হাসির পাশাপাশি বেদনা আর কান্না

0
32
Print Friendly, PDF & Email

কাঁদলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তাঁর শূন্য দৃষ্টি আকাশের দিকে। সেই ছবি ছাপা হলো পর্তুগালের ক্রীড়া দৈনিক ও জোগোতে । ‘আস্থা রাখো’, ‘কান্নায় ডুবেছে দেশ’, ‘স্নায়বিক চাপের কাছে ভেঙে পড়ল দেশ’—ইত্যাদি শিরোনামও হলো।
ফুটবল আর জীবনের মধ্যে রয়েছে বিশেষ মিল: কোনোটাই সোজা পথে চলে না। ইউরো ২০০৪ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক পর্তুগাল হেরে গেল গ্রিসের কাছে। এর আগে কোনো স্বাগতিক দেশ এভাবে টুর্নামেন্টটির প্রথম ম্যাচেই হারেনি। গ্রিসও এ রকম বড় কোনো টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্বে আগে কখনো জেতেনি। পর্তুগিজ ফুটবলের ‘সোনালি যুগের’ সদস্য লুইস ফিগো, রুই কস্তা প্রমুখ নামী খেলোয়াড় ব্যর্থ হলেন৷ গ্রিসের রক্ষণ ও পাল্টা আক্রমণনির্ভর কৌশলের কাছে পর্তুগালের ছন্দময় ফুটবলের পতনের কী কারণ? ফিগোদের ব্যাখ্যা, তাঁদের কাছে দেশবাসীর সীমাহীন প্রত্যাশার বাড়তি চাপই এ জন্য দায়ী।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন ১৯ বছর বয়সী রোনালদো৷ তিনি মাত্র নয় মাস আগে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন৷ কিন্তু তাঁকে সহায়তার জন্য মাঠে যেন কেউই নেই! একক প্রচেষ্টায় একটি জোরালো শট নিলেও তা গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। পরে ফিগোর কর্নার থেকে হেডে একটি গোল শোধ করেন রোনালদো।
সেই ম্যাচে হারলেও কোচ লুই ফেলিপে স্কলারি কৌশল কিছুটা পাল্টে পর্তুগালকে জয়ের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। তাঁর দল পরের দুই ম্যাচে রাশিয়াকে ২-০, স্পেনকে ১-০ এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারায় ৩-২ গোলে। পরের ম্যাচে হল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছায় পর্তুগাল।
ফাইনালে আবারও ‘গ্রিক ট্র্যাজেডি’! ১-০ গোলে গ্রিসের কাছে সেই পরাজয় এখনো পর্তুগিজদের বুকে ব্যথা হয়ে বাজে। শিরোপার এত কাছে গিয়েও ব্যর্থতা! নিদারুণ হতাশায় মুষড়ে পড়লেন রোনালদোরা। তবে তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন, ‘আমাকে সামনের দিকে তাকাতে হবে। ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ আমার ক্যারিয়ারে নিশ্চয়ই আবার আসবে।’ তারপর মার্তুনিস-পর্ব। ইন্দোনেশিয়ার সেই সাত বছর বয়সী ছেলেটি পর্তুগাল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দারুণ ভক্ত। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে যে ভয়াবহ সুনামি হয়, তাতে ভেসে গিয়েছিল সে। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় বান্দা আচেহ প্রদেশের একটি নির্জন সৈকতে সম্পূর্ণ একা ১৯ দিন টিকে থাকতে সমর্থ হয় মার্তুনিস। তত দিনে ক্ষুধা, পানিশূন্যতা, শারীরিক দুর্বলতা ও পোকামাকড়ের কামড়ে মুমূর্ষু তার অবস্থা। ব্রিটিশ সাংবাদিক ইয়ান ডোভাস্টন ছেলেটির সন্ধান পেয়ে তার বেঁচে থাকার অবিশ্বাস্য ঘটনাটি তুলে ধরেন সংবাদমাধ্যমে। ঘটনাটি পর্তুগিজ জনগণ, রোনালদোসহ জাতীয় ফুটবল দলের সব খেলোয়াড় ও কোচকে আবেগাপ্লুত করে দেয়৷ ইন্দোনেশিয়ায় মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য ফুটবল ফেডারেশন বিশেষ ম্যাচের আয়োজন করে। স্কলারি বলেন, ছেলেটির মধ্যে রয়েছে সব বাধা জয় করার মতো ধ্রুপদি খেলোয়াড়ি চেতনা।
রোনালদো তাঁর খুদে অনুরাগীটির ব্যাপারে বলেন, এত অল্পবয়সী কারও এভাবে লড়াই করে টিকে থাকার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও অবিশ্বাস্য। তিনি মার্তুনিসকে নিজ উদ্যোগে যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালে নিজের খেলা দেখার সুযোগ করে দেন৷ সুনামিতে মা ও দুই ভাইবোনকে হারিয়েছে মার্তুনিস৷ বাবার সঙ্গে সে বিদেশে যায় খেলা দেখতে। তার হাতে ৪০ হাজার ইউরোর চেক তুলে দেয় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। রোনালদো সেই বিপর্যস্ত বান্দা আচেহ পরিদর্শনেও যান। ধ্বংসলীলা তাঁকে হতবিহ্বল করে। মার্তুনিস তাঁকে সঙ্গ দেয় সেখানে। বিধ্বস্ত জনপদটি পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থের সংস্থানও করা হয়।
তারপর আসে রোনালদোর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন। ২০০৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে রাশিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে পর্তুগাল জাতীয় দল তখন রাশিয়ায়। ২০০৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর স্কলারি ও ফিগো ডেকে পাঠান রোনালদোকে। শোক সংবাদ। তাঁর বাবা দিনিস আভেইরো মারা গেছেন। তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে অনেক দিন ধরেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। দলের সবাই রোনালদোকে পর্তুগালে ফিরে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সঙ্গ দিতে বললেন। কিন্তু তিনি যেতে নারাজ, ‘আমি খেলতে চাই। জীবন এবং খেলা অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। বাবার সম্মানে আমি এই ম্যাচে একটি গোলও করতে চাই।’
খেললেন রোনালদো। কিন্তু সেদিন ড্রেসিংরুম আর মাঠে নিজের আবেগ সামলাতে পারলেন না। রাশিয়ার সঙ্গে ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলো। পরে দেশে ফিরে বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিলেন তিনি। দিনিস আভেইরো ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা মানুষ। ছেলের তারকাখ্যাতির পরও তাঁর জীবনযাত্রার কোনো বদল হয়নি। তিনি বন্ধুদের সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন সারা জীবন।
সব মিলিয়ে সময়টা মোটেও ভালো যাচ্ছিল না রোনালদোর। বাবাকে হারানোর পর ইউনাইটেডের হয়ে খেলায়ও শুরু হয় তাঁর দুঃসময়।
সূত্র: প্রথম আলোয় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন, একাধিক ওয়েবসাইট এবং লুকা কাইয়োলির বই রোনালদো।

শেয়ার করুন