৫ জানুয়ারি ছিল তামাশার নির্বাচন : হাইকোর্ট বেঞ্চে ব্যারিস্টার রফিক

0
29
Print Friendly, PDF & Email

প্রবীণ আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের কথিত নির্বাচন আইনের চোখে কোন নির্বাচনই নয়। এটা ছিল একটি তামাশার নির্বাচন। নির্বাচন নয় এটা ছিল সিলেকশন। এটা ছিল এমন একটি ফুটবল খেলা যাতে কোন গোলকিপার ছিল না। আমাদের সংবিধান সরাসরি নির্বাচন না করে কাউকে পার্লামেন্টের সদস্য করার অনুমোদন দেয় না। সংবিধানের ৬৫ (২) অনুচ্ছেদে একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, সিলেকশন নয়।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে  লিখিত বক্তব্যে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এ কথা বলেন। বিনা প্রতিপ্রন্দ্বিতায় নির্বাচন সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের একটি ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানিতে এ্যামিকাসকিউরি হিসেব ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার এ লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন। এ বিষয়ে তিনি আগামী ৮জুন রোববার আদালতে বক্তব্য পেশ করবেন বলে জানা গেছে। এছাড়া অপর এমিকাস কিউরি আজমালুল হক কিউসি তার লিখিত বক্তব্যও আগামী সপ্তাহে দাখিল করবেন বলে জানা গেছে।
আদালতে দাখিল করা লিখিত বক্তব্যে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আমাদের সংবিধান এমন নির্বাচনের কথা বলে না যেখানে একজন মাত্র প্রার্থী থাকবে। উদ্ভুত অবস্থার বিবেচনায় সরকার ক্ষমতায় এসে আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিবে, এমন ধারণা করা হয়েছিল। আমি আশা করি অতিদ্রুত একটি অর্থবহ অবাধ, সুষ্ঠ এবং অর্থবহ নির্বাচন হবে। আমরা দেশের সার্বিক অবস্থা অবজার্ভ করছি, রাজনৈতিক দলের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠ একটি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সময় কোন ফ্যাক্টর নয়। এমন কি বিগত উপজেলা নির্বাচনও সরকারী দলের ইনফুযেন্সে অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আন্তরিকভাবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান, এই অবস্থায় তা সম্ভব হচ্ছে না। আমি মনেকরি আগামী দুইবার অন্তরবর্তী সরকার বা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচন হতে পারে। এ বিষয়ে আমি ড. কামাল হোসেনের সাবমিশনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক মত।
এর আগে গত ২৯ মে এবং ৪জুন দুই দিনে সংবিধান প্রনেতা ড.কামাল হোসেন তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য উপস্থাপনের পরে বুধবার সুজনের বদি-উল আলম মজুমদার তার বক্তব্য পেশ করেন।
এ্যামিকাসকিউরির বক্তব্যে বুধবার ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ক্রটিযুক্ত। তাই আরেকটি নির্বাচন চাই। না হয় জনগণ এবং ইতিহাস আমাদের মা করবে না। অবাধ ও নিরপে নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারি প্রেসে মুদ্রিত গেজেট প্রকাশ করাই নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। যে নির্বাচনে ৮০ ভোটার অংশ নেয় না সে নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যায় না। সংবিধান কখনও গুরুত্বহীন দলিল নয়। বাংলাদেশে এখন প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র নেই। নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আর নির্বাচন হয়ে গেছে বলে পাঁচ বছর বসে থাকার সুযোগ নেই। এ মামলায় যদি সমাধান না হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনের এখনও সুযোগ রয়েছে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ চাওয়া।
বিনা প্রতিপ্রন্দ্বিতায় নির্বাচন সংক্রান্ত মামলায় গত ১২ই মার্চ হাইকোর্ট এ্যামিকাসকিউরি নিয়োগ দেন। ড. কামাল হোসেন ও বদিউল আলম মজুমদার ছাড়াও রয়েছেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটনি জেরারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, মাহমুদুল ইসলাম, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
বিনা প্রতিপ্রন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধানের বৈধতা নিয়ে গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ নিয়ে রুল জারি করেছিল। জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আবদুস সালামের দায়ের করা রিট আবেদনে হাইকোর্ট ওই রুল জারি করে। রিট আবেদনের পে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম।
রিট আবেদনে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারা অনুসারে, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিপ্রন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা যায়। এেেত্র ‘না’ ভোটের কোন বিধান রাখা হয়নি। অথচ সংবিধান স্পষ্ট বলছে, জনগনের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদ গঠিত হবে। জনগনের ভোটাধিকার প্রয়োগ ছাড়া কাউকে নির্বাচিত ঘোষণা করা সংবিধানের পরিপন্থী।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারা সংবিধানের ৭, ১১, ২৭, ৩১, ৬৫ (২), ১২১ ও ১২২ (২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল মতার মালিক জনগন; এবং জনগনের পে সেই মতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কতৃত্বে কার্যকর হইবে।’ সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্য নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিন শত সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত হইবে; সদস্যগণ সংসদ-সদস্য বলিয়া অভিহিত হইবেন।’ ১২২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকার-ভিত্তিতে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিপ্রন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ক চলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলছে, নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগনের মতামতের প্রতিফলণ হয়নি।
এককভাবে বিনা প্রতিপ্রন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত করা সংক্রান্ত ১৯ ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চেয়েছেন আদালত। ১০ দিনের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদসচিব, আইনসচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবকে জবাব দিতে বলা হয়।

শেয়ার করুন