আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা : বিনিয়োগে মন্দা

0
128
Print Friendly, PDF & Email

‘আমাকে নিয়ে গেল’ এসএমএস লিখে রেখেছি মোবাইলে। তৈরি করা আছে অপহরণ গ্রুপ। আর্মি-পুলিশ-র‌্যাবে থাকা বন্ধুবান্ধব, সাংবাদিক এবং নিকটাত্মীয়রা রয়েছেন ওই গ্রুপে। গাড়ি থেকে নামাতে শুরু করলেই এই এসএমএস পাঠিয়ে দেবো।’ সারা দেশে চলমান গুম-অপহরণের বিপরীতে এভাবেই নিজের প্রস্তুতির কথা জানালেন রাজধানীর মিরপুরের ব্যবসায়ী শেখ মাসউদ। বললেন, যেভাবে শুরু হয়েছে তাতে ডাক পড়তে পারে যেকোনো মুহূর্তে। সাবধানে থাকার চেষ্টা করছি। বাধ্য না হলে বাসা থেকে বের হই না। জরুরি ফাইলপত্র বাসায় এনে রেখেছি। ধীরে ধীরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে সময়-সুযোগ মতো সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
শেখ মাসউদের মতো দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই আতঙ্কে কাটছে সারা দেশের লাখ লাখ ব্যবসায়ী-শিল্পপতির। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কেও চরম অস্থাহীনতায় ভুগছেন তারা। আগে যারা চাঁদা দাবি করেই ক্ষান্ত হতো, তারা এখন হুমকি দিচ্ছে অপহরণের। আর যারা জীবননাশের হুমকি দিতো, তাদের মুখোমুখি হতেই সাহস পাচ্ছেন না কেউ। এ পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে চরম মন্দাবস্থা দেখা দিয়েছে। নতুন বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না, বিদ্যমান বিনিয়োগও তুলে নেয়ার পথ খুঁজছেন অনেকে। স্বাভাবিক কারণেই হুমকির মুখে পড়েছে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।
অপহরণ-গুম-খুন আতঙ্কের বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সহসভাপতি মো: হেলাল উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশে ব্যবসাবাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব সরকারের। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের জীবন ও পুঁজির নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু কিছু দিন ধরে অপহরণ-গুম-খুনের যে তাণ্ডব চলছে তাতে দেশের কোনো নাগরিকই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। সারা দেশ থেকে প্রতিদিনই ব্যবসায়ীদের অপহৃত হওয়ার খবর পাচ্ছি। এ প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই দুঃসংবাদ বয়ে আনবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অপহৃত হয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় নয় ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর মগবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি মৃত্যুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল সুন্দর এই পৃথিবীর চেহারা আর কোনো দিন দেখব না।’ টাকার জোরে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন বলে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘ওরা জানিয়ে দিয়েছে, অপহরণের সংবাদ মিডিয়ায় গেলে কোটি টাকাতেও কাজ হবে না।’ নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অপহরণের পর মুক্তি পাওয়া এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘এ দেশটা ভালো মানুষের জন্য নয়। আমার এবং আমার সন্তানদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাব, সেখানে লেবারের কাজ করে বেঁচে থাকাও উত্তম।
আশঙ্কা ও আতঙ্কের কথা জানান, মালিবাগের ুদ্র ব্যবসায়ী নূরুল আলমও। নিজে সামান্য পান দোকানদার হলেও ব্যবসায়ীসমাজের পক্ষ নিয়ে তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পরও সরকার এভাবে ব্যবসায়ীদের টার্গেট করেছিল। বড় ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় বন্ধ করে দিলে দ্রব্যমূল্য আকাশে উঠে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভর করে ক্ষমতায় থাকা মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। নূরুল আলমের মতে, অপহরণ-গুম-খুনের মাধ্যমে দেশে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে জীবন বাঁচাতে ব্যবসায় গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা। আর বড় ব্যবসায়ীরা মাঠে না থাকলে ছোটদের অবস্থাও খারাপ হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে আশঙ্কা প্রকাশ করে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেবল ব্যবসায়ী-শিল্পপতি কেন, কোনো পেশার মানুষই এখন আর নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারছেন না। যার কাছে টাকা আছে, যার কাছে টাকা নেই; কেউই আশঙ্কামুক্ত নন। তার মতে, বাংলাদেশের প্রথম সারির হাজার হাজার ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাদের হাতে এমন পরিমাণ টাকা আছে যাতে ব্যবসায় গুটিয়ে নিলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের থাকাখাওয়ার সমস্যা হবে না। নতুন করে কোনো কিছু না করলেও চলবে। প্রবণতা এমন হলে তাদের হয়তো ভোগ-বিলাস একটু কমে যাবে কিন্তু চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই অপহরণ-গুম-খুনের চলমান প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান।

শেয়ার করুন