‘যদি’র ঘূর্ণিপাকে দিল্লির মসনদ

0
136
Print Friendly, PDF & Email

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ৩০ এপ্রিল শান্তিনিকেতনের বোলপুর কেন্দ্রে ভোট দিয়ে সর্বশেষ বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি ভারতের জন্য ভালো প্রধানমন্ত্রী হবেন না। উনি আসলে দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিপদ হবে। তারচেয়ে অনেক যোগ্য লোক দেশে রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে কাউকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে হবে। অমর্ত্য সেনের মতো অনেকেই উদ্বিগ্ন। আবার অনেকে মোদিকেই চান দিল্লির মসনদে। ভারতজুড়ে প্রশ্ন- ডুবন্ত কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে কে আসছেন দিল্লির মসনদে? নরেন্দ্র মোদি নাকি অন্য কেউ? অথবা শেষ পর্যন্ত সব হিসাব পাল্টে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ভর করে কংগ্রেসই ফিরছে ক্ষমতায়? কিন্তু দিলি্ল থেকে কলকাতায় নানা মহলের সঙ্গে আলাপকালে যা পাওয়া গেছে, ভোটের ময়দানে বা গণমাধ্যমে যে চিত্র দেখা গেছে তাতে বলা যায়, ‘যদি’র ঘূর্ণিপাকে দুলছে দিলি্লর মসনদ। ভোট লড়াইয়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের টানা এক মাসের লোকসভার ভোটের লড়াই প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ১২ মে শেষ পর্বের ৪১টি আসনের ভোটযুদ্ধ শেষ হলেই ১৬ তারিখ ফলাফল ঘোষণা হবে। তুমুল আবেগ, উত্তেজনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এখন ভারতবর্ষ জুড়ে। সর্বত্র একই প্রশ্ন- কে হাসবেন শেষ হাসি? কার গলায় বিজয়ের বরমাল্য উঠছে? জল্পনা-কল্পনা, মাতামাতির শেষ নেই। বিজেপি নয়, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেই লড়ছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি। ১০ বছরের শাসনামলের দুর্নীতি, ব্যর্থতার সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত কংগ্রেস ও তার মিত্রশক্তি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ভিত্তিমূল নিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকানোর শেষ চেষ্টা করলেও তা তেমন ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ, জনমত জরিপ, গণমাধ্যমের চিত্র মিলিয়ে একসুরে সবাই বলছেন, দিল্লির মসনদ থেকে টানা ১০ বছরের শাসন শেষে কংগ্রেস জোটের বিদায় এখন নিশ্চিত। ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ কংগ্রেসের সামনে নেই। এমনকি ভোটের লড়াইয়ে কংগ্রেস সেনাপতি রাহুল গান্ধী আলোর ঝলকানি দিতে না পারলেও তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জোড়াতালির ক্ষমতায় সুযোগ পেলেও কংগ্রেসকে দেবেন না। নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকাতে বিকল্প প্রগতিশীল রাজনীতির যে কাউকেই সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। নির্বাচনের এক বছর আগে থেকেই দেশি-বিদেশি জরিপ সংস্থা দিয়ে নরেন্দ্র মোদি লোকসভার ওপর জনমত জরিপ করিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এমনকি বিজেপির বাঘা বাঘা যত সিনিয়র নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি, সুষমা স্বরাজ, যশোবন্ত সিং, যশোবন্ত সিনহাদের কোণঠাসা করে ফেলে রেখে প্রার্থী ঘোষণা থেকে শুরু করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার খলনায়ক নরেন্দ্র মোদি নিজের রক্তমাখা হাতকেই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণা করিয়ে নিতে বাধ্য করেন। ভারতের রাজনীতিতে প্রচলিত নাগপুরে আরএসএস ঘোষণা দেয় দিলি্লতে বিজেপি সেই সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে অযোধ্যার বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের অঙ্গীকার, পশ্চিমবাংলায় এসে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশি খেদাও ভোট লড়াইয়ের শেষদিকে উত্তেজনার ঢেউ খেলে দিয়েছে। মোদির বিরুদ্ধে দাঙ্গার অভিযোগ আনলেও তিনি জবাবে বলছেন, দাঙ্গার জুজুর ভয় কংগ্রেস দেখাচ্ছে। তিনি দাঙ্গার কথা বলছেন না। বলছেন, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের কথা। তার সমর্থকরা বলছেন, মোদি এলে দাঙ্গা হবে না। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দাঙ্গার ভয় দেখিয়েই তিনি ফায়দা নেবেন। প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের ভিত্তিমূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অগ্রসর মানুষেরা বলছেন, মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে সেটি হবে দুঃখজনক। তিনি এলেই দাঙ্গা হবে। তার সমর্থকরা তার দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবন, সাধারণ চা-বিক্রেতা থেকে গুজরাটের জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন লাভের জন্য ঝড়োগতিতে ভোট লড়াইয়ে উঠে আসার নেপথ্যে তার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব, বাগ্মিতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাকেই চিহ্নিত করেছেন।

একদিকে গুজরাটের উন্নয়ন মডেলকে উপস্থাপন করে, অন্যদিকে তরুণদের কর্মসংস্থান ও দুর্নীতির লাগাম টেনে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে স্বভাবসুলভ বাগ্মিতায় নরেন্দ্র মোদি বিজেপি ও তার দলের নেতাদের অনেক পেছনে ফেলে ভোট লড়াইয়ে নিজেকে তুলে আনেন হাজার কোটি টাকার পরিকল্পিত প্রচার বাজেট ও নিজের ক্যারিশমায়। কংগ্রেসের দুর্নীতি আর ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে মানুষের কাছে আবেদন রাখতে সক্ষম হয়েছেন ওদের ৬০ বছর দেখেছেন, আমাকে ৬০ মাস দেখুন। কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে, বিজেপি সাত হাজার কোটি টাকা নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় করেছে। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ আমলে নিয়ে অডিটে দিয়েছে। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়, রাস্তায় রাস্তায় বিলবোর্ডে ভারতজুড়ে মোদি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন দলীয় প্রতীক পদ্মফুলের সঙ্গে। সেখানে বিজেপি বলে কিছু ছিল না। টেলিভিশন খুললেই কানে আসে ‘আপকি বার মোদি কা সরকার’। রাহুলকে সামনে নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার চিত্র ফুটিয়ে পাঞ্জা মার্কা সামনে নিয়ে ‘হার হাত হার তাকি’ স্লোগানে প্রচারে এলেও মোদির প্রচারের তুলনায় তা ছিল অনেক পেছনে। ভারতের মহীয়সী নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চেহারা, হাঁটাচলা, আদব-কায়দা, হাসি যার মধ্যে খুঁজে পান সেই প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও এবার দলের প্রচার সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকে কংগ্রেসের প্রচার ব্যর্থতার জন্য তুলাধোনা করেছেন।

৫৪৩ আসনের ভোটযুদ্ধে ২৭২ আসনপ্রাপ্তিকে ম্যাজিক আসন বলা হয়। এই আসন একক সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোটা পূরণ করে। নিকট অতীতে ভারতে এই ম্যাজিক আসন কেউ পাচ্ছেন না। এবার পাবেন সেটিও কেউ মনে করছেন না। বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে চিন্তাশীল পর্যবেক্ষক সবার মুখেই তাই ‘যদি’র ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে দিলি্লর ক্ষমতা দখলের ভোটের লড়াই। বলা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি যদি ২০০ আসনের বেশি পান তাহলে অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে এগিয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে পশ্চিমা দুনিয়াসহ সবার দৃষ্টি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তিমূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের শাসনব্যবস্থার ওপর। এখানে নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে অনেকেই মানতে নারাজ। যারা নরেন্দ্র মোদিকে একদম মানতে পারছেন না বা মনে করছেন মহাত্দা গান্ধীর অহিংস, শান্তি ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের ভারতবর্ষের ক্ষমতার চাবি তার হাতে দেওয়া যায় না, তারা বলছেন এখানে বিজেপিকে ছাড় দেওয়া যেতে পারে। মোদি নয়। এখানে লালকৃষ্ণ আদভানি, সুষমা স্বরাজদের নাম যেমন উচ্চারিত হচ্ছে তেমনি বিজেপির বাইরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিলনাড়ুর জয়ললিতা, উত্তর প্রদেশের মায়াবতী বা অন্যদের নাম প্রধানমন্ত্রী পদে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু যারা জোরেশোরে পরিবর্তনের পক্ষে নেমেছেন তারা বলছেন, নরেন্দ্র মোদিকে আর ঠেকানো গেল না। প্রধানমন্ত্রী তিনি হচ্ছেন। দিলি্লর মসনদে বসতে যত আসন লাগবে তা বিজেপির এনডিএ জোট ও মিত্রদের দিয়ে হয়ে যাবে। কট্টর নরেন্দ্র মোদি বিরোধীদের যুক্তি হচ্ছে, কংগ্রেসের ভোট বিপর্যয় যতই হোক, মনে রাখতে হবে এ দলটি সর্বভারতীয়। সব নির্বাচনী এলাকায় তার সংগঠন রয়েছে যা বিজেপির নেই। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই নরেন্দ্র মোদি ঝড়ের মুখে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে বিবেচনায় এনেছেন। তাই কংগ্রেসের শোচনীয় ভরাডুবি ঘটছে না। যারা বলছেন, কংগ্রেস ১০০ আসন পাচ্ছে না তাদের হিসাবে গলদ রয়েছে। বিজেপি উত্তর প্রদেশের ৮২টি আসনের মধ্যে বিগত নির্বাচনে ১০টি আসনে জয়লাভ করলেও এবার ৫০টি আসন প্রত্যাশা করছে। শেষ পর্যন্ত ইউপিতে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হবে। ইউপিতে মুলায়েম সিং যাদব ও মায়াবতীর সংগঠনের প্রভাব প্রবল। সেখানে কংগ্রেসেরও আসন রয়েছে। কংগ্রেস সব প্রদেশেই আসন লাভ করবে, যা বিজেপির পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে কংগ্রেসবিরোধীরা বলছেন, কংগ্রেস ভোটযুদ্ধে ডুবে গেছে। অন্যদিকে ব্যালট বিপ্লবের পথে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। ফলাফল ঘোষণাকালে অনেককে চমকে যেতে হবে। যেখানে যা পাওয়ার কথা নয় বিজেপি সেখানে তা পাবে। কংগ্রেসের বিদায় নিশ্চিত, মোদি আসছেন না বলে তৃতীয় শক্তির কথা যারা বলেছিলেন তারা এখন হালে পানি পাচ্ছেন না। পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, ম্যাজিক আসন না পাওয়ার কারণে সবাই একজোট হয়ে যদি প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদিকে আটকে দেন তাহলে কংগ্রেসের সমর্থনে আঞ্চলিক দলগুলো নিয়ে একটি দুর্বল কোয়ালিশন সরকার হতে পারে। সেখানেও কংগ্রেসের সমর্থনই হবে বড় ফ্যাক্টর। মোদি বা বিজেপিকে আটকাতে এখানে কংগ্রেস সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে যারা বলছেন, মোদি নয়, বিজেপি ক্ষমতায় আসবে মানে আদভানি বা অন্য কেউ হবে সেখানেও সরকার গঠনে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রাধান্য বড় হয়ে দেখা দেবে। এক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিই সরকার গঠনে নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। তবে যারা ভাবছেন মোদি নয়, বিজেপির আদভানি বা অন্য কেউ, তাদের কাছে অনেকের প্রশ্ন- মোদি হতে না পারলে আর যাই হোক আদভানিদের গলায় প্রধানমন্ত্রিত্বের বরমাল্য পরতে দেবেন না।

উত্তর প্রদেশের অমৃতসর, বিজেপির অরুন জেটলির পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রবল। পরাজয় না হলে মোদির আশীর্বাদে নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে তার নামও চলে আসতে পারে। গুজরাটের ২৬টি আসনের দু’একটি বাদে সবই বিজেপি পাবে। পশ্চিমবাংলায় যেখানে একটি আসন রয়েছে বিজেপির, সেখানে নরেন্দ্র মোদি এ পর্যন্ত সাতবার সফর করেছেন। এর বাইরে হিন্দি বলয়ে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে ফলাফল শুভ ঘটতে পারে। হিন্দি বলয়কে তিনি দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু হিন্দি স্লোগানে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। এবারের ভোটের লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদি যেখানেই গেছেন সেখানেই জনসে াত নেমেছে। প্রতিপক্ষরা বলছেন, মানুষের এই ছুটে যাওয়া মানে বিজেপিকে ভোটদান নয়, নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদে দেখার তৃষ্ণাও নয়, বহুল আলোচিত গুজরাট দাঙ্গার একজন নিন্দিত খলনায়ককে দেখার জন্যই মানুষ ছুটে গেছে। প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চেতনাবোধসম্পন্ন চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ বলেছেন, আর যাই হোক শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসনে নরেন্দ্র মোদি বসছেন না। ভোটের ফলাফল যাই হোক সরকার গঠনের ফলাফলে তা-ই ঘটবে। এক্ষেত্রে তারা এমন যুক্তিও দিচ্ছেন, বিজেপির সিনিয়র নেতারাই মোদির সঙ্গে নেই। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এলে দাঙ্গা হবে বলে কংগ্রেসসহ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি যে অভিযোগ আনছে তার জবাব মোদি ছাড়া দলের আর কোনো নেতা দিচ্ছেন না। যেন মোদির দায় তারা নিতে নারাজ। কিন্তু অনেকেই বলছেন, আদভানি, সুষমা স্বরাজরা কতটা অসন্তুষ্ট সেটা বড় কথা নয়। আরএসএসের চাপের মুখে নতিস্বীকার করে নিজেদের যেমন গুটিয়ে মোদিকেই মেনে নিতে হয়েছে, তেমনি তাকে মাইনাস করে পশ্চিমা ফর্মুলা বা ভারতীয় রাজনীতির অন্দরমহলের দাবাখেলায় তাকে আটকাতে তারা ভূমিকা রাখতে পারবেন না। এখানে হিসাব কষে যারা বলছেন, দুই শতাধিক আসন পেলে মোদি নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রী, তেমনি তারা এটিও বলছেন, বিজেপি যদি ১৬০-১৭০ এ আটকে যায় আর কংগ্রেস যদি ১২০ আসনে চলে যায় তাহলেই সরকার গঠনের খেলা নতুন রূপ নেবে। এখানে আঞ্চলিক দলগুলোসহ প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির কোয়ালিশন সরকার গঠনের দুয়ার খুলে যাবে। সেখানে নরেন্দ্র মোদি ছিটকে পড়বেন আর কংগ্রেস পরাজয় মেনে নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে হলেও অন্য কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে।

নানা সূত্রে জানা গেছে, নরেন্দ্র মোদি যেমন প্রধানমন্ত্রী হতে মরিয়া হয়ে খেলেছেন, তেমনি রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের ভরাডুবির সম্ভাবনা মাথায় নিয়েই বিরোধী দলের আসনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। গান্ধী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজন প্রবীণ সাংবাদিক বললেন, অসুস্থ সোনিয়া গান্ধী ১০ বছর আগে মনমোহন সিং ও কংগ্রেস বলার পরও প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেননি, তেমনি পুত্র রাহুলকে এবারের লোকসভা নির্বাচনে নিজে পিছু হটে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য সামনে ঠেলে দিয়েছেন। বিজেপির নেতৃত্ব যেখানে নরেন্দ্র মোদি দিয়েছেন ভারতবর্ষ চষে সেখানে রাহুল গান্ধী নিয়েছিলেন কংগ্রেসের অধিনায়কত্ব। ওই প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষায়, কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার সম্ভাবনা রাহুলের নেই। কংগ্রেস যদি কখনো ম্যাজিক আসন মানে ২৭২ আসন লাভ করে তখন রাহুল প্রধানমন্ত্রিত্ব বিবেচনা করবেন। এদিকে ভোট লড়াইয়ে মঞ্চে কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী কোথাও বা চতুর্মুখী কাদা ছোড়াছুড়ি, আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ শানিত হোক না কেন তা হচ্ছে শুধুই ভোটের রাজনীতি। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি যেমন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আঞ্চলিক ও ছোট দলের সমর্থন লাভের দুয়ার খুলে রাখতে বিজেপি সভাপতি রাজেনাথকে দিয়ে কোথাও বা নিজে যোগাযোগ রক্ষা করছেন পর্দার অন্তরালে, তেমনি রাহুল গান্ধীও কখনো সিপিএম, কখনো বা মায়াবতীদের সঙ্গে কথা বলছেন। ‘যদি’র ঘূর্ণিপাকে পতিত ভারতের লোকসভা নির্বাচন ঘিরে এখন রীতিমতো চূড়ান্ত কাউন্ট ডাউন চলছে। সর্বত্র এক প্রশ্ন- মোদি আসছেন, নাকি মোদি আটকে যাচ্ছেন? আটকে গেলে কে আসছেন? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ১৬ মে রাত থেকে। ভোট গণনা শুরুর পর রাত যত বাড়তে থাকবে, ততই পরিষ্কার হতে থাকবে দিলি্লর মসনদ দখলের হিসাব-নিকাশ।

শেয়ার করুন