মাদকে টঙ্গী ওসির মাসিক আয় কোটি টাকা

0
471
Print Friendly, PDF & Email

মাদকে ভাসছে শিল্পশহর টঙ্গী। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে মাদক বিক্রি হচ্ছে দেদার। মাদকের এই সহজলভ্যের কারণে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও বিপথগামী হচ্ছে। টঙ্গী থানা পুলিশের মাসোহারার প্রধান উৎসই এখন মাদক। এ খাত থেকে শুধু থানার ওসির মাসে নির্ধারিত আয় কোটি টাকা।
সূত্র মতে, মাদকের এই সহজলভ্যের জন্য থানা পুলিশই দায়ী। পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের আটক না করে বরং মাদক ব্যবসায় চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টঙ্গীর একজন পুরনো মাদক ব্যবসায়ী চরম হতাশা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘এই অভিশপ্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। কিন্তু পুলিশের কারণে পারছি না। এক সপ্তাহ থানার ওসিকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দিলেই পুলিশের নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। বৃদ্ধ বয়সে জেল খাটতে চাই না; তাই বাধ্য হয়েই মাদক ব্যবসায়ের মাধ্যমে পুলিশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে।’ বর্তমান ওসি অন্যত্র বদলি হওয়ার পর তিনি এই অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথ দেখছিলেন বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু ওসি ইসমাইল হোসেন পুনরায় বদলি হয়ে টঙ্গী থানায় আসার পর তাকে মাদক ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। তার মতো অন্য যারা মাদক ব্যবসায় ছেড়ে দিয়েছিলেন এমন প্রত্যেকে ওসিকে নিয়মিত বখরা দিতে হচ্ছে। ‘মাদক ব্যবসায় করলে এলাকায় থাকা যাবে; আর না করলে এলাকা ছাড়তে হবে’, ওসির তৎপরতায় বর্তমানে পরিস্থিতি এমনপর্যায়ে দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্রটি জানায়, ওসি ইসমাইল হোসেন তার আস্থাভাজন এএসআই মিজানুর রহমানের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধীর কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত এসব টাকা নেন। এএসআই মিজানুর রহমান ও ওসির মোবাইল কললিস্ট পরীক্ষা করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে দাবি করে সূত্রটি আরো জানায়, ফেনসিডিলের পাইকারি বিক্রেতা টঙ্গীর দেওড়া পরান মণ্ডলের টেকের রাজিয়ার কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে ৩০ হাজার টাকা, টঙ্গী বাজার মুরগি পট্টির পাইকারি ফেনসিডিল ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান ওরফে হাবুর কাছ থেকে সপ্তাহে ২৫ হাজার টাকা, চেরাগ আলী মার্কেটের পাইকারি মদব্যবসায়ী আলমের কাছ থেকে সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা, মরকুনের পাইকারি গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসায়ী দেলোর বউয়ের কাছ থেকে সপ্তাহে ২০ হাজার টাকা, মিলগেটের পাইকারি ইয়াবা ব্যবসায়ী সেলিমের কাছ থেকে সপ্তাহে ১৫ হাজার টাকা, এরশাদ নগরের পাইকারি গাঁজা ব্যবসায়ী হালিমের কাছ থেকে সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা, একই এলাকার পাইকারি গাঁজা ব্যবসায়ী লাইলির কাছ থেকে সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা, কেরানির টেক বস্তির ফেনসিডিলের পাইকারি ব্যবসায়ী কথিত তাজুর বউ বা জামালের ভাবী শাহিদার কাছ থেকে সপ্তাহে ৪০ হাজার টাকা এবং চিহ্নিত দেহব্যবসায়ী মক্ষিরানী লতার আস্তানা থেকে সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা, আলোর আস্তানা থেকে সপ্তাহে ১৫ হাজার টাকা, শিমার আস্তানা থেকে সপ্তাহে ১২ হাজার টাকা, কথিত ভাবীর আস্তানা থেকে সপ্তাহে ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এএসআই মিজানের কথিত বডিগার্ড সোর্স পলাশের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত রেটে বখরার টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রতি সপ্তাহে পুলিশের এই বখরাকে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের পরিভাষায় ‘হাত্তা’ বলা হয়। পুলিশকে হাত্তা বন্ধ করে দিলেই শুরু হয় ধরপাকর ও নির্যাতন। প্রতি মাসে এই হাত্তা বা বখরার টাকা না তুলে প্রতি সপ্তাহে উত্তোলনের কারণ জানতে চাইলে সূত্রটি জানায়, কোনো কারণে স্পট বা মাদক ব্যবসায় বন্ধ হয়ে গেলে চলমান বা বিগত মাসের বখরা আদায় হয় না। এতে পুলিশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ায় মাসের পরিবর্তে প্রতি সপ্তাহে বখরার টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে অন্যান্য খাত যেমন ভাঙারি ব্যবসায়, পরিবহন ব্যবসায়, টেম্পোস্ট্যান্ড, ফুটপাথ, স্টেশন রোডের ফলপট্টি, মহাসড়কের ট্রাকস্ট্যান্ড ইত্যাদি খাত থেকে প্রতি মাসে বখরার টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয় থানা পুলিশের পরিভাষায় মাসিকভিত্তিক এই বখরার টাকাকে ‘মাইসক্যা’ বলা হয়। আগে টঙ্গীর নির্দিষ্ট কয়েকটি বস্তিতে মাদকদ্রব্য বিক্রি হতো। আর এখন প্রতি পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে বিক্রি হয়। বর্তমানে টঙ্গীর এরশাদ নগর বস্তিতেই শতাধিক মাদকের স্পট রয়েছে। সেখানকার এক পাইকারি মাদক ব্যবসায়ী স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতার শেল্টারে থেকে পুলিশকে বখরা না দিয়েই মাদক ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠায়। টঙ্গীর মরকুন আমতলী এলাকায় একটি প্রভাবশালী পরিবারের নাম ভাঙিয়ে একচেটিয়া মাদক ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে টঙ্গীর ঐতিহ্যবাহী পুরনো মাদক ব্যবসায়ী মনির। সে থানা পুলিশকে নিয়মিত বখরা না দিলেও মাঝেমধ্যে সরকারি দলের স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও থানার ওসিকে মোটা অঙ্কের ‘ডোনেশন’ দিয়ে থাকে।
সূত্র মতে, টঙ্গীর কেরানির টেক ও হাজী মাজার বস্তির ঘরে ঘরে মাদক বিক্রি হয়। বস্তি দুটিতে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করতে হলে কারা মাদক ব্যবসায় করে না এ তালিকা আগে করতে হবে। নতুবা সংখ্যাধিক্যের কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ কারা মাদক ব্যবসায় জড়িত না তাদেরকে এই দুই বস্তির মোট জনসংখ্যা থেকে বিয়োগ দিলে বাকি সবাই মাদক ব্যবসায়ী। এমনকি বর্তমানে টঙ্গীর শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও মাদক ঢুকে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ ও পকেটে ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। শ্রেণিকক্ষে নেশা গ্রহণ ও ক্রয়-বিক্রয়ের অভিযোগে টঙ্গীর নামীদামি একটি স্কুলের ১০ ছাত্রকে ইতঃপূর্বে বহিষ্কার করা হয়েছে। দল বেঁধে স্কুল ফাঁকি দিয়ে বেড়ানোর নাম করে মাদক গ্রহণেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সাতাইশ এলাকার একটি স্কুলের কিছু ছাত্র প্রায়ই দল বেঁধে কাস ফাঁকি দিয়ে মাদকের আড্ডা বসায় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার স্কুল প্রাঙ্গণে নবম শ্রেণীর মাদকাসক্ত এক ছাত্র সহপাঠীকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। ওই ছাত্র স্কুলব্যাগে দা, ছোরা ও মাদক বহন করে বলে তার সহপাঠীরা অভিযোগ করেছে। টঙ্গীতে মাদকদ্রব্যের ব্যাপক ছড়াছড়ির কারণে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের স্থানীয় সভা-সমাবেশ, সেমিনার বা আচার অনুষ্ঠানে বক্তাদের মাদক নিয়ে দারুণ উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এসব অনুষ্ঠানে বক্তারা মাদককে যুবসমাজ তথা আগামী প্রজন্ম বিধ্বংসী ভয়াবহ আগ্রাসন হিসেবে অভিহিতি করেছেন। অনেকে সমাজ তথা দেশ ধ্বংস করতে একে অস্ত্রবিহীন যুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে ওসি এই থানায় পোস্টিং নিয়েছেন এই অজুহাতে তিনি টাকা ‘উঠাতে’ যা ইচ্ছা তাই করছেন।
এ দিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে থানা পুলিশের মাদক উদ্ধার ও এসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা একেবারে নগণ্য। মাঝেমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে উদ্ধার বা গ্রেফতার দেখানো হলেও মামলার এজাহার, চার্জশিট, সাক্ষী ইত্যাদিতে আইনি মারপ্যাঁচ রেখে মাদক ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেয়া হয়। এ ব্যাপারে টঙ্গী মডেল থানার ওসি ইসমাইল হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আলোচিত বখরার অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, মাদক বন্ধ করা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আগের ওসিরা বন্ধ করতে পারেননি আমিও পারব না। তবে আমি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।

শেয়ার করুন