স্থবির র্যা ব-১১

0
73
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনায় এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর থেকে র‌্যাব-১১ এর কার্যক্রম দৃশ্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। শীতলক্ষ্যা থেকে লাশ উদ্ধারের পর শহরের কোথাও র‌্যাব সদস্যদের দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে শহরে সার্বক্ষণিক র‌্যাব সদস্যদের একাধিক টহল গাড়ি দেখা যেত। কিন্তু এখন তা দেখা যাচ্ছে না।
মন্ত্রণালয়ের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্ত দল আলামত সংগ্রহ করেছে। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বুধবার নরসিংদী থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বলা যাবে, এরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিনা। এছাড়া ঘটনার রহস্য উন্মোচনের জন্য গঠিত নারায়ণগঞ্জ পুলিশের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি বুধবার যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে এমবিবি ব্র্যান্ডের ইটসহ বেশ কয়েকটি আলামতের নমুনা সংগ্রহ করেছে। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনার ভিডিও এবং স্থিরচিত্র ধারণ করেছে।
সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনায় র‌্যাব-১১’র তিনজন সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর সিনিয়র আইনজীবীসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষ থেকে এ ইউনিটের সব সদস্যকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। সূত্র জানিয়েছে, র‌্যাব-১১ এর অধিনায়কসহ উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তাকে নিজস্ব বাহিনীতে প্রত্যাহার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পর এ ব্যাটালিয়নের বেশির ভাগ কর্মকর্তা এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে র‌্যাব-১১ এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক দাবি করেছেন তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। কার্যক্রম স্থগিত করা বা তাদের স্থবির হয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই।
জানা গেছে, অপরাধ প্রতিরোধ কোম্পানি-৩ এর এলাকা নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। এর বাইরে স্পেশাল কোম্পানি নারায়ণগঞ্জ সদর, বন্দর, ফতুল্লা থানা এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। আরেকটি স্পেশাল কোম্পানি গজারিয়া থানা ছাড়া মুন্সীগঞ্জের নবাবগঞ্জ এবং দোহার থানা এলাকার দায়িত্বে রয়েছে।
ঘটনার পর অপহৃত সাতজনকে নারায়ণগঞ্জ সদর, বন্দর ও ফতুল্লা থানা এলাকায় দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত স্পেশাল কোম্পানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। এ কোম্পানির দায়িত্বে ছিলেন লেঃ কমান্ডার এমএম রানা। ইতিমধ্যে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন এলাকায় ঘুরে শহরের কোথাও র‌্যাব সদস্যদের দেখা যায়নি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহসড়কেও র‌্যাবের টহল গাড়ি দেখা যেত। ঘটনার পর থেকে মহাসড়কেও র‌্যাবের গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ র‌্যাব-১১ এর অন্যান্য দায়িত্বপূর্ণ এলাকাতেও সংস্থাটির কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। বুধবার যোগাযোগ করা হলে র‌্যাব-১১ ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর সুরুজ যুগান্তরকে বলেন, র‌্যাবের কার্যক্রম অনেকটাই মিলিটারি আদলে চলে। মিলিটারি রুল হচ্ছে শেষ ব্যক্তি থাকা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, র‌্যাবের কার্যক্রম পুলিশের মতো নয়। র‌্যাব অনেকটাই অ্যাসাইনমেন্টনির্ভর কাজ করে। তিনি জানান, এখনও নতুন অধিনায়ক যোগ দেননি। দু-একদিনের মধ্যেই হয়তো নতুন অধিনায়ক যোগ দেবেন। নারায়ণগঞ্জের স্পেশাল কোম্পানিতে লেঃ কমান্ডার এমএম রানার স্থলে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরাই আছি, চালিয়ে নিচ্ছি। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।’
আলামতের নমুনা সংগ্রহ : বুধবার যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে মামলার তদন্তকারী একটি দল বৃহস্পতিবার আদমজী ইপিজেড এলাকায় গিয়ে এমবিবি ব্র্যান্ডের ইটের স্তূপ পরিদর্শন করেছে। সেখান থেকে আলামত হিসেবে কয়েকটি ইটের নমুনাও সংগ্রহ করেছে তদন্ত দলটি। পাশাপাশি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থাও ইটের স্তূপের ভিডিও এবং স্থিরচিত্র ধারণ করে। এর আগে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিনও সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেন। মামলার তদন্তকারী সূত্র বলেছে, নদীতে লাশ ডুবিয়ে দেয়ার কাজে ব্যবহৃত এমবিবি ব্র্যান্ডের ইটের একটি স্তূপ আদমজী ইপিজেডের অভ্যন্তরের একটি নির্মাণাধীন স্থাপনার পাশে পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রহস্য আরও ঘনিয়ে উঠেছে।
অ্যাডভোকেট চন্দনের পরিবারের মামলা : ঘটনার ১১ দিন পর অ্যাডভোকেট চন্দনের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার রাতে চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই ডা. বিজয় কুমার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। তবে ওই মামলায় কোনো আসামির নাম বা সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আসমা জানান, বুধবার রাতে চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই ডা. বিজয় কুমার বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু মামলার এজাহারে তিনি আসামি হিসেবে কারও নাম উল্লেখ করেননি। মামলায় সব আসামি অজ্ঞাত।
তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই : লোমহর্ষক সাত অপহরণ ও খুনের মামলার তদন্তে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। একের পর এক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হওয়ার পর কিছুটা খেই হারানোর অবস্থা হয়েছে কর্তৃপক্ষের। মামলা দায়েরের পর প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই ফজলুল হক। এর পর অজ্ঞাত কারণে মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। তদন্তের দায়িত্ব পান জেলা ডিবির ইন্সপেক্টর আবদুল আওয়াল। কিন্তু তিনিও মামলা তদন্তে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিতে না পারায় তৃতীয় দফায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। নবনিযুক্ত এসপি খন্দকার মহিদ উদ্দিনের আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা বলে পরিচিত নরসিংদীর মনোহরদী থানার ওসি মামুন উর রশিদ মণ্ডলকে বুধবার নারায়ণগঞ্জে বদলি করে এনে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে এ মামুন উর রশিদ মণ্ডল নরসিংদীর জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে লোকমান হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতার করাসহ একটি নির্ভুল চার্জশিট আদালতে জমা দিতে সক্ষম হন তিনি।
আরও চার লাশের সত্যতা মেলেনি : বুধবার একটি দৈনিকে প্রকাশিত আরও চারজনকে ঘটনার দিন হত্যা করে শীতলক্ষ্যায় লাশ ফেলে দেয়ার খবরের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে পুলিশ। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী ও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চারজনের লাশ পানিতে ফেলে দেয়া হলে তাদের স্বজনরা কোথায়? অপহৃত সাতজন ছাড়া এখন পর্যন্ত কেউই তাদের স্বজন নিখোঁজ রয়েছে বলে পুলিশের কাছে দাবি করেনি। ৩০ এপ্রিল অপহৃতদের লাশ উদ্ধারের পর এখন পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা থেকে আর কোনো লাশ উদ্ধারও হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরও চার লাশ সংক্রান্ত খবরের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, ‘এ সংক্রান্ত খবরের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। আরও কেউ নিখোঁজ রয়েছেন বলে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগও আসেনি।’
ঘাটে র‌্যাবের নৌকা নেই : স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শীতলক্ষ্যার পাড়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নৌ-টহলের জন্য র‌্যাবের দুটি নৌকাসহ পুলিশের বেশ কয়েকটি নৌকা বাঁধা থাকত। বুধবার সরেজমিন সেখানে গিয়ে পুলিশের নৌকাগুলো দেখা গেলেও র‌্যাবের নৌকা দুটি দেখা যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নদীতে স্পিড বোট এবং একটি ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় র‌্যাব সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেলেও ঘটনার পর থেকে টহল আর দেখা যাচ্ছে না।
ডিবির দুই ইন্সপেক্টর বদলি : সাত হত্যা মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবদুল আওয়ালসহ জেলা ডিবির একজন ইন্সপেক্টরকে বুধবার বদলি করা হয়েছে। বদলিকৃত আরেক ইন্সপেক্টর হলেন মাহবুবুর রহমান। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রুটিন কাজের অংশ হিসেবে তাদের বদলি করা হয়েছে। তবে সূত্র জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের বাদ দিয়ে একের পর এক নরসিংদী থেকে পুলিশ অফিসার নারায়ণগঞ্জে এনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ায় নারায়ণগঞ্জে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ বিষয়ে ইন্সপেক্টর মাহবুব ও ইন্সপেক্টর আবদুল আওয়াল প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এরই জের ধরে তাদের বদলি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, তিনি সরকারি চাকরি করেন। যেখানেই তাদের বদলি করা হবে সেখানেই তিনি যেতে বাধ্য।
তবে পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে কর্মরত আরও ১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তার বদলি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দীন জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে আগামী দু-একদিনের মধ্যে আরও বড় রদবদল করা হবে।
কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করছে পুলিশ : ওদিকে ঘটনার রহস্য উন্মোচনে পুলিশ কতটা এগিয়েছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। এমনকি মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ জেলার পুলিশের সব কর্মকর্তাই সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন। এএসপি পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বুধবার সব পুলিশ কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে এসপি কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশনা দিয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তাদের বলা হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে পুলিশ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বিভিন্ন তথ্য দেয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে এখন থেকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে পুলিশ সুপার নিজেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শেয়ার করুন