রাজনীতির গুণ, মিলেমিশে খুন!

0
447
Print Friendly, PDF & Email

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরের শেষ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীতে সংঘটিত খুনের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরাই দলে ঢুকে এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরাই যদি আওয়ামী লীগে ঢুকে উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, বিশিষ্ট আইনজীবীদের খুন করে থাকেন, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কী করছেন? তাঁদের দায়িত্ব কি বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী, খুনি ও চাঁদাবাজদের সাদরে দলে নিয়ে আসা, নাকি এই দুষ্ট চরিত্রের লোকেরা যাতে দলে না ঢুকতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা?
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও একটি সত্য প্রকাশ পেল যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত আওয়ামী লীগে ইচ্ছা করলেই দলের আদর্শের বিরোধী ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারক বিএনপির নেতা-কর্মী এবং মৌলবাদী জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে৷
সম্প্রতি ফেনী ও নারায়ণগঞ্জে যে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার মূল হোতা ও নেপথ্যের কুশীলবদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অাধাআধি সত্য মিলবে৷ পুরো সত্য হলো, আওয়ামী লীগের পুরোনো মাস্তান ও গডফাদাররা নিজেদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে এবং দলের ভেতরেই প্রতিপক্ষ শক্তিকে ঘায়েল করতে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত-িশবিরের সন্ত্রাসীদের ফুলের মালা দিয়ে দলে নিয়ে আসেন৷ বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার লেনদেনও হয়৷ যিনি টাকা দিয়ে দলে আসেন, তিনি তো সেই টাকা উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেনই৷ কিন্তু যেসব নামীদামি নেতা টাকার বিনিময়ে এসব অনুপ্রবেশকারীকে বরণ করে নেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, যাঁরা ঘটাতে সহায়তা করেছেন, তাঁদের মধ্যে বনেদি ও নবাগত আওয়ামী লীগার যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিরোধী দলের নেতা–কর্মীরাও৷ অনেক সময়ই পুরোনোদের কনুইয়ের গুঁতায় ঠেলে দিয়ে দলে নবাগতরাই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন৷ বিরোধী দলের নেতাকে কাঁচপুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রাখার কাজে যদি কোনো নবাগত সন্ত্রাসীকে ব্যবহার করা হয়, সেই ব্যক্তিটি যে নিজেকে দল ও সরকার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করবেন, তাতে সন্দেহ কী?
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় আসামি হিসেবে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান বিএনপি-জামায়াতের লোক যেমন আছেন, তেমনি আছেন বনেদি আওয়ামী লীগাররাও৷ চোরে চোরে মাসতুতো ভাই৷ এক দলের সজ্জন নেতাদের সঙ্গে অন্য দলের সজ্জন নেতাদের যেমন সৌহার্দ্য ভাব গড়ে ওঠে, তেমনি এক দলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অন্য দলের সন্ত্রাসীদের আঁতাত হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়৷ রাজনীতিতে প্রথম পক্ষ যত ক্ষীয়মাণ হচ্ছে, দ্বিতীয় পক্ষ ততই বলবান হচ্ছে৷
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন স্বৈরাচারী এরশাদের দোসর ও জাতীয় যুব সংহতির নেতা নাসিম ওসমানের হাত ধরে আশির দশকের শেষে রাজনীতিতে আসেন৷ নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই নূর হোসেন বিএনপিতে যোগ দেন এবং স্থানীয় বিএনপির সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের প্রধান লাঠিয়াল হন৷ কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৮ সালে নূর হোসেনকে যিনি ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতা শামীম ওসমান৷ ১৫ বছর পর এসে প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারী ও বনেদির সংজ্ঞা কীভাবে ঠিক করবেন?
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পর শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনও পালিয়ে গিয়েছিলেন৷ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালালেও সবাই তো শামীম ও হোসেনদের মতো পালিয়ে যাননি৷ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গুরু-শিষ্য দুজনই এলাকায় ফিরে আসেন৷ সে সময়ে শামীমের অসুবিধা ছিল, তাঁর আসার আগেই ২০০৮ সালের নির্বাচনটি হয়ে গেছে৷ তিনি সাংসদ হতে পারেননি৷ আর নূর হোসেনের সুবিধা ছিল, তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর হন এবং দলের ও প্রশাসনের সহায়তায় নিজে খুদে মাফিয়া হয়ে ওঠেন৷ তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য উত্থান রহিত করার কেউ ছিল না৷ যখন একজন খুদে মাফিয়া টাকা দিয়ে সবকিছু কিনতে পারেন, তখন তিনি কাউকেই পরোয়া করেন না৷ আর গুরুর সঙ্গে নূর হোসেনের হৃদয়ের বন্ধন এতটাই অবিচ্ছেদ্য যে সাত খুনের পরও তা ছিন্ন হয়নি৷ বহুল আলোচিত অডিও টেপে দেখা যায় যে শামীম ওসমান তাঁকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুপরামর্শ দিয়েছেন৷
প্রধানমন্ত্রী যাঁদের অনুপ্রবেশকারী বলছেন, তাঁরা কেন এক দল ছেড়ে অন্য দলে যান, সেই কথাটি উল্লেখ করলে দেশবাসী পরিষ্কার ধারণা পেত৷ যেহেতু বিরোধী দলে থেকে এসব দখলদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস করতে তেমন সুবিধা হয় না, র‌্যাব-পুলিশের নজরদারিতে থাকতে হয়, সেহেতু তাঁরা বরাবর সরকারি দলে আশ্রয় নিয়ে থাকেন৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই একবার এদের পিজিপি বা প্রেজেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন৷ তিনি কি হিসাব করে দেখেছেন, ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগে এই পিজিপি সদস্যদের সংখ্যা কত?
প্রধানমন্ত্রীর কথা সত্য হলে আওয়ামী লীগে এ রকম দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা দলে এসে িনর্বিঘ্নে খুনোখুনিও করতে পারেন৷ আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নীরব দর্শকের মতো তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন৷
আর অনুপ্রবেশকারীরা সব সময় সরকারি দলে যায় কেন? এর মাধ্যমে তাঁরা দুটি সুবিধা আদায় করেন৷ প্রথমত, বিগত আমলের সব অপকর্মের দায়মুক্তি৷ দ্বিতীয়ত, নতুন করে অপকর্মের ছাড়পত্র৷ তাঁরা যেহেতু সরকারি দলে নাম লিখিয়েছেন, সেহেতু নতুন অপকর্মে লিপ্ত হতে কোনো বাধা নেই৷ আর প্রশাসনের ঘাড়ে কটি মাথাযে তারা সরকারি দলের এমন খুদে মাফিয়া ও নির্বাচিত কাউন্সিলরের গায়ে হাত দেয়৷ নূর হোসেন অনেকের চেয়ে চালাক ছিলেন বলেই তিনি শুধু দলের ক্ষমতার ওপর ভরসা না করে টাকার ক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন৷ শোনা যায়, তাঁর হাত এতই লম্বা যে সেটি নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসনের ছোট লাটদের ছাড়িয়ে ঢাকার সচিবালয় তথা বেইলি রোড-মিন্টো রোড-হেয়ার রোড পর্যন্ত প্রসারিত ছিল৷
ফেনীর একরামুল হত্যার ঘটনাটি আরও জটিল৷ এখানে একদা গডফাদার জয়নাল হাজারী যেসব শিষ্য-প্রশিষ্য তৈরি করেছিলেন, তাঁরাই পরবর্তীকালে বিভিন্ন ফেঁকড়ায় ভাগ হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একের পর খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন৷ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জয়নাল হাজারী গঠন করেন প্রাইভেট বাহিনী৷ তিনি যত দিন ফেনীতে ছিলেন, তত দিন তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ ছিল না৷ কিন্তু ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে তিনি ভারতে পালিয়ে যান৷ তখন তাঁর শিষ্যরা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে কেউ তাঁর পক্ষে কেউ বিপক্ষে অবস্থান নেন৷ নিজেদের শক্তি বাড়াতে এঁদের কেউ বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পক্ষে টেনে আনেন৷ ফলে একদা চট্টগ্রামে শিবিরের ঘাতক বাহিনীর সদস্যও আওয়ামী লীগের ছায়াতলে এসে আগের অভিজ্ঞতা ঝালাই করতে থাকেন৷ ফেনীতে আওয়ামী লীগের উঠতি নেতারা প্রতিপক্ষের শক্তি খর্ব করতে এঁদের ব্যবহার করেন৷
জাতীয় রাজনীতিতে যত বিরোধই থাক না কেন স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি এমনকি জামায়াতের নেতারাও একসঙ্গে ব্যবসা–বাণিজ্য, ঠিকাদারি, টেন্ডারবাজি করে থাকেন৷ এসব ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী যেমন চরম শত্রু হন, তেমনি বিরোধী দলে থাকা প্রতিযোগী হয়ে ওঠেন পরম বন্ধু৷
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন ও ফেনীতে একরাম হত্যার আসামিদের তািলকা দেখলে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নামই এসেছে৷ অনেকের ফোনালাপের বিষয়াদি জনসমক্ষে প্রকাশিত৷ তাই বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে ঢুকে সব খুন ও সন্ত্রাস করছেন বলা সত্যের অপলাপ বলেই মনে করি৷
জাতীয় রাজনীতিতে যখন আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ, তখন স্থানীয় পর্যায়ে কেবল নারায়ণগঞ্জ বা ফেনী নয়, বহু স্থানে আওয়ামী লীগে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশের গূঢ় রহস্যটা কী? রহস্যটা হলো, রাজনীতি এখন নীতি ও আদর্শ পেছনে ফেলে হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার৷ সেই সুবিধা আদায়ের পথে যখন কেউ কাউকে পথের কাঁটা মনে করছেন, তাঁতেই সরিয়ে দিচ্ছেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর কায়দায়৷
আমাদের জাতীয় নেতারা আলোচনা করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন দিতে না পারুন, একে অপরের বিরুদ্ধে যত খুশি বিষোদগার করুন না কেন, তাঁদের অনুসারীরা মিলেমিশেই খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন৷ অন্তত নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর ঘটনা তাই প্রমাণ করছে৷
রাজনীতির এই বিধ্বংসী ও বিনাশী প্রবণতাকে কেবল অনুপ্রবেশকারী সমস্যা বলে পার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না৷ প্রধানমন্ত্রী কী বলেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
[email protected]

শেয়ার করুন