গড়াতেই চলে জবর-দখলবাজদের দাপট।

বনানীর গাউসুল আজম মসজিদ ঘেঁষেই আলোচিত ৪৪ কাঠা জমির অবস্থান। অবৈধ দখলদার গ্রুপগুলো সমঝোতার মাধ্যমে পুরো জায়গা এখন হজম করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, দখলদার-বেদখলদার সবার সঙ্গেই সহযোগিতা করে থাকে বনানী থানার পুলিশ। থানার অফিসার ইনচার্জ ভূইয়া মাহাবুব জানান, জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের, কিন্তু বিরোধকে কেন্দ্র করে যাতে আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কোনোরকম অরাজকতার সৃষ্টি না হয় সে জন্য পুলিশ অকুস্থলে হাজির থাকে শুধু। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা এভাবেই সমঝোতার ভিত্তিতে দখলদার-বেদখলদার সেজে কৃত্রিম সংঘাত-সংঘর্ষে জড়ায়, পরস্পরবিরোধী মামলা মোকদ্দমারও সূত্রপাত ঘটায়। একপর্যায়ে কথিত সমঝোতার মাধ্যমে সরকারি জায়গা-জমি লুটে ভাগ-বণ্টন করে নেয়। এ রকম স্টাইলে মাত্র ১৫ বছরে গুলশান-বনানীতেই ২৫০ একর সরকারি জমি জবরদখল হয়ে গেছে। এসব জমির বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ৭০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি জায়গা জবরদখলের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে গুলশান-বনানী ও বারিধারা লেকের ওপর। সম্প্রতি আবারও বনানী লেকের চারপাশে রাবিশ ফেলে একটু একটু করে ভরাট করেই দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহাখালীর ৫৪ নম্বর প্লটটি অ্যালোটিদের থেকে ক্রয় করে ইউনাইটেড ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০১ সালে তেলবাহী জাহাজ ক্রয়ের জন্য ওই প্লটটি মর্গেজ রেখে শিল্প ঋণ সংস্থা থেকে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ২০০৭ সাল পর্যন্ত অনাদায়ী পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় তিন কোটি টাকা। এ সংক্রান্ত একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার দ্বিতীয় অর্থ ঋণ আদালত ওই জমি নিলামে বিক্রি করার রায় দেন। শিল্প ঋণ সংস্থা যথারীতি নিলাম বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে নিলাম বিক্রি সম্পন্ন করার ব্যাপারে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এ সুযোগে ফাঁকা পড়ে থাকা প্রায় ৪৪ কাঠা জমি জবরদখল করে নেয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা। মাসুদ, তনু খান, মাহবুব আলম পনু, নাসিম গাজী, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদ, দুলালসহ ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট ওই জায়গায় শতাধিক দোকানপাট, হোটেল রেস্তোরাঁ, গাড়ির গ্যারেজকে বরাদ্দ দিয়ে এককালীন কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও প্রতি মাসে দোকানপ্রতি ৮-১০ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করেও নেওয়া হচ্ছে। ১/১১-এর পর যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করে জায়গাটি রাজউককে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু ২০০৮ সালে নির্বাচনের পর পরই আবার জায়গাটি স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র জবরদখল করে নতুন করে দোকানপাট গজিয়ে তোলে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দখল পাল্টা দখলের মচ্ছব।

গুলশান-বনানীতে শুধু যে ফাঁকা পড়ে থাকা জায়গা-জমিই জবরদখল হয়ে যাচ্ছে তাই নয়, সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানার বাড়িঘরও দখল করে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা। গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হাজার কোটি টাকা মূল্যের সরকারি ১৮টি বাড়ি নামমাত্র মূল্যে দখল করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজউকের সহায়তায় ১৮টি বাড়ি বরাদ্দের দুর্নীতি নিয়ে ২০০৭ সাল থেকেই দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। এ ঘটনায় জড়িত তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব এস এম জাফর উল্লাহ ও শহীদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ১/১১-এর পর স্বপদে বহাল থাকা অবস্থায় গ্রেফতার হন দুই সচিব। মতিঝিল থানায় মামলা (১৪০/০৭) দায়ের হলে আসামি হন সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাস, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী। এর ফলে দুদকের সঙ্গে আমলাদের টানাপড়েন শুরু হয়, একপর্যায়ে থেমে আছে সবকিছু। বাড়িগুলো দখলমুক্ত হয়নি আজও। বনানীতে টিঅ্যান্ডটিসহ তিনটি সরকারি সংস্থার শতাধিক একর জায়গা জবরদখল করে গজিয়ে ওঠা কড়াইল বস্তি আরও স্থায়িত্ব পেতে বসেছে। সেখানে টিনের অস্থায়ী দোচালা ঘরগুলো ভেঙে নির্মাণ করা হচ্ছে দোতলা-তিন তলার পাকা ভবন। বনানী থানা পুলিশকে ঘরপ্রতি ৮০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েই দোতলা তিন তলা ভবন নির্মাণের মৌখিক অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে অহরহ। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, পুলিশের মৌখিক সম্মতি ও চাঁদা প্রদান প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে তিন শতাধিক বিল্ডিং বাড়ি তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। রাজউক নিয়ন্ত্রিত গুলশান ১৫ নম্বর রোডের কর্নার প্লটে এক বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা আলিশান একটি বাড়ি সম্প্রতি রাতের অাঁধারে এক ব্যবসায়ী জবরদখল করে নিয়েছেন। মূল মালিকের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে স্থানীয় যুবলীগের দুই নেতা বাড়িটি নামমাত্র মূল্যে ওই ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। প্লটটির দখলদারিত্ব নিশ্চিত করতে ওই ব্যবসায়ী মধ্যরাতে জমিটি দখল করেই একটি পত্রিকার নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন। গুলশান থানা সংলগ্ন উত্তর পাশের প্লটটি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে গোপন দেনদরবার চলছে। এভাবেই মূল অ্যালোটিদের অবর্তমানে বহু মূল্যবান ২৩টি প্লট দখল করে রেখেছে বিভিন্ন চক্র। রাজউকের সহায়তা নিয়ে জাল দলিল তৈরির ফন্দিফিকির করেও শেষ রক্ষা হয়নি। অথচ সরকারি জায়গা-জমি, গড়ে তোলা বাড়ি ঠিকই ব্যবহার করছে অবৈধ দখলদাররা। গুলশান-১ ও ২ নম্বর এভিনিউয়ে আরও অন্তত ৯টি বড় বাড়ি বরাবরই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন দখলদারিত্ব বজায় রাখে, আগাম জামানত ও ভাড়ার টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। মহাখালী মৌজাতেই শহীদ তাজউদ্দীন সরণিতে পেট্রোল পাম্প ঘেঁষে সড়ক ও জনপথের প্রায় ১৫ শতাংশ জায়গা ওয়ার্কশপ নির্মাণের নিমিত্তে লিজ দেওয়া হয়, সেখানেই এখন বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সেখানে দ্বিতল মার্কেট ভবন গড়ে তুলেছে। বর্তমানে চলছে আরও বড় আকারে ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা। সড়ক ও জনপথ অধিদফতর থেকে কড়া নোটিস এবং ইজারা বাতিলের হুমকি পাঠিয়েও বহুতল ভবন নির্মাণ থামানো যাচ্ছে না। অথচ নিয়ম ভঙ্গ করে সরকারি জমি আত্দসাৎ চেষ্টার অভিযোগে তার ইজারা বাতিলও করা হচ্ছে না। এসব ব্যাপারে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট) হেলাল উদ্দিন জানান, গুলশান-বনানীতে জায়গা-জমির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় দখলবাজির ঘটনাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। সেখানে সরকারি জমির চেয়ে রাজউক থেকে বরাদ্দ পাওয়া জমি, প্লট জবরদখলের ঘটনাই বেশি ঘটে থাকে।

 

শেয়ার করুন