অপহরণ–খুনে অংশ নেন র্যাবের ১১ জন

0
44
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন র‌্যাব-১১-এর সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আরিফ হোসেন৷ তাতে তিনি কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত-জনকে অপহরণ এবং তারপর হত্যার পুরো বর্ণনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে৷
গতকাল বুধবার সকালে নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম কে এম মহিউদ্দিন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় মেজর আরিফের এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন৷
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, জবানবন্দিতে আরিফ বলেছেন, এই অপহরণ ও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেন। আরিফ এবং র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মাদ, লে. কমান্ডার এম এম রানাসহ র‌্যাবের ১১ জন সদস্য অংশ নিয়েছিলেন৷ জবানবন্দিতে আরিফ দাবি করেন, কেবল তাঁরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে এ ঘটনা ঘটাননি৷ র‌্যাবের সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও বিষয়টি জানতেন৷
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাবের সাবেক এই কর্মকর্তা চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলাতেই জবানবন্দি দিয়েছেন৷ এর মধ্যে কাউন্সিলর নজরুলসহ পাঁচজনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় একটি মামলা করেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম৷ আর, চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালকের অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় মামলা করেন চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় পাল।
তারেক আরও পাঁচ দিনের রিমান্ডে: এদিকে নজরুলসহ পাঁচজনকে হত্যা মামলায় তৃতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ায় লে. কর্নেল তারেক সাঈদ ও মেজর আরিফকে গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নারায়ণগঞ্জের আরেক জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ইশতিয়াক আহম্মেদ সিদ্দিকীর আদালতে হাজির করে পুলিশ৷
এর মধ্যে আরিফ দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত৷ আর পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী চন্দন সরকার হত্যা মামলায় তারেক সাঈদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত৷
লে. কর্নেল (অব.) তারেকের রিমান্ডের আবেদনের ওপর শুনানিতে আদালত পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ বলেন, গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নজরুলসহ পাঁচজনকে তাঁদের বহনকারী গাড়ি থেকে তারেক, আরিফসহ অন্যরা র্যাবের মাইক্রোবাসে তুলছিলেন। এ সময় পেছনে থেকে অপহরণের দৃশ্যটি মুঠোফোনে ভিডিও করেন চন্দন সরকার৷ তা দেখে র‌্যাব সদস্যরা চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়ির চালককেও অপহরণ করে নিয়ে যান। পরে তাঁদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
শুনানিতে এসআই আশরাফ বলেন, কাউন্সিলর নজরুলের সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জের গডফাদার, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু ও পরিবহন চাঁদাবাজ নূর হোসেনের বিরোধ ছিল। নূর হোসেনের সঙ্গে র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়কসহ তিন কর্মকর্তার সখ্য ছিল। নূর হোসেনের টাকার বিনিময়ে র‌্যাবের এই তিন কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা করে। হত্যার পর লাশের সঙ্গে ইট বেঁধে বস্তায় ভর্তি করে নদীতে ফেলে দেয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্মা নদী থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
শুনানিতে এসআই আশরাফ আরও বলেন, র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আরিফ হোসেন কাউন্সিলর নজরুল ও চন্দন সরকার হত্যা মামলায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন৷ তাতে হত্যার পরিকল্পনাকারী ও হত্যার ঘটনার লোমহর্ষক বণর্না দিয়েছেন৷ কিন্তু আরেক আসামি তারেক সাঈদ এখনো মুখ খোলেননি। নূর হোসেন কোথায় আছে? হত্যাকাণ্ডে কত টাকা লেনদেন হয়েছে? কোথায় ও কীভাবে হত্যা করা হয়েছে? অন্য আর কে কে এ ঘটনায় জড়িত—এসব জানতে হলে আসামি তারেক সাঈদকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন৷
আদালতে শুনানিতে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের বিষয়ে আইনজীবীরা এত দিন যে অভিযোগ করে আসছিলেন, আসামি মেজর (অব.) আরিফের স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। নূর হোসেন টাকার বিনিময়ে র‌্যাবের তৎকালীন তিন কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর সদস্য হলেও তাঁদের পবিত্র দায়িত্ব পালনের কথা ভুলে গিয়ে পেশাদার খুনির মতো এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তিনি বলেন, এই হত্যার পরিকল্পনাকারী কে? র‌্যাবের আর কোন কোন কর্মকর্তা জড়িত, এসব জানতে তারেক সাঈদকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া দরকার৷
আদালতে অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি ফজলুর রহমান বলেন, ‘র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আরিফ হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন৷ জানতে পেরেছি, তিনি জবানবন্দিতে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। অপহরণের পর সাতজনকে কোথায়, কীভাবে হত্যা করা হয়েছে—তা জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন আরিফ৷ এই খুনের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া আলামত, দুই প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, তদন্ত কমিটি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।’
এ সময় আদালতে লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ বলেন, ‘আমি দ্রুত মামলার তদন্তকাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।

শেয়ার করুন