আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি

0
40
Print Friendly, PDF & Email

দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। প্রতিদিনই ঘটছে খুন-জখমসহ নানা অপরাধের ঘটনা। হবিগঞ্জ থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল অস্ত্র গোলাবারুদ। এতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন জেগেছে, এত বিপুল অস্ত্রগোলাবারুদ ওখানে এলো কী করে? অনুসন্ধানে দেখা গেছে নৃশংস খুনখারাবির বেশির ভাগ ঘটনার সাথেই কোনো-না-কোনোভাবে জড়িয়ে পড়ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। চলছে টেন্ডারবাজি ও দখলবাজি। কোনো কোনো নৃশংস ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে আলোচনা। এ দিকে আলোচিত এসব ঘটনায় জড়িত মূল হোতারা গ্রেফতার না হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের ঘটনায় এখনো গ্রেফতার হয়নি মামলার মূল আসামিরা। ফেনীর উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যারও অন্যতম পরিকল্পনাকারী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গির কবির আদেল এবং অপর নেতা জিয়াউল আলম মিস্টারকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তবে পুলিশের আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তিনি বলেছেন, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করছে।
গত কয়েক দিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই ঘটছে খুনসহ নানা অপরাধের ঘটনা। গড়ে এখন প্রায় ১৪ জন খুন হচ্ছে প্রতিদিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতি সম্প্রতি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে অপহৃত হন নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও সিনিয়র আইনজীবী চন্দনকুমার সরকারসহ সাতজন। চার দিন পরে তাদের লাশ উদ্ধার হয় শীতলক্ষ্যা থেকে। এ দিকে অপহরণের পরই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর হোসেন, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন, নজরুলের চাচাশ্বশুর হাসমত আলী হাসু, নূর হোসেনের সহযোগী ইকবাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় মামলা করা হয়। ব্যাপক আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে ইতোমধ্যে র‌্যাবের মেজর আরিফ গতকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এই ঘটনায় র‌্যাবের অপর দুই কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক মোহাম্মদ সাঈদ এবং এম এম রানা এখনো রিমান্ডে আছেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যার ঘটনায় এখনো গ্রেফতার হয়নি মামলার মূল আসামিরা। কাদের নির্দেশে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে তা এখনো উদঘাটন করতে পারেননি মামলার তদন্তকারীরা।
এ দিকে গত ২০ মে ফেনীতে নৃশংসভাবে খুন করা হয় ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামকে। সূত্র জানায়, এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। এই ঘটনায় ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নাম জড়িয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েক নেতা গ্রেফতারও হয়েছেন। তবে এখনো গ্রেফতার হয়নি জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গির কবির আদেল এবং অপর নেতা জিয়াউল আলম মিস্টার। সূত্র জানায়, এই ঘটনায় ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর নাম জড়িয়ে পড়লেও অজ্ঞাত কারণে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত শনিবার পাবনায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্থানীয় আওয়ামী লীগের চার নেতাকর্মী। দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন আহত হন।
সূত্র জানায়, এভাবেই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। চাঞ্চল্যকর প্রায় প্রতিটি ঘটনার সাথেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দেশজুড়ে খুন-গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মে মাসে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৭৪৬ টি। সারা দেশে পৃথক ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫২০ জনের এবং আহত হয়েছে এক হাজার ১২৫ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৩৫ জন ও আহত হয়েছে ১১৭ জন। বিএমবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশজুড়ে খুন-গুমের ঘটনা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় জনমনে সীমাহীন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ জন নিহত এবং ৪১২ জন আহত হয়েছে। অধিকার জানায়, মে মাসে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৩১টি। এতে দুইজন নিহত এবং ২৩১ জন আহত হয়েছে। অধিকার জানায়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে দুর্বৃত্তায়নের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গণপিটুনিতেও মানুষ হত্যার ঘটনা বেড়ে চলছে। মে মাসে দেশে ১১ জন গণপিটুনিতে খুন হয়েছে। ৬১ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৯ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দুইজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ছয় শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ইদানীং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও মারাত্মকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে অস্ত্র উদ্ধারও হচ্ছে। হবিগঞ্জের সাতছড়ির গভীর জঙ্গল থেকে গত রোববার থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ৪০ মিলিমিটারের ২২২টি কামান বিধ্বংসী রকেট, ২৪৮টি রকেট চার্জার, একটি রকেট লঞ্চার, চারটি ৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার মেশিন গান, খালি ব্যারেল পাঁচটি, ১২ দশমিক ৭ মিলিমিটারের এক হাজার ২২২টি গুলি, ৭ দশমিক ৬ মিলিমিটারের ১১ হাজার ৬৬৭টি গুলি, ১৯টি ম্যাগজিন, দুইটি বেল্ট ও আগ্নেয়াস্ত্র পরিষ্কারক ল্যান্সিড অয়েল ৪৬ আইএসও ভিসকো সিটি গ্রেট উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাব সদস্যরা এই উদ্ধার অভিযান চালান। প্রশ্ন জেগেছে, ওই এলাকায় এত অস্ত্র এলো কোত্থেকে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলের পাশে কয়েকটি উপজাতীয় পরিবার আছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পর ওই পরিবারগুলোর পুরুষ সদস্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। আশপাশের এলাকার মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। ইতোমধ্যে র‌্যাব ঘোষণা দিয়ে তাদের চেকপোস্ট ও টহল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে অনেকেই আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন। তবে আইজিপি বলেছেন, র‌্যাবের টহল বন্ধ হয়েছে তেমনটি নয়। তারা তাদের রুটিন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। র‌্যাবের যেভাবে কাজ করার কথা সেভাবেই তারা কাজ করছে। পুলিশও তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। আইজিপি বলেন, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও পাবনায় অনাকাক্সিত কিছু খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

শেয়ার করুন