রহস্যময় সেই তিন মাইক্রো কোথায়

0
128
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয় : নয়া দিগন্ত
রহস্যময় সেই তিনটি মাইক্রোবাস কোথায়? ২৮ এপ্রিল যে মাইক্রো তিনটি সিদ্ধিরগঞ্জ পুলিশ চেকপোস্টে থামানো হয়েছিল; কারা ছিলেন সেই মাইক্রোবাসে? এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের কাছে। তারা খুঁজছেন সেই তিনটি মাইক্রোবাস। ধারণা করা হচ্ছে ওই মাইক্রোবাস তিনটিতেই লাশগুলো শীতলক্ষ্যা পাড়ে নেয়া হয়। এ দিকে সেভেন মার্ডারের মূল আসামি নূর হোসেনের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে গতকাল বিপুল মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অপহরণের চার দিন পর গত ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং চন্দন সরকারসহ ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পর দিন সকালে উদ্ধার হয় আরো একজনের লাশ। গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে অপহৃত হন নজরুল, তার তিন বন্ধু তাজুল, স্বপন, লিটন, তাদের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর, নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। ঘটনার পরই নাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর হোসেন, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন, নজরুলের চাচাশ্বশুর হাসমত আলী হাসু, ইকবাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় মামলা করা হয়। সূত্র জানায়, এই আসামিদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের ডিসি, এসপি, র‌্যাব-১১ এর কমান্ডিং অফিসার, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পুলিশের আরো প্রায় ৮০ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয় ওই অঞ্চল থেকে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গত ২৭ এপ্রিল বিকেলে সাতজনকে অপহরণের পর রাত ৩টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ পুলিশ চেকপোস্টে তিনটি রহস্যজনক মাইক্রোবাস আটক করা হয়েছিল। ওই মাইক্রোবাস থেকে একজন বের হয়ে নিজেকে একটি বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয় দেন এবং বলেন, তার সিনিয়র অফিসারও গাড়িতে রয়েছেন। পুলিশ সদস্যরা তখন জানতে চেয়েছিলেন, তারা সিভিল গাড়িতে কেন। কিন্তু ওই কর্মকর্তা কোনো উত্তর না দিয়েই গাড়িতে উঠে চলে যান। ওই গাড়িগুলো ঠিক ৪৫-৫০ মিনিট পর ওই রাস্তা দিয়েই ফেরত যায়। গাড়িগুলো শীতলক্ষ্যার দিকেই যাচ্ছিল বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ওই তিনটি মাইক্রোবাস খোঁজা হচ্ছে। তবে এখনো ওইগুলোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ দিকে যে রশি দিয়ে বাঁধা হয়েছিল লাশগুলো সেই রশি সরকারের সাপ্লায়ের রশি বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তদন্তকারীরা এসব খতিয়ে দেখছেন। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা ওই তিনটি মাইক্রোবাস খুঁজছেন। ওই মাইক্রোবাসগুলো উদ্ধার সম্ভব হলেই এ ঘটনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ দিকে সেভেন মার্ডারের প্রধান আসামি নূর হোসেনের মাদকসাম্রাজ্য সিদ্ধিরগঞ্জে শিমরাইল মোড় ট্রাকস্ট্যান্ডে গতকাল অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়ার্টার) মোহাম্মদ জাকারিয়ার নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া সাংবাদিকদের জানান, ট্রাকস্ট্যান্ডে নূর হোসেনের মাদকসাম্রাজ্যে বিপুল মাদক মজুদ রয়েছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ১৯টি বস্তায় দুই হাজার ৮২৪ বোতল ফেনসিডিল, বিপুল সংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৭ কার্টুন হ্যানিকেন বিয়ার ও দু’টি বড় ছুরি ও তিনটি রামদা উদ্ধার করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তা জাকারিয়া জানান, পুলিশের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এর আগে গত ৩ মে নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে রক্তমাখা একটি কালো রঙের হাইয়েস (ঢাকা মেট্রো-চ ১৫-০৫১০) গাড়ি জব্দ করে পুলিশ। এ সময় ১২ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে নূর হোসেনের বডিগার্ড, বাড়ির দারোয়ান ও কাজের লোক রয়েছে। তবে সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন, তার ছোট ভাই জজ মিয়া, ভাতিজা কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলসহ তার সহযোগীদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
সূত্র জানায়, এ আস্তানায় এক সময় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য নিয়মিত আড্ডা দিতেন। নূর হোসেনের কাছ থেকে অনেকেই ফায়দা লুটেছে বিভিন্নভাবে। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই সব সদস্যকে ব্যবহার করে নূর হোসেনও নব্য গডফাদারে পরিণত হয়েছিলেন। সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে এই তথ্য পাওয়ার পরই নারায়ণগঞ্জ পুলিশে গণবদলি করা হয়। সূত্র জানায়, এই বাহিনীর কাছে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ রয়েছে। তাদের বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১১টির লাইসেন্স এখন পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে বিপুলসংখ্যক।
এ দিকে সেভেন মার্ডারে অর্থের লেনদেনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এবং দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বরখাস্তকৃত তিন র‌্যাব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, এখনো তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তে অভিযোগ পাওয়া গেলেই তাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে গ্রেফতার করা হবে। সূত্রটি জানায়, অভিযোগ উঠলেই তাকে বরখাস্ত করা হয়। এরই অংশ হিসেবে ওই তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ দিকে যাদের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে এ অপহরণ ও খুনের সাথে সম্পৃক্ততার; তারা এখন অনেকটা আড়ালে চলে গেছেন। সূত্র জানায়, ওই মাফিয়া গডফাদাররা এখন অনেকটাই নিরাপদে রয়েছেন। এখন আলোচনায় র‌্যাবের ওই তিন কর্মকর্তা। কিন্তু যারা মূল হোতা তারা এখন আর আলোচনায় নেই।

শেয়ার করুন