‘ফুটবলটা ওর কাছে প্রিয় খেলনা’

0
108
Print Friendly, PDF & Email

ভালোয়-ভালোয় কাতােলানিয়ার মাটিতে পা রাখলেন৷ কিন্তু প্রথম কয়েকটি মাস ভালো কাটল না মেসির৷ বিদেশি হওয়ায় কোনো জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারলেন না৷ ফলে বার্সা ‘এ’ দলেও যোগ দেওয়া হলো না৷ এ কারণে বাধ্য হয়ে তাঁকে খেলতে হয় ‘বি’ দলে৷
সপ্তাহ খানেকের মাথায় ক্লাবের পক্ষ থেকে সাময়িক অনুমতিপত্র পেয়ে যান মেসি৷ পরদিনই আম্পোস্তা মাঠে ঘটে অভিষেক৷ গোলও করেন একটি৷ কিন্তু কিছুদিন পর আরেকটি ম্যাচে গুরুতর চোটে পড়েন৷ বাঁ পা ভেঙে যায়৷ ওটাই ছিল তাঁর ফুটবল-জীবনের প্রথম চোট৷
একমাত্র খুশির খবর ছিল তাঁর চিকিৎসা নিয়ে। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে মেসির হরমোনজনিত সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম করলে ও নিয়ন্ত্রিত খাবার খেলে তরুণ খেলোয়াড়টির শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটবে। যদিও আরও বেশ কয়েক বছর তাঁকে নিয়ম করে ইনজেকশন নিতে হবে।
বার্সায় পৌঁছানোর প্রায় এক বছর পর ফিফার কাছ থেকে মেসির সঙ্গে চুক্তি করার অনুমতি পায় স্পেনের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ২০০২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ওই চুক্তির পর লিগে খেলার অনুমতি পান তিনি৷
আস্তে আস্তে খারাপ সময়টা বিদায় নিতে লাগল। মেসির জীবনে আসতে শুরু করল শুভদিন। বার্সা ‘বি’ দলের হয়ে সুইজারল্যান্ডে একটি টুর্নামেন্টে অংশ নিলেন। ইতালির পিসায় মায়েত্রেল্লি ট্রফিতে অংশ নিয়ে তো করলেন বাজিমাত। গ্রুপ পর্বে সবাইকে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে পার্মাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন বার্সা। মেসি হলেন টুর্নামেন্ট-সেরা। শৈশবের নীরবতা ভেঙে তাঁর মুখেও ফুটতে শুরু করল কথার ফুলঝুরি। মেসির তখনকার সতীর্থ সেস্ক ফ্যাব্রিগাসের ভাষায়, ‘প্রথমে আমরা ভাবতাম, ও বুঝি বোবা! ইতালির সফরকে ধন্যবাদ! ওখানেই আমরা আবিষ্কার করলাম, ও কথা বলতে পারে।’
ইতালিতে মেসির পারফরম্যান্সে যারপরনাই খুশি কোচ টিটো ভিলানোভা, ‘যখন সে খেলত, মনে হতো ম্যারাডোনা খেলছে৷ ওর লজ্জা কাটিয়ে সতীর্থদের আপন করে নেওয়ার সুযোগ করে দিল এই মায়েত্রেল্লি ট্রফি।’ ২০০২-০৩ মৌসুমে বার্সার ‘এ’ দলে অন্তর্ভুক্ত হন মেসি৷ খেলেন লিগের ৩০টি ম্যাচের সবগুলোতেই। গোলও করেন ৩৬টি। এর মধ্যে তিনটি ছিল হ্যাটট্রিক। এক ম্যাচে তো চারটি গোলই আসে তাঁর পা থেকে । ওই মৌসুমে বার্সা দুটি শিরোপা ‘লিগা দ্য ডিভিশন দি অনার’ ও ‘কোপা কাতালানিয়া’ জেতে।
দলে সবচেয়ে ছোট গড়নের মেসি, উচ্চতা মাত্র ১ দশমিক ৬২ মিটার। ওজন ৫৫ কেজি। আর সবচেয়ে লম্বা জেরার্ড পিকে, উচ্চতা এক দশমিক ৯১ মিটার। কিন্তু মেসিই ছিলেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর বার্সার মূল দলের হয়ে মাঠে নামেন মেসি। সেটি ছিল প্রীতি ম্যাচ৷ এফসি পোর্তোর বিপক্ষে ওই ম্যাচের ৭৫ মিনিটে অভিষেক ঘটে তাঁর৷ কোনো গোল করতে না পারলেও অবদান রাখেন দুটি গোলে। ম্যাচ শেষে তাতেই কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের উচ্ছ্বাস, ‘ছেলেটির অনেক মেধা। ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’
বার্সায় পাড়ি দেওয়ার আড়াই বছরের মাথায় ওই ম্যাচের মধ্য দিয়েই ক্লাবটির ইতিহাসে ঢুকে পড়েন মেসি। মাত্র ১৬ বছর চার মাস ২৩ দিনে বার্সার হয়ে তাঁর অভিষেক ঘটে। তাঁর আগে মাত্র দুজন এত কম বয়সে ক্লাবের মূল দলে সুযোগ পান। একজন পাওলিনো আলকানতারা ১৫ বছর চার মাস ১৮ দিনে, অন্যজন হারুনা বাবানগিদা ১৫ বছর নয় মাস ১৮ দিনে।
ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনার যুবদলেও ডাক পান মেসি। হল্যান্ডে অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপ সামনে রেখে তাঁকে দক্ষিণ আমেরিকায় ডেকে নেওয়া হয়। বাছাইপর্বে তিন ম্যাচে ৫ গোল করেন৷ শেষ পর্যন্ত ওই বিশ্বকাপের ফাইনালে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো ট্রফিটি ঘরে তোলে আর্জেন্টাইন যুবারা। যার পূর্ণ কৃতিত্ব মেসিরই। টুর্নামেন্টে সর্বাধিক গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ও হন তিনি।
ওই টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন। কিন্তু মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্সে ৩-১ গোলে হেরে যায় স্প্যানিশরা। ম্যাচ শেষে মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ইনাকি সায়েঞ্জ, ‘ও মেধাবী। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে। ওর সব মনঃসংযোগই গোলরক্ষকের দিকে, আর ও জানে কী করতে হবে।’
ফাইনালে দুটি গোলই পেনাল্টি থেকে করেছিলেন মেসি। ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষের ঘাম ঝরিয়ে ছেড়েছিলেন। ফুটবল-জাদুকরের কীর্তিতে সবাই বিস্মিত। ভাষাহীন ধারাভাষ্যকারেরা, পত্রিকাগুলো। পরদিন ক্লারিন পত্রিকাটি শিরোনাম করতে গিয়ে যেন ভাষাই হারিয়ে েফলেছিল, ‘ওর সম্পর্কে আমরা কী আর বলব!’
আর্জেন্টিনা যুবদলের কোচ ফ্রান্সিসকো ‘পানচো’ ফেরারো যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে, ‘ও ফুটবল ভালোবাসে৷ ফুটবলটা ওর কাছে প্রিয় খেলনা৷’

শেয়ার করুন