নারীরা নিজ ঘরেই নির্যাতিত হচ্ছেন

0
72
Print Friendly, PDF & Email

‘বিয়ার বছর যাইতে না যাইতেই স্বামীর মাইর খাইছি। পান থাইক্যা চুন খসলেই হইল। যখন-তখন মাইর দিত। এখনো মারে। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি। একবার তো তিন ঘণ্টা শীতের সময় পুকুরে নামাইয়্যা রাখছিল। সেইবার দ্যাশের বাড়ি গেছিলাম। আমার স্বামী বাজার থেইক্যা আইস্যা সব সময় গরম পানি দিয়া গোসল করত। সেদিন তরকারি চুলায় আছিল। গরম পানি করতে মনে আছিল না। স্বামী সবার সামনে আমারে টানতে টানতে পুকুরে নিয়া গিয়া গলাসমান পানিতে চুবায়া রাখছিল।’ নিজের দুঃখগাথা এভাবেই বলেন রাজধানীর নারিন্দা এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম বিবি (ছদ্মনাম)। বয়স ৩৪ বছর। স্বামী রিকশাচালক।
লাইলি আক্তার মাদারটেকের বাসিন্দা। স্বামী একটি দোকানে কাজ করেন। বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর। বিয়ের সময় যৌতুকও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো বিভিন্ন অজুহাতে লাইলির বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে বলেন। না পেলে চলে লাইলির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
রাহেলা শিকার হয়েছেন অর্থনৈতিক নির্যাতনের। বিয়ে হয়েছে ১০ বছর আগে। স্বামীর আয়-রোজগার ভালোই। কিন্তু সংসারে কোনো টাকা দেন না। দুইটা ছেলেমেয়ে নিয়ে বিপদে পড়েন রাহেলা। উপায় না পেয়ে ইট ভাঙার কাজ শুরু করেন তিনি। যে টাকা পান তা দিয়ে তিনি সংসার চালান। স্বামী দেখেও দেখেন না। অনেক সময় তিনি স্ত্রীর রোজগারের ওপরও হস্তক্ষেপ করেন।
নারীরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতন। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে দেখা গেছে, দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭.৭ শতাংশ স্বামী দ্বারা কোনো না কোনো সময়ে কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪.৬ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের স্বামী শারীরিক নির্যাতন করেছেন, ৩৬.৫ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮১.৬ শতাংশ মানসিক নির্যাতন এবং ৫৩.২ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই জরিপটি পরিচালিত হয়। জরিপটি চালানোর জন্য ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের সাতটি বিভাগের সাতটি শহরাঞ্চল ও সাতটি গ্রামাঞ্চল বেছে নেওয়া হয়। ১৪টি অঞ্চল থেকে ৪২০টি এলাকা চয়ন করা হয়৷ ১৫ বছরের বেশি বয়সী ১২ হাজার ৬০০ বিবাহিত নারীকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১২ হাজার ৫৩০ জন নারী জরিপে তথ্য দেন। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ১৯ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
জরিপে নারী নির্যাতনের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। যেমন এখানে বলা হয়, শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারীদের মাত্র অর্ধেক চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান। এক-তৃতীয়াংশ নারী স্বামীর ভয়ে বা স্বামীর অমত থাকায় চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। সহিংসতার শিকার নারীদের ১ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন কিংবা আত্মহত্যা করেছেন। পাচারের শিকার হয়েছেন ১ শতাংশ নারী। নারীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল তার ঘর। কিন্তু দেখা গেছে, এই ঘরেই নারী বেশি নির্যাতিত। ৮০ শতাংশের বেশি নারী নিজ ঘরে সহিংসতার শিকার।
তবে, শুধু ঘরেই নন, কর্মস্থলেও নারীরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। জরিপে দেখা গেছে, কর্মস্থলে ১৬.২ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ২৬ শতাংশ মানসিক নির্যাতন আর ২৯ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
এত বেশিসংখ্যক নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু আইনের দ্বারস্থ হচ্ছেন অনেক কমসংখ্যক নারী। এর কারণ হিসেবে নারীরা বলেছেন, স্বামীর ভয়ে, অপ্রয়োজনীয় মনে করে, সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, নিজের সম্মান ও পরিবারের কথা চিন্তা করে তাঁরা আইনের আশ্রয় নেন না। এই নারীদের বাস্তবতা এ রকম যে যেহেতু ঘরেই নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তাই লড়াই করাটা নারীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘নারী-পুরুষের সমতার অভাব, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, পারিবারিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং মতামত প্রদানের সুযোগ না থাকা, সুশাসনের অভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি—সর্বোপরি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নারীর প্রতি সহিংসতার জন্য দায়ী।’ নারীকে সুরক্ষিত করতে আইন যথেষ্টই আছে। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই আইনগুলোর সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার অভাবে আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহী হয় না। অন্যদিকে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় নির্যাতিত নারীর পরবর্তী সময়ে আরো বেশি নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সালমা আলী আরও বলেন, ‘নারী নির্যাতন দমনে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন, পরিবারে সচেতনতা সৃষ্টি—এই বিষয়গুলোর সম্মিলিত প্রয়োগ দরকার। ইতিমধ্যে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন নিয়ে আমরা কাজ করছি, যা একটি প্রতিরোধ ও সুরক্ষামূলক আইন। এই আইনটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি এলাকার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যেসব আইন রয়েছে, বিশেষত পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা এবং প্রয়োগ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকায় নারীরা এই আইনসমূহের সুফল ভোগ করতে পারছেন না। তাই এ ব্যাপারে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আইনি সহায়তা নারীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে যুবসমাজকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেহেতু এটি একটি জাতীয় সমস্যা। তাই সব রাজনৈতিক দলকে নারী নির্যাতন রোধে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ জানুয়ারি থেকে ২০১২ জুন পর্যন্ত মোট এক লাখ ৭৪ হাজার ৮৫০ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে যৌতুকের জন্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫১ হাজার ৯৫৭ জন, অ্যাসিড হামলার শিকার হয়েছেন এক হাজার ৮৮৩ জন, ধর্ষণ ৩৮ হাজার ৭৯১ জন, খুন এক হাজার ৪৯৭ জন, পাচার হয়েছেন ৯৫৯ জন ও অন্যান্য ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪৮ হাজার ৪৩৪ জন।
অন্যদিকে, মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে চার হাজার ৭৭৭টি।
নারী নির্যাতনের মূল কারণ লিঙ্গীয় বৈষম্য, এমনটাই মনে করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম। তিনি বলেন, ‘এই জরিপের ফলে আমরা দেখলাম সমাজে নারীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ। আর এটা ঘটছে লিঙ্গীয় বৈষম্য, আইনি জটিলতা, সামাজিক প্রথার কারণে। আরেকটি কারণ, সম্পদে নারীর সম-অধিকার নেই। যার কারণে নারীর প্রতি একধরনের হেয় মনোভাব সমাজে গড়ে উঠেছে।’ নির্যাতন বন্ধ করতে হলে পরিবার থেকেই পরিবর্তনটা আনতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে গণসচেতনতা প্রয়োজন। আর এ সচেতনতা আসতে হবে পরিবার থেকে। পারিবারিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে নারীর জীবনকে। সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধে পরিবর্তন আনতে হবে। সেই সঙ্গে নারীকেও স্বকীয় সত্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই নারী নির্যাতন বন্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শেয়ার করুন