মোদি বনাম ভারত-লড়াই

0
85
Print Friendly, PDF & Email

আট দফায় লোকসভার ৫০২ আসনের ভোট শেষ হয়ে অপেক্ষা এখন শেষ পর্যায়ের। বাকি মাত্র ৪১ আসনের ভোট, ১২ মে যা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ মে জানা যাবে ভোটের ফলে কারা হাসছে। তার আগে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়, ষোড়শ লোকসভা ভোট হয়ে দাঁড়িয়েছে নরেন্দ্র মোদি বনাম অবশিষ্ট ভারতের লড়াই।
একদিকে একজন ব্যক্তিবিশেষ, অন্যদিকে দেরিতে হলেও তাঁকে রোখার এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এটাই ভারতের এবারের সাধারণ নির্বাচনের বিশেষত্ব। চার মাস আগে বিজেপি নানা টালবাহানার পর আদর্শিক মিত্র রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সিদ্ধান্তের কাছে মাথা নুইয়ে নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তখনো লড়াইটা এভাবে ভাগাভাগি হয়নি। তবে যত দিন গড়িয়েছে, সংঘ ও দলকে ছাপিয়ে মোদির মাথা ততই উঁচু হয়েছে এবং ক্রমে তিনি লড়াইকে ব্যক্তি বনাম সমষ্টিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। আজ সংবাদমাধ্যমের বিজ্ঞাপন কিংবা ‘আউটডোর পাবলিসিটি’, যেখানেই চোখ যায়, সর্বত্র একটাই স্লোগান, ‘এবার, মোদি সরকার’। ১৯৯৮-৯৯ সালের ভোটেও এ রকম স্লোগান উঠেছিল, ‘আব কি বারি, অটল বিহারি’। কিন্তু সেই ভোট এবারের মোদির মতো শুধুই বাজপেয়িকেন্দ্রিক ছিল না। অথচ এবারে প্রচারে মোদি ও দলীয় প্রতীক পদ্ম ফুল ছাড়া আর কারও উপস্থিতি সেভাবে চোখে পড়ে না। ব্যতিক্রম শুধু উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষেৗ। সেখানে মোদির সঙ্গে সহাবস্থানে রয়েছেন ‘জীবন্মৃত’ অটল বিহারি বাজপেয়ি, যাঁকে উপেক্ষা করার মতো ধৃষ্টতা মোদি এখনো অর্জন করেননি।
গতকাল বুধবার সাত রাজ্যের যে আসনগুলোতে ভোট হলো এবং ১২ মে যে রাজ্যগুলোতে ভোট আছে, সেগুলোর মধ্যে উত্তর প্রদেশে ৩৩, বিহারে ১৩, হিমাচল প্রদেশে চার ও উত্তরাখন্ডে পাঁচটি আসন রয়েছে। ক্ষমতায় আসতে হলে এই ৫৫টি আসনের অধিকাংশ বিজেপিকে কবজা করতে হবে। উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের ৩৩ আসনের মধ্যে ২০০৯ সালে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র চারটি। কংগ্রেস ও বহুজন সমাজ পার্টি পেয়েছিল ১০টি করে। মোদির বারানসি থেকে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যই এই পূর্বাঞ্চলে আসন বাড়ানো এবং তার প্রভাব বিহারে ছড়িয়ে দেওয়া। সে লক্ষ্যে তিনি প্রচারের শেষবেলায় দুটি কৌশল নিয়েছেন। নিজের জাতিগত অনগ্রসর সত্তা ও চা বিক্রির অতীত পেশাকে বড় করে তুলে ধরে ‘নিম্নবর্গীয় মানসিকতায়’ নাড়া দিতে চেয়েছেন। পাশাপাশি অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ নতুন করে তুলে ধরেছেন। কেন? কারণ, এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দলিতরা মায়াবতী ও অনগ্রসর মানুষ মুলায়মকে ছাড়া অন্যদের ভরসা করেন না। তাঁদের সঙ্গেই এত বছর ধরে লেপ্টে থাকতে বাধ্য হয়েছে অতি অনগ্রসর ‘সাব কাস্ট’-এর মানুষজন, যাঁরা দলিত ‘জাটভ’ ও অনগ্রসর ‘যাদব’দের দাপাদাপিতে সংকুচিত বোধ করেন। মোদি যেহেতু জাতিগতভাবে এই গোষ্ঠীভুক্ত, তাই সেই সত্তায় সুড়সুড়ি দেওয়ার রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরেছেন। এঁদের ভোট পেতেই বিজেপি জোট বেঁধেছে ‘আপনা দল’-এর সঙ্গে, উত্তর প্রদেশে যাদের ১০-১২ শতাংশ ভোট আছে। ভোটের অনেক আগে থেকেই নরেন্দ্র মোদির নিজের হাতে সাজিয়ে নেন প্রচারের ছকটা। সেই ছকে প্রত্যক্ষ প্রাধান্য পায় তাঁর ‘গুজরাট মডেল’, ‘দৃঢ়কঠিন উন্নয়নমুখী’ মানসিকতা এবং ‘চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার’ ক্ষমতা। অতিমাত্রায় গণতন্ত্রী না হয়ে দেশের স্বার্থে ‘উপকারী একনায়ক’ হয়ে ওঠাকেই ওই প্রচারে হাতিয়ার করা হয়। সেই সঙ্গে প্রাধান্য দেওয়া হয় মোদির একদা অতিদরিদ্র সামাজিক চরিত্রকে, যা এক বিপুল জনসমষ্টিকে ‘আমরাও এমন হতে পারি’ স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। প্রচ্ছন্নভাবে এই প্রচারের পাশাপাশি পরোক্ষে উসকানি দেওয়া হতে থাকে আর্যাবর্তের গো বলয়ের হিন্দুত্বসর্বস্ব মানসিকতায়। অর্থাৎ একদিকে ‘ইয়ং ইন্ডিয়ানদের’ বড় হওয়ার কল্পনায় সাত রঙের পোঁচ আর অন্যদিকে কট্টর হিন্দুদের রামমন্দির গড়ার স্বপ্নে বাতাস দেওয়া। বিজেপি খুব চতুরভাবেই এই দুই জনসমষ্টিকে জুড়ে দিল। সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির নেতা ও মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরইয়াব গিলানি লক্ষেৗতে নিজের বাড়িতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোদি বিজেপির প্রচারকে বহুমুখী করতে পেরেছেন। এ কারণে এবার উত্তর প্রদেশে ৩৫-৪০টি আসন তিনি আশা করতেই পারেন।’ প্রদেশ কংগ্রেসের বড় নেতা সত্যদেও ত্রিপাঠি কিংবা বীরেন্দ্র মদনও প্রতিপক্ষের এতগুলো আসন পাওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করেননি। তাঁদের ব্যাখ্যা: বিজেপির উচ্চবর্ণের ভোটব্যাংকের পাশে অনগ্রসর জাতিদের সমর্থন মিললে ও মুসলমান ভোটে বিভাজন হলে মোদির রণকৌশল সফল হতেই পারে।
লড়াই শুরুর আগে বিজেপির নজরে ছিল উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬০টি। এনডিটিভির সর্বশেষ জরিপে শুধু উত্তর প্রদেশ থেকেই দলটিকে ৫৩টি আসন দেওয়া হয়েছে! এটা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে উত্তর প্রদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রমেশ দীক্ষিত বলেন, ‘একেবারে অসম্ভব বলব না। তার একটা বড় কারণ, নরেন্দ্র মোদির ভালো-মন্দ সম্বন্ধে সবাই বিশেষ একটা অবগত নন। আবার লাগাতার প্রচার তাঁর সম্বন্ধে একটা আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। তাঁকে গুজরাটের কসাই বলা হচ্ছে, কিন্তু হিন্দুপ্রধান ভারতে, বিশেষত দাঙ্গাপ্রবণ গো বলয়ে সেটা তাঁর পক্ষে যেতে পারে। মোদি একজন ‘নো ননসেন্স’ নেতা, এটা যত প্রচার পাচ্ছে, কট্টর হিন্দুদের মধ্যে ততই তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে। লোকসভার ভোটে অধিকাংশ মানুষ কেন্দ্রে একজন শক্তপোক্ত নেতাকে পেতে বেশি আগ্রহী।’
জাতীয় স্তরে বিজেপিকে রোখার মতো শক্তি এখন পর্যন্ত কংগ্রেসেরই রয়েছে। কিন্তু সেই কংগ্রেসকে অন্য ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলো গত দুই বছরে যেভাবে কোণঠাসা করেছে, কখনো কখনো বিজেপির সঙ্গে তাল ও হাত মিলিয়ে, তাতে দলটি দিন দিন দুর্বল হয়েছে। এই যে আট দফায় ভোট হয়ে গেল, তাতে বিরোধীদের টনক নড়েছে অনেক দেরিতে। কংগ্রেস ও মোদি দুজনকেই রুখে বিশ্বস্ত ও স্থায়ী বিকল্প সরকার গড়া যে সহজ নয়, সেই উপলব্ধি যখন হয়েছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন এই শেষবেলায় বারানসিতে মুসলমান ভোট একজোট রাখার চেষ্টায় একটা উদ্যোগ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শুধুই তা কি মোদির রথ ঠেকাতে পারবে?
এবারের ভোট মোদিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার অনেক কারণের একটি যদি হয় প্রচারে ‘টিম মোদির’ উদ্ভাবনী ক্ষমতা, অন্যদিকে তা হলে থাকবে তাঁকে রুখতে কংগ্রেসের সার্বিক ব্যর্থতা। মনমোহন সিংকে নিয়ে দলের টালবাহানা, মোদির মোকাবিলায় রাহুলকে এগিয়ে দেওয়া না-দেওয়া নিয়ে দীর্ঘ দোলাচল এবং স্বাভাবিক মিত্রদের (তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, টিআরএস) সঙ্গে সম্পর্কহানি এই লড়াইটা ক্রমে একপেশে করে তোলে। এখন কংগ্রেসের পক্ষে আশার আলো একটাই—প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। মত্ত ষাঁড়ের শিং ধরে মোকাবিলার মতো যেভাবে তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টক্কর দিচ্ছেন, তাতে দেশের আপামর কংগ্রেসি এখন থেকেই তাঁর মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। প্রিয়াঙ্কাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ গান্ধী পরিবার দেবে কি না, মোদিময় ভোট শেষ হওয়ার আগেই এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। সেই প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত ষোড়শ লোকসভার ভোটে মূল লড়াই কংগ্রেস বনাম বিজেপির নয়, আঞ্চলিক দল বনাম কংগ্রেস বা বিজেপির মধ্যে নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতারও নয়; লড়াইটা নরেন্দ্র মোদি বনাম অবশিষ্ট ভারতের।

শেয়ার করুন