সব খুনি শনাক্ত

0
44
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনার রহস্য উন্মোচন হতে শুরু করেছে। পুলিশ শনাক্ত করেছে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব খুনিকে। তদন্তে বেরিয়ে আসছে পরিকল্পনা থেকে শুরু করে খুনের নানা অজানা তথ্য। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছে, খুনের সঙ্গে জড়িতরা শনাক্ত হয়েছে। অপহরণ, খুন ও গুমের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য- প্রমাণ মিলেছে। এরাই সাত খুনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নেয়।

গত ২৭ এপ্রিল অপহরণ এবং খুনের ঘটনার পর থেকে পুলিশ নিজের মতো করে তাদের তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে। পুলিশের উচ্চ পর্যায় থেকে ঘটনার তদন্ত মনিটরিং করা হচ্ছে। তদন্তকারী দল নিয়মিত পুলিশ সদর দফতরে তাদের কাজের অগ্রগতি জানাচ্ছেন।

জানা গেছে, নূর হোসেনের উদ্ধার করা গাড়ি, অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের মোবাইল ফোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে পুলিশের তদন্তকারী দল। পাশাপাশি নিহত সাতজনের পরিবারের বক্তব্য গুরুত্ব সহকারে দেখছে দলটি। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, মামলার অন্যতম আসামি হাসমত আলী হাসু গ্রেফতার হওয়ায় ঘটনার নেপথ্য বেরিয়ে আসবে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, এই সাত খুনে মূলত দুটি গ্রুপ অংশ নিয়েছে। একটি গ্রুপ নেপথ্যে থেকে অর্থায়ন করেছে। অপর গ্রুপ সরাসরি অংশ নিয়েছে কিলিং মিশনে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে সূত্রটি জানায়, সরাসরি অংশ নেওয়া গ্রুপের সদস্যরা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার প্রশিক্ষিত এবং এ কাজে অভ্যস্ত। খুনিদের টার্গেটে ছিল শুধুমাত্র নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম। কিন্তু সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাত-এ। অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ঘটনাটি দেখে ফেলার কারণেই তিনি পরিস্থিতির শিকার হন। চরম মূল্য দিতে হয় তাকে জীবন দিয়ে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, যারা একজনকে টার্গেট করে প্রস্তুতি নিয়েছিল, সেই একই প্রস্তুতিতে তারা সাতজনকে টার্গেটে পরিণত করেছে। প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া যা কখনই সম্ভব নয়। পুলিশের তদন্তকারী দলের একটি সূত্র জানায়, ঘটনার দিন আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় নজরুলকে অনুসরণকারী এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করা হয়। সেই ব্যক্তিকে পুলিশে সোপর্দ করে নজরুলের লোকজন। কিন্তু আদালতে পুলিশের কাছে ওই ব্যক্তি নিজেকে র্যাবের সদস্য বলে পরিচয় দেন। তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম পার হয়ে ২০০ গজ সামনে থেকে গাড়িচালক, তিন সহযোগীসহ নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককে অপহরণের পর তাদের শহরের কাছেই রাখা হয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই অপহরণের ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছিল তিনটি মাইক্রোবাস, যা পুলিশ পরে শনাক্ত করেছে। সাতজনকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল দুটি নৌকা। তদন্তকারী দলের ওই সূত্র বলেছে, ঘটনার দিন আদালত থেকে ফেরার সময় নজরুলের সহযোগীদের কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্র ছিল। কিন্তু তারা ব্যবহারের সুযোগ পায়নি অথবা অপহরণকারীদের পরিচয় পেয়ে তা ব্যবহার করেনি।

ভারত পালাচ্ছিলেন হাসু : সাত খুনের অন্যতম আসামি হাসমত আলী হাসু ভারত পালাচ্ছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিকে ফাঁকি দিতে পারেননি তিনি। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তিনি গ্রেফতার হয় যশোর সীমান্ত এলাকা বেনাপোল থেকে। গতকাল অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে তাকে ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ছয় কোটি টাকার ঘুষের লেনদেনের খবর এই হাসুর কাছ থেকেই প্রথম পেয়েছিলেন নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যান। আর এই হাসু হলেন শহীদ চেয়ারম্যানের সৎভাই। খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনের ক্যাশিয়ার হাসমত আলী হাসুকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিকালে ঢাকা নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। তবে হাসুকে গ্রেফতারের বিষয়টি স্বীকার করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার আগে হাসুর কাছ থেকে শহীদ চেয়ারম্যান জানতে পারেন যে, তার জামাতা নজরুলকে র‌্যাব দিয়ে অপহরণের পর হত্যা করা হবে। আর এ জন্য ছয় কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট হয়েছে র‌্যাব-১১ এর সঙ্গে। পরে হাসুর কাছে গিয়ে তিনি তার জামাতার প্রাণভিক্ষা চান। এ সময় হাসু তাকে বলেছেন যে, ভাইয়ের মেয়ে মানে নিজের মেয়ে। নিজের মেয়ের জামাইকে কেউ হত্যা করতে পারে? এমন পাল্টা প্রশ্ন রেখেছিলেন শহীদের কাছে তার সৎভাই হাসু। আর এসব কথা শহীদ চেয়ারম্যান পুলিশের কাছেও বলেছে। শহীদ চেয়ারম্যানের এসব তথ্য সঠিক কি-না, নূর হোসেনের বর্তমান অবস্থান, র‌্যাবের সম্পৃক্ততা-এমন সব তথ্য পাওয়া যাবে এই হাসুর কাছ থেকেই। এই মুহূর্তে হাসু হলেন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। নূর হোসেনের আদ্যোপান্ত থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ- সবই মিলবে তার কাছ থেকে।

নূর হোসেনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ : সেভেন মার্ডার মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল সন্ধ্যায় সেভেন মার্ডার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মণ্ডলের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালত এ ক্রোকের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক হাবিবুর রহমান ও সহকারী পরিদর্শক আশরাফ জানান, সেভেন মার্ডার মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ ক্রোক আদেশ দেওয়া হয়।

শেয়ার করুন