ফুঁসে উঠছে নারায়ণগঞ্জ

0
147
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ জন অপহরণ ও পরে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে এখনও অন্ধকারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নূর হোসেনসহ অন্যান্য খুনি ও সহযোগীরা গ্রেফতার না হওয়ায় নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেধে উঠছে। র‌্যাব নূর হোসেনকে সুস্থ অবস্থায় গ্রেফতারের পরিবর্তে গুম করে ফেলতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। দেশে একের পর এক অপহরণ, গুম ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িতরা ধরা না পড়ায় মানুষের মধ্যে দিন দিন আতঙ্ক বাড়ছে। নূর হোসেনকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হলেও অপহরণ ও খুনের জন্য র‌্যাব কর্মকর্তাদের ৬ কোটি টাকা দেয়াসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই উদ্ধার করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ওয়াশিংটন ডিসিতে গত সোমবার এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি মুখপাত্র মেরি হার্ফ বলেছেন, বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকা- নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেছেন, প্রশাসনের লোকজন জড়িত না থাকলে নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের পক্ষে এত বড় একটা ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না। নারায়ণগঞ্জের ম্যানেজ মাষ্টার নূর হোসেন সম্পকে প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। কুখ্যাত গডফাদার নূর হোসেনের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস না ফেলেও এখন স্থানীয়রা নানা তথ্য দিচ্ছেন। নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের পর গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছে পুলিশ। দেশব্যাপী আলোচিত ৭ হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি গডফাদার কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তার ভাই জজ মিয়ার নিয়ন্ত্রিত কাঁচপুর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীর দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বালু ও পাথরের ব্যবসা বন্ধে জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ গতকাল অভিযান চালিয়েছে।
তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আলোচিত এই হত্যা ঘটনায় পুলিশ মূলত অন্ধকারেই হাতড়ে বেড়াচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা নূর হোসেনকে গ্রেফতারেই অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। মামলার তদন্ত করতে দু’টি কমিটি করা হয়েছে। র‌্যাবের তদন্ত কমিটিও কাজ শুরু করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সভাপতি টিপু মুনশী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনা এবং সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি এবং এ ঘটনায় জনপ্রতিনিধিরা ‘বিব্রত’। টিপু মুনশী বলেন, র‌্যাব বলেছে তারা কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। যেই জড়িত থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীকে ঘাতক বাহিনীতে পরিণত করেছে।
র‌্যাবের মহাপরিচালক মুখলেছুর রহমান দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ৭জন অপহরণ ও খুনের ঘটনায় র‌্যাব নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছে। হাইকোর্টের নির্দেশও রয়েছে আমাদের উপর।
তিনি বলেন, র‌্যাব-১১-এর সিও লেঃ কর্নেল তারেক সাইদসহ ৪ জন সেনা কর্মকর্তাকে র‌্যাব থেকে তাদের মাতৃ ইউনিটে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কেউ অপাধের সাথে জড়িত থাকার প্রমান পাওয়া গেলে র‌্যাবের তদন্তে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
র‌্যাবকে জড়িয়ে নজরুলের শ্বশুরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, তদন্তের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে তারা ভিকটিম পরিবারের বক্তব্যও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল মঙ্গলবার নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও শ্বশুর তার (এসপি) সাথে সাক্ষাত করেছেন বলে তিনি জানান।   
হত্যাকা-ের সঙ্গে প্রশাসন জড়িত
প্রশাসনের লোকজন জড়িত না থাকলে নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের পক্ষে এত বড় একটা ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না বলে মন্তব্য করেছেন নিহত প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি।
নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা গ্রেফতার না হলে সিদ্ধিরগঞ্জে কেউ নিরাপদ নয়, মন্তব্য করে তিনি বলেন, খুনীদের দ্রুত গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হবে বলে নতুন পুলিশ সুপার আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেলিনা ইসলাম সাংবাদিকদের আরো বলেন, স্বামীর লাশ পাওয়ার পর দু’দিন হুমকি এসেছিল। এখন হুমকি না আসলেও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাওয়া আসা বন্ধ করে দিয়েছি। মামলার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ওদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছি। এ সময় তিনি নজরুল হত্যাকা- নিয়ে রাজনীতি না করার জন্য রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানান।
নারায়ণগঞ্জবাসীর অনেক প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জে ৭ জনকে অপহরণের পর হত্যা এবং এই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নূর হোসেনের সঙ্গে নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দেড় দশকেরও বেশি পুরনো বিষয়। অথচ এ সব বিষয় নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ কেন পদক্ষেপ নেয়নি তা রহস্যজনক। পুলিশ ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোয়ারা দিতো নূর হোসেন। এই টাকার অংক কোটি টাকার কম নয় বলে তাদের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি মাসে কোটি টাকার ভাগ পেতেন পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা। ফলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা নূর হোসেন প্রকাশ্যে জমি দখল, মাদক ব্যবসা, যান বাহনে চাঁদাবাজি এমনকি কেউ প্রতিবাদ করলে হত্যা করতেও কার্পণ্য করতো না সে।
নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম বলেন, ২০০০ সালে নজরুলকে হত্যার উদ্দেশ্যে নূর হোসেন গুলি করেছিল, সেই নূর হোসেনই আবার ২০১৩ সালে কিভাবে পিস্তলের লাইসেন্স পায়। ক্ষুব্ধ নারায়ণঞ্জবাসীর অভিযোগ, ইন্টারপোলে ঘোষণা দিয়ে যে আসামিকে ধরার চেষ্টা করা হয় তিনিই কিনা বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার মাধ্যমে সেই এলার্ট প্রত্যাহার করিয়ে নেন। এলাকায় নির্বাচন করে কমিশনার নির্বাচিত হন। নগ্ন যাত্রাপালা আর জুয়ার আসর বসিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। জেলার অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা র‌্যাব-পুলিশ কারও মনে এই প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়নি।
জানা গেছে, নজরুল ইসলাম তার জীবন হুমকির মুখে থাকা অবস্থায় দুই মাস ধরে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তার জীবন রক্ষার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অফিসে কোনে সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত করেননি। তিনি তার উদ্বেগের কথা বলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের কাছে।
এমপিপুত্রের মধ্যস্থতায় ৬ কোটি টাকার চুক্তি
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামকে হত্যায় র‌্যাবের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিলেন একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ছেলে। নূর হোসেনের পক্ষে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যের ছেলে এই চুক্তি করেন বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম।
শহীদুল জানান, ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে নজরুলকে হত্যা করার এই পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানতে পেরেছেন এমন একজনের কাছ থেকে যিনি উভয় দিকে এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ২৭ এপ্রিল নজরুল এবং তার চার অনুসারীকে অপহরণ ও হত্যার প্রায় এক সপ্তাহ আগে হত্যাকারীদের কাছে টাকা পৌঁছে দেয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনে ‘পেশাদাররা’
নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনের খুনিরা ‘পেশাদার’ বলে ধারণা করছেন ময়না তদন্তকারীরা। গত ২৭ এপ্রিল অপহৃত হওয়ার তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে নজরুল ও চন্দন সরকারসহ অন্যদের হাত-পা বাঁধা লাশ পাওয়া যায়। ৩০ এপ্রিল রাত থেকে সকালের মধ্যে সাতটি লাশের ময়নাতদন্ত হয় নারায়ণগঞ্জ সদর (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল মর্গে।
ময়না তদন্তকারী বোর্ডের প্রধান নারায়ণগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, তারা কাজ শুরুর ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে ওই সাতজনকে হত্যা করা হয়। তার ধারণা, হত্যা করা হয়েছিল শ্বাসরোধে। তবে তার আগে অজ্ঞান করার জন্য মাথায় আঘাত করা হয়। এরপর লাশ ফেলে দেয়া হয় নদীতে। ৩০ এপ্রিল লাশ ভেসে ওঠার পর তা অর্ধগলিত ছিল বলে নিহতদের চেনা যাচ্ছিল না। পরনের কাপড় এবং ব্যবহার্য জিনিস দেখে তাদের শনাক্ত করেন স্বজনরা।
ইটের বস্তা বেঁধে নদীতে লাশগুলো ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাদের পেটে ছিল ক্ষত, পুলিশ কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, সম্ভবত লাশ যেন ভেসে না ওঠে সেজন্য পেট কেটে দেয়া হয়েছিল।
সাতজনের প্রত্যেককে একই কায়দায় হত্যা করা হয় জানিয়ে ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের মনে হয়েছে, দক্ষ-পেশাদার-প্রশিক্ষিত লোক ছাড়া এমন হত্যাকা- সম্ভব নয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দুই-একদিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জনের কাছে জমা দেবেন বলে তিনি জানান।
র‌্যারকে দায়ী করে লিখিত অভিযোগ
নিহত নজরুলের শ্বশুর সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বিগত দিনে তিনি র‌্যাবের বিরুদ্ধে যেসকল মৌখিক অভিযোগ করেছিলেন তা লিখিত আকারে পুলিশের ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে তিনি তার লিখিত অভিযোগটি জমা দিয়েছেন। তদন্ত কমিটি সাক্ষী হিসাবে তার লিখিত অভিযোগটি গ্রহণ করেন।
নিহত নাসিক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটিও এ হত্যাকা-ে র‌্যাব ১১ কে দায়ী করেছেন। তিনি এ মামলার ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান আসামী নূর হোসেনকে সুস্থ অবস্থায় গ্রেফতার করলেই র‌্যাবের সম্পৃক্ততার বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, র‌্যাব নূর হোসেনকে সুস্থ অবস্থায় গ্রেফতারের পরিবর্তে গুম করে ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, নূর হোসেন গ্রেফতার হলেই নৃশংস এ হত্যাকা-ে র‌্যাবের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমানিত হয়ে যাবে। ফলে তাকে পাওয়া যাবে না বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন।
অগ্রগতি আশানুরূপ নয়
নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুলসহ সাত খুনের মামলার তদন্তের অগ্রগতি হয়েছে তবে তা আশানুরূপ নয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের চলমান অস্থিরতা নিরসনে এবং অপরাধীদের ধরতে সাত খুনের মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমরা তদন্তে বেশ কিছুদূর এগিয়েছি তবে তা যথেষ্ট নয়। যতদূর এগিয়েছে তার আলোকে গন্তব্যে পৌছাতে সময় লাগবে। বর্তমানে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আমরা এগুচ্ছি। র‌্যাবের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে তদন্ত করা আমাদের কাজ নয় মামলার তদন্ত করা আমাদের কাজ। র‌্যাবের বিরুদ্ধে তদন্ত করার বিষয়ে আমরা কোন ইনস্ট্রাকশন পাইনি।
তিনি আরো বলেন, এই মামলায় সোমবার গুলশান থেকে রতন নামের একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এর আগে ১৫ জনকে রিমান্ডে নেয়া হলেও তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। মামালার অগ্রগতিতে তা কাজে লাগবে। নূর হোসেনসহ তার সহযোগীদের ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে সোমবার । বাতিল করা অস্ত্রগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
র‌্যাবের কার্যালয় ঘেরাও করবে আইনজীবীরা
নিহত আইনজীবি চন্দন সরকার এবং প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আগামী রোববার নারায়ণগঞ্জের র‌্যাব-১১ এর কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে জেলা আইনজীবী সমিতি। মঙ্গলবার দুপুর ১২ টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বার ভবনের সামনে এক সমাবেশে এ ঘোষণা দেন সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে আদালতপাড়া প্রদক্ষিণ করে। মঙ্গলবার দুপুর ১২ টা থেকে ১টা পর্যন্ত আইনজীবীরা কালো ব্যাচ ধারণ করে কর্মবিরতি পালন করেন।
এসময় সাখাওয়াত আরো বলেন, বৃহস্পতিবার প্রতীকি অনশন কর্মসূচীতে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী নেতারা সংহতি প্রকাশ করবেন। তিনি অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার দাবি করেন এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে প্রত্যাহারকৃত ডিসি, এসপি ও র‌্যাবের সিও এর বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু, অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ, অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী ভূইয়া প্রমুখ।
অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, যেদিন অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার নিখোঁজ হন সেদিন আমরা র‌্যাবের কাছে গেলেও র‌্যাব পাত্তা দেয় নাই। প্রত্যাহারকৃতদের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষী প্রমাণিত হলে গ্রেফতার দাবি করছি।
গ্রেফতারকৃতরাও নূর হোসেনের কথা বলছে
৭জনকে হত্যা ঘটনায় এ পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত ১৫ জন রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, নূর হোসেন চেয়ারম্যানের নির্দেশেই নজরুল অপহরণ ও হত্যার শিকার হতে পারেন। এর আগেও নূর হোসেন চেয়ারম্যান কাউন্সিলর নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। নূর হোসেন বিভিন্ন সময়ে তাদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনাও করেছিল। তবে ঘটনার আগে তারা কিছুই জানতো না। ১৫ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিন গতকাল সোমবার আসামিরা সাতজনকে অপহরণ ও খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়ে অস্বীকার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তে অগ্রগতি হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে লিংক রোড ধরে ঢাকায় যাওয়ার পথে অপহৃত হন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং তাঁর চার সহযোগী। প্রায় একই সময়ে একই সড়ক থেকে গাড়িচালকসহ অপহৃত হন আইনজীবী চন্দন সরকার। তিন দিন পর গত ৩০ এপ্রিল একে একে ছয়জনের এবং পরদিন ১ মে আরেকজনের লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে।
নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম গত রোববার র‌্যাবের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, নজরুলকে র‌্যাব তুলে নিয়ে হত্যা করেছে। এর জন্য আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নিয়েছেন র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা। র‌্যাব-১১-এর সিও তারেক সাঈদের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। অপহরণের ঘটনার পরদিন আমি র‌্যাব-১১-এর সিও, মেজর জাহাঙ্গীর, মেজর রানা এবং নূর হোসেন, ইয়াসিনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করতে পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলামের কাছে যাই। কিন্তু পুলিশ সুপার আমাকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিলে মামলা হালকা হয়ে যাবে। এরপর তাঁরা ছয়জন আসামির নাম বাদ দিতে বললে আমরা সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দিই।

শেয়ার করুন