কিভাবে কাজ করে মানবদেহ ঘড়ি ?

0
398
Print Friendly, PDF & Email

‘মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিসত্মরী বানাইয়াছে, মন আমার দেহ ঘড়ি’৷ বাংলা গানের শ্রোতারা হয়ত আব্দুল রহমান বয়াতির গাওয়া এই গানটি কখনো না কখনো শুনেছেন৷ কিন্তু এই যে মানব দেহকে একটি ঘড়িরমত যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যা জন্ম থেকে মৃতু্য পর্যনত্ম নিখুঁতভাবে আপনা আপনি চলতে থাকবে৷ এ কিন্তু শুধুই দেহতত্ববাদি বাউল, কবির কল্পনা নয়৷

মানব দেহের ভেতরের সব কার্যক্রমই দিন রাতের এক একটি পর্বের সঙ্গে সময় মিলিয়ে বাধা আছে৷ যার ব্যতিক্রম হলে দেহের জটিল প্রক্রিয়াগুলো উল্টো-পাল্টা হয়ে যায়৷ দেখা দেয় নানা রকম সমস্যা৷ কিভাবে কাজ করে এই দেহ ঘড়ি ?

বিজ্ঞানীরা বলেন সত্যি মানুষের দেহ ঘড়িরমত করেই কাজ করে৷ মানবদেহের সব কর্যক্রমেরই একটা নির্দিষ্ট সময়সূচি আছে৷ কখন দেহ জেগে থাকবে, কখন দেহ ঘুমোবে৷ বিজ্ঞানীরা আরো বলছেন, মানুষের সমাজ এবং জীবণ যাপন এমন হয়ে গেছে যে তারা ক্রমাগত এই দেহ ঘড়ির সময়সূচির গুরম্নত্বকে উপেৰা করছে এবং এর পরিণামে মানব দেহের স্বাভাবিক কার্যক্রম গুরম্নতরভাবে ব্যহত হয়ে দেখা দিতে পারে নানা রকমের রোগ ব্যধি৷

বিজ্ঞানীরা দেখেন যে প্রতি ২৪ ঘন্টায় মানব দেহের কার্যক্রমের ৮ টি পর্ব আছে৷ মানুষের এই দেহ ঘড়ির মূল কেন্দ্র হল মসত্মিস্কের সুপ্রা সিয়াসমেটিক নিউক্লিন (এস সি এন)৷ আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের একটি দৈনিক ছন্দ আছে যা নিয়ন্ত্রীত হয় এই মাস্টার ক্লক দিয়ে৷ দিনের আলোর ভূমিকা এখানে অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ৷ মানুষের চোখের মধ্যে কিছু বিশেষ কোষ আছে৷ যা দিনের আলোর মাত্রা বুঝে এই ঘড়ির সঙ্গে দেহের কার্যক্রমের সংগতি বিধান করে৷

যখনই দিনের আলো কমে অন্ধকার হতে থাকে তখনই আমাদের দেহ ঘড়ি তৈরি করতে শুরম্ন করে ঘুম পাড়ানোর বিশেষ হরমোন মেলাটনিম৷ আবার যখন দিনের আলো ফুটতে থাকে তখন মানুষের চোখ সেটা টের পায় এবং দেহ ঘড়ি মেলাটনিম তৈরি করা বন্ধ করে দেয়৷

সকাল ৬ টা থেকে ৯ টা ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময়৷ কিন্তু সাবধান, এসময় হৃদরোগে আক্রানত্ম হবার ঝুঁকি সব চাইতে বেশি৷ কারণ এই সময় আপনার দেহের রক্ত থাকে ঘন৷ আর রক্তবাহী নালীগুলোও থাকে শক্ত অবস্থায়৷ রক্তে চাপ থাকে সবচাইতে বেশি৷ তাই শরীর চর্চার জন্য এটা ভালো সময় নয়৷

সকাল ৯ টা থেকে ১২ টা৷ আপনার দেহ এবং মন এখন সবচাইতে চাঙ্গা এবং কর্মৰম৷ মানসিক চাপ মোকাবেলার ৰমতা দেয় যে কটিসম হরমোন তার মাত্রা এখন আপনার দেহে সর্বোচ্চ৷ তাই আপনার মসত্মিস্ক এখন সব চাইতে বেশি সচেতন৷ আপনার স্মৃতিশক্তিও আছে সব চেয়ে ভালো অবস্থায়৷ তাই কোন কাজ করার এটাই সবচাইতে ভালো সময়৷

দুপুর ১২ টা থেকে বিকেল ৩ টা৷ এটা দুপুরের খাবার সময়৷ সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই অপনার দেহের খাদ্য হজমের প্রক্রিয়া চলছে দ্রম্নত গতিতে৷ কিন্তু মনে রাখবেন দুপুরে খাবারের পর পরই স্বাভাবিক অবস্বাদ আর ঘুমরে ভাব আসে৷ চাঙ্গাভাবটা কমে যায়৷ দেখা গেছে এই সময়টাতেই গাড়ি চালাতে গিয়ে দূর্ঘটনা, বয়স্ক পথচারিদের গাড়ি চাপা পড়া বেশি ঘটে৷

বিকেল ৩ টা থেকে ৬ টা৷ এটা এমন একটা সময় যখন আপনার ফুসফুস হৃদপিন্ড সবচাইতে ভালোভাবে কাজ করছে৷ আপনার দেহের তাপমাত্রা এখন সব চেয়ে বেশি৷ দেহের পেশীগুলোও দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী অবস্থায় আছে৷ শরীর চর্চা বা খেলঅ ধুলা করার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো সময়৷ হৃদপিন্ডের নানা সমস্যার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে কোলেস্টরেল৷ এটা আমাদের দেহে তৈরি হয় রাতের বেলা৷ তাই যদি আপনি কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণে অসুদ খান তাহলে তা খাবার সব থেকে ভালো সময় হল সন্ধ্যে বেলা৷

সন্ধ্যে ৬ টা থেকে রাত ৯ টা৷ আপনার রাতের খাবার সময়৷ তবে বেশি দেরি করবেন না৷ রাতের খাবারটা চেষ্টা করবেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খেয়ে নিতে৷ খাবারের পরিমানটাও কমিয়ে দিন৷ সাম্প্রতিক গবেষনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে দিনের আলো কমে এলে মানবদেহের আবার হজম হবার প্রক্রিয়াটাও কমে আসে৷ রাতের বেলা আপনি যদি বেশি খাবার খান তাহলে মোটা হয়ে যাওয়া এবং ডায়বেটিস হবার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়৷ আর আপনি যদি অল্প-সল্প মদ্যপান করার অভ্যাস থাকে তাহলে সব চাইতে ভালো সময় হল সন্ধ্যে বেলা৷ কারণ এই সময় আপনার লিভারের এ্যালকোহল হজম করার ৰমতা বেশি থাকে৷

আমরা সাবই জানি আপনি কি খাচ্ছেন তার ওপরে আপনার কোমরের মাপ কি হবে তা নির্ভর করে৷ কিন্তু আপনি কখন খাচ্ছেন দেহ ঘড়িও কি এই প্রক্রিয়াই ভূমিকা রাখে ? এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করছেন বিবিসির স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদক জেমস গ্যালাহার৷

আমরা যখন দুপুরের খাবার খায় তখন আমাদের লিভার এবং তন্ত্রগুলো হজম করার জন্য পুরোপুরি তৈরি থাকে৷ কিন্তু দিনের আলো যত কমতে থাকে ততই আমাদের শরীরের চর্বি এবং শর্করা হজম করার ৰমতাও কমতে থাকে৷ বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যারা ডায়েটিং করছেন অর্থাত্‍ খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে ওজন কমাবার চেষ্টা করেন তারাও যদি দিনের প্রধান খাওয়াটা রাতের বেলা না খেয়ে দুপুর বেলা খান তাহলে ওজন কমানোটা সহজ হয়ে যায়৷ এটা ঠিক যে আপনি কি খাচ্ছেন তা সব সময়ই কখন খাচ্ছেন তার চাইতে বেশি গুরম্নত্বপূর্ণ৷ কিন্তু মাঝ রাতে খাবার বেশি খাওয়াটা আপনার জন্য একেবারেই অনুকুল নয়৷

রাত ৯ টা থেকে ১২ টা৷ ঘুমাতে যাবার সময়৷ আপনার মসত্মিস্কে হিনিয়াম বস্নান্ড নামে একটি গ্রন্থি এখন ঘুম পাড়ানোর হরমোন মেলাটনিন নিঃস্বরণ করে দিয়েছে৷ এই সময় আপনার দেহের তাপ মাত্রাও একটু কমে যাচ্ছে৷ আপনার দেহ ঘড়ি জানান দিচ্ছে ঘুমোতে যাবার সময় হয়েছে৷

কিন্তু এযুগের মানুষের জন্য ঘুমোতে যাওয়া অত সহজ নয়৷ রাতে আমরা টিভি দেখি, কম্পিউটার নিয়ে ব্যসত্ম হয়ে পড়ি৷ এখন আবার তার জায়গা নিচ্ছে ট্যাবলেট বা স্মার্ট ফোন৷ এগুলো ক্রমশই আপনার সুনিদ্রার পথে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে৷ বিবিসির বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিবেদক ভিক্টোরিয়া গিল জানাচ্ছেন, ভালো ঘুমের জন্য আপনাকে কি করতে হবে৷

অনেকেই আলো জ্বালানো অবস্থায় ঘুমোতে পারেন না৷ কারণ চোখে আলো পড়লে মসত্মিস্ক থেকে ঘুম পাড়ানি হরমোন মিলাটনিন নিস্বরণ কমে যায়৷ আর স্মার্ট ফোন, ফ্লাটস্ক্রিন টিভি বা কম্পিউটারের নীল আলো একইভাবে মিলাটনিন নিস্বরণ ব্যহত করে ভালো ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়৷ আপনি এগুলোর উজ্জলতা কমিয়ে দিয়ে এর খারাপ প্রভাব কিছুটা কমাতে পারেন৷ তবে সব চেয়ে ভালো হয় যদি ঘুমের আগে ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউব নিয়ে সময় না কাটান৷ আপনার শোবার ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখা এবং তা যেন বেশি গরম না হয় এদিকে খেয়াল রাখা একারণেই গুরম্নত্বপূর্ণ৷ ঘুমানোর আগে মদ্যপান করবেন না৷ তাতে াাপনার মাঝ রাতে ঘুম ভাঙার সম্ভবনা বেড়ে যাবে৷ বরং পানি খান৷

রাত ১২ টা থেকে ৩ টা৷ এসময় আপনার ঘুমনত্ম থাকার সময়৷ আপনার দেহ ঘড়ি ধরে নিচ্ছে আপনি নিদ্রীত আছেন৷ আপনার দেহে মেলাটনিনের মাত্রা এখন সবের্াচ্চ৷ আপনার সচেতনতা এখন সর্ব নিম্ন সত্মরে৷ আপনার মসত্মিস্ক এসময় আপনার সারা দিনের যেসব ৰতিকর টকসিন জমেছে তা ধুয়ে মুছে পরিস্কার করছে৷ আপনাকে যা যা মনে রাখতে হবে সেইসব স্মৃতিকে সাজিয়ে গুছিয়ে সংরৰণের ব্যবস্থা করছে৷ ফলে এই সময় যদি আপনি জেগে থাকতে বা কাজ করতে বাধ্য হন তাহলে সাবধান৷ বড় বড় কারখানায় নাইট শিফটেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি থাকে৷

আমাদের সবার ভেতরেই আছে একটি নিজস্ব দেহঘড়ি এবং বয়সের সাথে সাথে তার কাজের প্রকৃতি বদলে যায়৷ সেই জন্যই শিশুরা বেশি ঘুমায় আবার বুড়ো বয়সে মানুষের ঘুম কমে যায়৷ কে কতটুকু ঘুমোবে তার নির্দিষ্ট কোন নিয়ম নেই৷ সাধারণভাবে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্য ৮ ঘন্টা ঘুম খুবই দরকার৷ কিন্তু গবেষনায় বলে প্রাপ্ত বয়স্কের বেশিরভাগই যতটা দরকার তার চাইতে কম ঘুমান৷

রাত ৩ টা থেকে ভোর ৬ টা৷ আপনি এখন গভীর ঘুমে কিন্তু ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে আপনার দেহে মেলাটনিনের পরিমাণ আসত্মে আসত্মে কমে আসবে৷ দিনের অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় এখন আপনার দেহের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন সত্মরে৷ কারণ এই সময়টা আপনার দেহে এই যে শক্তি তৈরি হচ্ছে তা খরচ হচ্ছে আপনার দেহের নানা রকম মেরামতের কাজে৷ যেমন আপনার দেহের ত্বকের নতুন নতুন কোষ তৈরি৷

এই কারণেই যারা সাধারণ কাজের সময়ের বাইরে যেমন ধরম্নন রাতের বেলা শিফটে কাজ করেন তাদের দেহ ঘড়ির স্বাভাবিক ছন্দ প্রতি নিয়ত বিনষ্ট হচ্ছে৷ তার ফলে এই ধরণের কাজ যারা করেন তাদের মধ্যে ক্যান্সার, ডায়বেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি রোগ হবার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা৷ সুতরাং দেহ ঘড়ির যত্ন নিন৷ বিবিসি

শেয়ার করুন