মৃত্যুদণ্ড দেশে বিদেশে যুগে যুগে (৪)

0
101
Print Friendly, PDF & Email

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আমেরিকায় ম্যাকার্থিজম নামে মাস হিস্টেরিয়া বা গণ-উন্মত্ততা জাগরণের বিপক্ষে এবং ম্যাকার্থিজমের শিকার সায়েন্টিস্ট জুলিয়াস রোজেনবার্গ ও তার স্ত্রী ইথেল রোজেনবার্গের ট্রায়াল, মৃত্যুদণ্ড আদেশ ও তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় থেকে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড বিরোধী মতামত জোরালো হয়ে উঠতে থাকে। এখনো আমেরিকায় সেই তর্ক চলছে।
অতি সম্প্রতি দক্ষিণ ওহাইও-র লুকাসভিল জেলখানায় ডেনিস ম্যাকগায়ারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় সেই তর্ক আবার আমেরিকান জাতির সামনে চলে এসেছে। এ বিষয়ে আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন (২৬ মে ২০১৪)-এর কিছু অংশ নিচে উদ্ধৃত হলো :
 
১৯৮৯-এ জয় স্টুয়ার্ট নামে এক তরুণী অন্তঃসত্ত্বা নারীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ম্যাকগায়ার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাত দিন আগে ম্যাকগায়ার তার ছেলেকে একটি রিস্টওয়াচ দিয়েছিলেন। দুটি ভিন্ন ধরনের ড্রাগের একটি কম্বিনেশনের ইনজেকশন প্রয়োগে এই মৃত্যুদণ্ডটি কার্যকর হবার সিদ্ধান্ত ছিল। এই কম্বিনেশনে এর আগে আর কারোর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। পিতা চেয়েছিলেন তার ছেলে যেন শেষ মুহূর্তে রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বোঝেন তার মৃত্যু হতে কতক্ষণ লাগছে।
 
১৬ জানুয়ারি ২০১৪Ñতে সকাল দশটার কিছু পরে ম্যাকগায়ার (৫৩) হেটে ব্রাউন টাইলস দেওয়া একজিকিউশন চেম্বারে ঢোকেন। এই চেম্বারের কাচের জানালার অপর দিকে ছিলেন তার ছেলে, মেয়ে ও পুত্রবধূ। ম্যাকগায়ার বিছানায় শুয়ে তার দুই হাত বাড়িয়ে দেন। ম্যাকগায়ারের উকিলরা তাকে বলেছিলেন, মারণ-ইনজেকশন (Lethal Injection, লিথাল ইনজেকশন) দেওয়ার আগে প্রচণ্ড ভয়ে তার গলা শুকিয়ে যেতে পারে এবং তিনি অদ্ভুত আচরণ করতে পারেন।
 
ম্যাকগায়ারের দুই কবজি, কোমর ও দুই পা বিছানার সঙ্গে গার্ডরা বাধেন। তারপর তার শার্টের হাতা দুই কনুইয়ের একটু নিচ পর্যন্ত গুটিয়ে দেন। এরপর একটি মাইক্রোফোনে ম্যাকগায়ার তার শেষ কথাগুলো বলেন। তিনি তার ভিকটিম জয় স্টুয়ার্টের পরিবারের কাছে ক্ষমা চান। তারপর তিনি তার সন্তানদের বলেন, আমি তোমাদের ভালোবাসি। তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে।
 
এরপর ম্যাকগায়ারের কোটের বোতাম লাগিয়ে দেন ওয়ার্ডেন এবং প্রাণদণ্ড কার্যকরের সিগনাল দেন। তখন সময় ছিল ১০.২৭ মিনিট।
১০ মিলিগ্রাম ঘুমের ওষুধ সিডেটিভ মাইডাজোলাম (Sedative Midazolam) এবং ৫০ মিলিগ্রাম ব্যথানিবারক ওষুধ পেইনকিলার হাইড্রোমরফোন (Painkiller Hydromorphone) ইনজেকশনের মাধ্যমে ম্যাকগায়ারের ধমনীতে ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাকগায়ার চেষ্টা করেন তার হাত জোড়া বাধনমুক্ত করতে। দুই হাতের মুঠো বন্ধ করেন। কিন্তু খুব দ্রুত এই প্রতিক্রিয়া স্তিমিত হয়ে যায়। তার মাথা পেছনে হেলে পড়ে। তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে যায়। তারপর তার নাক ডাকতে থাকে। এই নাকডাকার শব্দ এত জোরে ছিল যে কাচের জানালার অপর দিকেও শোনা যাচ্ছিল।
 
পিতার নির্দেশের কথা মনে রেখে ম্যাকগায়ার জুনিয়র তার রিস্টওয়াচের দিকে তাকান, তখন সময় ছিল ১০.৩০-এর একটু পরে। তিনি পিতার দিকে তাকিয়ে দেখলেন পিতা তার বাধন খোলার চেষ্টা করছেন এবং জোরে মাথা নাড়াচ্ছেন।
মুহূর্তগুলো গড়িয়ে যেতে থাকে।
মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ম্যাকগায়ার হাত-পা ছোড়ার চেষ্টা করতে থাকেন। তার মুখ দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ বের হতে থাকে। দেখার রুমে ম্যাকগায়ারের পুত্রবধূ তার পাশেই বসা একজন পাদরিকে বলেন, এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়।
অবশেষে ১০.৫০ মিনিটে ম্যাকগায়ার নিশ্চল হয়ে যান। একজন গার্ড পুত্রবধূকে বলেন, সরি।
মৃত্যুর অফিশিয়াল টাইম হয় সকাল ১০.৫৩ মিনিট।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে সময় লাগে ২৬ মিনিট। ধারণা করা হয়েছিল ১০ থেকে ১১ মিনিটের মধ্যে ম্যাকগায়ারের মৃত্যু ঘটবে। তা হয়নি। পরিকল্পিত সময়ের চাইতে ১৫ মিনিট বেশি লাগে ম্যাকগায়ারের মৃত্যু ঘটতে।
 
মৃত্যুদণ্ড বিরোধী ইওরোপ
 
এই ঘটনার পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে আমেরিকা জুড়ে তর্ক শুরু হয়ে যায়। আমেরিকা একটি ফেডারাল রাষ্ট্র। তার যেসব অঙ্গরাজ্যে এখনও মৃত্যুদণ্ড চালু আছে, সেসব রাজ্যে বিভিন্ন পন্থায় দণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইওরোপে মৃত্যুদণ্ড ব্যাপকভাবে রহিত। ২০১১ সালে ইওরোপিয়ান কমিশন শুধু ইওরোপেই নয়, ইওরোপের বাইরে অন্য দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের লক্ষ্যে কোনো ড্রাগস যেন রফতানি না হতে পারে সে বিষয়ে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে আমেরিকা কিছুটা বিপদে পড়ে গিয়েছে। সরকারিভাবে ইওরোপ থেকে মারণ-ড্রাগস আমদানি করতে না পারলে আমেরিকার জেলখানার ওয়ার্ডেনরা নিজেদের নামে সেসব ড্রাগস ব্যক্তিগতভাবে জোগাড় করেন।
জনদাবির মুখে আমেরিকার বিভিন্ন জেল কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব কম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেই রকম বিশেষ ড্রাগস কেনায়। সেজন্য বিভিন্ন কম্বিনেশনে মারণ-ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। আর তার ফলে সাম্প্রতিক কালে ম্যাকগায়ার ছাড়াও আরো কিছু আসামির ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে।
 
ওহাইওতে নতুন ড্রাগস ফর্মুলার এক সপ্তাহ আগে, ৯ জানুয়ারি ২০১৪-তে ওকলাহোমার এক জেলখানায় আসামি মাইকেল লি উইলসনকে দেওয়া হয়েছিল পেনটোবারবিটাল, ভেকিউরোনিয়াম ব্রোমাইড ও পটাশিয়াম কোরাইডের কম্বিনেশন ইনজেকশন। মৃত্যুর আগে উইলসন বলেন, তার সারা শরীর জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে।
 
এর প্রায় চার মাস পরে ওকলাহোমা ভিন্ন আরেক কম্বিনেশন প্রয়োগ করে। ২৯ এপৃল ২০১৪-তে কেইটন লকেটের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিনি ১৯ বছর বয়সে এক তরুণীকে প্রথমে গুলি করে তারপর তাকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন। লকেটের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী ইনজেকশনের কম্বিনেশনে ছিল মাইডাজোলাম, ভেকিউরোনিয়াম ব্রোমাইড ও পটাশিয়াম কোরাইড। কিন্তু এমন মারণ-ড্রাগস কোনখান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল সেটা জেল কর্তৃপক্ষ জানাননি।
২০১০ থেকে যে ৩২টি অঙ্গরাজ্যে এখনো মৃত্যুদণ্ড চালু আছে, তার মধ্যে ১৫টি রাজ্য মারণ-ইনজেকশন বিষয়ে নতুন প্রটোকল বা বিধি মেনে চলছে। এদের মধ্যে ৯টি রাজ্য এখন জানায় না কোনখান থেকে মারণ-ড্রাগস সংগ্রহ করা হচ্ছে।
 
মাইডাজোলাম প্রয়োগে লকেটকে অচেতন করা ছিল প্রাথমিক লক্ষ্য। তারপর বাকি দুটি ড্রাগসে তার মৃত্যু ঘটানো ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখা যায় লকেট চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন। সারা শরীর ঝাকিয়ে, উঠে পড়ার চেষ্টা করছেন।
 
এই সময়ে ওয়ার্ডেন মনে করেন লকেটের মৃত্যু হবে না। তিনি তখন এই প্রক্রিয়া থামিয়ে পরবর্তী কোনো আরেক দিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তাব দেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষার সময়ে লকেটের মৃত্যু ঘটে যায়। ইনজেকশন দেওয়ার ৪৩ মিনিট পরে। পোস্টমর্টেমে বলা হয়, হার্ট অ্যাটাকে লকেটের মৃত্যু ঘটেছিল।
 
জেল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা বলেন, নতুন কম্বিনেশনের জন্য নয় Ñ লকেটের একটা ধমনী নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে তার মৃত্যু প্রলম্বিত হয়েছিল। এরপর ওকলাহোমার গভর্নর মেরি ফলিন তার রাজ্যের সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর একটা স্থগিতাদেশ দেন। গভর্নর ফলিন নির্দেশ দেন সব মারণ-ইনজেকশনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখতে।
 
আমেরিকান সংবিধানের নিষেধাজ্ঞা
 
আমেরিকার অষ্টম সংশোধনীতে নিষ্ঠুর শাস্তি নিষেধ করা হয়েছে। মারণ-ইনজেকশনের অনিশ্চিত ফলাফলে মানুষের মৃত্যু হতে পারে নিষ্ঠুরভাবে এই যুক্তিতে বিভিন্ন সংগঠন সোচ্চার হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, লকেটের প্রলম্বিত মৃত্যু গভীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডারকে নির্দেশ দেন সারা দেশে কিভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে সেটা রিভিউ করতে।
 
লকেটের ৪৩ মিনিট ব্যাপী মৃত্যুযন্ত্রণার সংবাদ সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়। আমেরিকার ৯টি রাজ্য এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। কারণ কনডেমড সেল (Condemned Cell) বা ডেথ রো (Death Row)ি-র বন্দিরা তাদের উকিলদের মারফৎ বলেছেন, অপরীক্ষিত কোনো ড্রাগসের কম্বিনেশনে অথবা কোনখান থেকে মারণ-ড্রাগস সংগৃহীত হচ্ছে সেই তথ্য প্রকাশ না করলে, তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটা হবে সংবিধান বিরোধী।
এই ধরনের দাবির প্রেক্ষিতে মিসৌরি, ভার্জিনিয়া ও ইয়োমিং রাজ্য কর্তৃপক্ষ এখন প্রাচীন পদ্ধতিগুলো যেমন Ñ ফায়ারিং স্কোয়াড এবং গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে নির্ভরযোগ্য মনে করে, তা পুনঃপ্রবর্তনের বিবেচনা করছে।
মারণ-ইনজেকশন সংশ্লিষ্ট এসব সাংবিধানিক জটিলতা ও মানবিক প্রশ্নগুলো ওঠায়, সম্প্রতি আবার আমেরিকায় শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা নিয়ে পলিটিশিয়ান, আইনবিশারদ, ডাক্তার এবং প্রফেসরদের মধ্যে লেখালেখি ও বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে।
 
আমেরিকান ইতিহাস
 
মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে আমেরিকায় বিতর্ক বহু যুগ ধরে চলছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো ফাসিতে ঝুলিয়ে। সাধারণ আমেরিকানরা চায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অপরাধে দণ্ডিতদের মৃত্যু হোক। কিন্তু তারা এটাও চায় যে, দণ্ডিতরা যেন সম্মানজনকভাবে মৃত্যুবরণ করে।
তাই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে আমেরিকায় ইলেকট্রোকিউশন চালু হয়। ১৯২০-এর দিকে গ্যাস চেম্বার আবির্ভূত হবার পরে সেভাবেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতে থাকে। বলা হয় গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুটা অনেক পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি।
১৯৩০-এর দশকে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা সবচেয়ে বেশিতে পৌছায়। সেই সময়ে প্রতিদিনে গড়ে একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছিল তিনভাবে Ñ ইলেকটৃক চেয়ারে, গ্যাস চেম্বারে এবং ফায়ারিং স্কোয়াডে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে এই সংখ্যা কমে যায়। কারণ তখন সুপৃম কোর্ট মনে করেছিল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটা সংবিধানবিরোধী। তবে এই বিরতিটা বেশিকাল স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৭-এ সুপৃম কোর্ট আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পক্ষে রায় দেয়।
এর পরে ইউটাহ-তে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যাকারী গ্যারি গিলমোরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ওই রাজ্যে পাচ বছর বিরতির পর এটাই ছিল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রথম ঘটনা।
কিছুকাল পরে ওকলাহোমা রাজ্যসভার জনৈক সদস্য ওই রাজ্যের চিফ মেডিকাল একজামিনার ড. জে চ্যাপম্যানকে অনুরোধ করেন কম যন্ত্রণাদায়কভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো উপায় আছে কি না সেটা খুজে বের করতে।
ড. চ্যাপম্যান তখন সিদ্ধান্তে আসেন যে, পশুপ্রাণীদের মৃত্যুর সময়ে যে যন্ত্রণা দেওয়া হয়, তার চাইতে বেশি যন্ত্রণা মানুষকে মৃত্যুর সময়ে দেওয়া উচিত নয়। তাই তিনি বিভিন্ন কম্বিনেশনের ড্রাগসের ইনজেকশন প্রয়োগ সুপারিশ করেন যেন মৃত্যুর সময়ে কোনো ব্যথা অনুভূত না হয়। প্যানকিউরোনিয়াম ব্রোমাইড ও পটাশিয়াম কোরাইডের যে কম্বিনেশনের ফর্মুলা তিনি দেন সেটা খুব জটিল ছিল না। হসপিটালে পেশেন্টদের জেনারেল এনেসথেশিয়া দেওয়ার সময়ে যে ডোজ দেওয়া হয়, সেটার পরিমাণ তিনি বাড়িয়ে দেন।
কিন্তু এই ফর্মুলা কখনোই মেডিকালি পরীক্ষা করা হয়নি। তার আগেই ওকলাহোমা এই ফর্মুলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা শুরু করে দেয়। যেসব রাজ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল তারা সবাই ওকলাহোমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে। চ্যাপম্যান বলেন, আমি কল্পনাও করিনি আমার কাজের এমন বিরাট ফল হবে।
চ্যাপম্যান ফর্মুলায় ১২০০ জনের বেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু ২০০০-এর গোড়ার দিকে এনেসথেশিওলজিস্টরা সন্দেহ করতে থাকেন ওই ইনজেকশনের পরে কিছু ব্যক্তি প্যারালাইজড বা অবশ হয়ে গেলেও তাদের মৃত্যু হয় না। মিয়ামি ইউনিভার্সিটির এনেসথেশিওলজিস্ট ডেভিড লুবারস্কি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ৪৯ বন্দির পোস্টমর্টেম রেকর্ড চেক করে বলেন, তাদের মধ্যে ২১ জনেরই হয়তো প্রাণ ছিল এবং তারা তখন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগছিল।
লুবারস্কি বলেন, এটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। দুঃখের বিষয় এটা পরীক্ষা করার কথা কেউ ভাবেনি।
মারণ-ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং সেটা যে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে এটা জানার পর কনডেমড সেলের বন্দিদের পক্ষে উকিলরা বিভিন্ন আদালতে মামলা দায়ের করেন। ২০০৯-এ ওহাইও শুধু একটি ড্রাগের মারণ-ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আরম্ভ করে।
 
ইওরোপিয়ান নিষেধাজ্ঞা
 
এই একটি ড্রাগ ছিল সোডিয়াম থাইওপেন্টাল। আর এটি বানাত ইলিনয়-ভিত্তিক ড্রাগনির্মাতা হসপিরা। এই ড্রাগের উপাদান হসপিরা আমদানি করত ইটালি থেকে। আমেরিকার জেলখানায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য উপাদানটি ব্যবহৃত হচ্ছে জানাজানির পর ইটালিয়ান সরকার ড্রাগটির রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলে হসপিরা সোডিয়াম থাইওপেন্টাল তৈরি বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই একইভাবে আরো কিছু মারণ-ড্রাগস আমেরিকায় তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।
হসপিরার সোর্সটি বন্ধ হয়ে যাবার পরে ওহাইও জেল কর্তৃপক্ষ খুব সমস্যায় পড়ে যায়। এক দিকে তারা তাদের রাজ্যের বিধান অনুযায়ী দ্রুত ও যন্ত্রণাবিহীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বাধ্য ছিল। অন্য দিকে সেটা মেনে চলার জন্য কার্যকর কোনো ড্রাগস আমেরিকায় পাওয়া যাচ্ছিল না। তারা দ্রুত কার্যকরী ড্রাগ ব্যারবিচুরেট পেনটোবারবিটাল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এটা জানার পর ডেনমার্কের কয়েকটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। পাশাপাশি বৃটেনের বিখ্যাত মেডিকাল ম্যাগাজিন লানসেট (Lancet)-এ ৬০ ডাক্তার ও প্রফেসরদের স্বাক্ষর সংবলিত একটি আবেদনমূলক চিঠি ছাপা হয়। এর ফলে এই ড্রাগের নির্মাতা, ডেনমার্কের একটি কম্পানি বাধ্য হয় ড্রাগটি আমেরিকায় বিক্রি বন্ধ করতে।
মিসৌরি রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য প্রোপোকল ব্যবহার করত। এই ড্রাগেই পপসিংগার মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু হয়েছিল। এটির নির্মাতা জার্মান কম্পানি ফ্রেমনিয়াস-কাবি, ইটালিয়ান কম্পানির মতোই আমেরিকায় এর বিক্রি বন্ধ করে দেয়।
অধিকাংশ মারণ-ড্রাগস নির্মাণের উৎপত্তিস্থল ইওরোপে হওয়ায় আমেরিকায় সমস্যা গুরুতর হয়। বেলারুশ বাদে ইওরোপের প্রতিটি দেশই মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। ফলে ইওরোপ থেকে মারণ-ড্রাগস রফতানি ক্রমে ক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে জেল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করতে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধ্য হয় গোপনে এসব ড্রাগস কিনতে। আর তারই পরিণতিতে ওহাইওতে ম্যাকগায়ারের মৃত্যু আলোচনার শীর্ষে চলে আসে।
 
ইতিমধ্যে ২০১১ থেকে আমেরিকার কয়েকটি রাজ্য, আরকানস (উচ্চারণটি আরকানসাস নয়)। কলোরাডো, জর্জিয়া, ওকলাহোমা ও সাউথ ডাকোটা গোপনীয়তা রক্ষার গ্যারান্টিমূলক আইন পাস করছিল। এই আইনের আওতায় জেল কর্তৃপক্ষ মারণ-ড্রাগস কিনছিল। তবে কোনখান থেকে তারা সেটা কিনছিল, সেটা তারা গোপন রাখছিল। কিন্তু ড্রাগস নির্মাতা কম্পানিগুলো যখন টের পেয়ে যায় যে, তাদের ড্রাগস মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন তারা আপত্তি জানায়। কিছু কম্পানি ড্রাগস ফেরত দিতে জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। কিছু কম্পানি জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মিসৌরি রাজ্য একটি কম্পানিকে জরিমানাস্বরূপ ১১,০০০ ডলার দিতে বাধ্য হয় জেল কর্তৃপক্ষ।
ম্যাকগায়ারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার এক সপ্তাহ পরে তার সন্তানরা হসপিরা-র বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। তাদের অভিযোগ, হসপিরা যে ড্রাগস বিক্রি করেছিল তার ফলে তাদের পিতার মৃত্যু হয়েছিল নিষ্ঠুরভাবে। ওহাইও জেল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলে, তারা সাংবিধানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। তবে, ভবিষ্যতে মারণ-ইনজেকশনে ড্রাগসের ডোজ বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
 
আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড বিরোধী জনমত ধীরে ধীরে বাড়লেও ৬৩% প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান মনে করেন দণ্ডিত খুনিদের মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য।
গত বছরে (২০১৩) আমেরিকার কনডেমড সেলে বন্দি ছিল ৩,০৮৮ জন। এদের মধ্যে মাত্র ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বাদবাকিরা অপেক্ষা করছে মারণ-ইনজেকশন বিতর্কটি কোন দিকে মোড় নেয় সেটার জন্য। ফায়ারিং স্কোয়াডে ফাসির বদলে মারণ-ইনজেকশন প্রবর্তিত হয়েছিল। হয়তো এখন আমেরিকা সিংগল ড্রাগ ইনজেকশনে যাওয়ার চেষ্টা করবে, যে ড্রাগ আমেরিকাতেই বানানো হয়। অথবা আমেরিকা ফিরে যাবে ফায়ারিং স্কোয়াড ও ফাসিতে।
 
মধ্যম আয়ের আগে Ñ মধ্যম সভ্যতার দেশই কাম্য
 
যেসব আমেরিকান রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড এখনো বহাল আছে তাদের সংকট হচ্ছে যেহেতু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হতে পারে সেহেতু পদ্ধটিটা সভ্য নয়। এবং যেহেতু এটি সভ্য নয় সেহেতু ওই রাজ্যের নাগরিকরা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করতে পারে না।
 
পাঠকরা লক্ষ্য করুন, ইওরোপ এবং আমেরিকা জুড়ে বিভিন্ন সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি কম্পানিগুলো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের প্রাণ রক্ষার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করছে। মামলাও দায়ের করছে। আর বাংলাদেশে কি হচ্ছে?
বাংলাদেশে আওয়ামী সরকারের আনুকূল্যে, আওয়ামী মিডিয়ার প্রচারে এবং আওয়ামী সুশীলসমাজের প্রভাবে, মৃত্যুদণ্ড পাননি এমন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার লক্ষ্যে আইন বদলের আন্দোলনে কিছু বিভ্রান্ত যুবক-যুবতীদের, এমনকি পাচ বছরের শিশুকেও সমবেত করা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০১৩-তে শাহবাগে।
এরা মাথায় ক্যাপ লাগিয়ে এবং হাসিমুখে আকর্ণ দাত বিকশিত করে ফাসির দাবিতে দুই মাসব্যাপী একটি অতি অসভ্য ‘আন্দোলন’ করেছিল।
বাংলাদেশের (অবৈ:) প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে এই দেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা।
কিন্তু তার আগে বাংলাদেশকে মধ্যম সভ্যতার দেশে উন্নীত হতে হবে।

শেয়ার করুন