ভারতের ভবিষ্যৎ সরকার গঠন ও তিন মহিলার অসাধারণ গুরুত্ব

0
95
Print Friendly, PDF & Email

মোবায়েদুর রহমান: ৯টি পর্বের ভারতীয় সাধারণ নির্বাচনের অষ্টম পর্বের নির্বাচন আজ (বুধবার) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই পর্বে ৭টি রাজ্যের ৬৪টি আসনে ভোটগ্রহণ। আগামী ১২ মে শেষ পর্বে অর্থাৎ নবম পর্বের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই পর্বে অনুষ্ঠিত হবে ৪১টি আসনের ভোটগ্রহণ। ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত ৭টি পর্বের নির্বাচনে মোট ৪৩৮টি আসনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারতের লোকসভার ৫৪৩টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২টি আসনে ভারতের প্রসিডেন্ট ২ ব্যক্তিকে  নির্বাচন করবেন। এটি হতে যাচ্ছে ভারতের ষোড়শ লোকসভার নির্বাচন। ১২ মে চূড়ান্ত পর্বের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ১৬ মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হবে। বোধগম্য কারণেই ভারতের সাধারণ নির্বাচনের ওপর সমগ্র দুনিয়ার মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে। ১৩০ কোটি লোকের এই দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম গনতন্ত্র। বৈচিত্র্যের এই দেশ ভারত ২৮টি রাজ্য এবং ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত। আগামী ১ জুন অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে গঠিত হবে আরেকটি রাজ্য। নতুন রাজ্যের নাম হবে তেলেঙ্গনা। রাজধানী হবে অন্ধ্রপ্রদেশের বর্তমান রাজধানী হায়দারাবাদ। আসমুদ্র হিমাচল এই বিশাল ভারতের রাজধানী দিল্লীর মসনদে কে আসীন হতে যাচ্ছেন, সেটি নিয়ে দেশ বিদেশে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশেও ভারতের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ বিশেষকরে শিক্ষিত সচেতন মানুষের আগ্রহ ও জল্পনা কল্পনার কমতি নাই।
নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি দি রাইজিং স্টার
বলাবাহুল্য যে সর্বভারতীয় ভিত্তিতে মূল প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা হবে প্রধান দুই দল, অর্থাৎ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেসের মধ্যে। বিজেপির তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হলেন, গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কট্টরপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি। পক্ষান্তরে কংগ্রেসের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হলেন, প-িত নেহরুর প্রোপৌত্র রাহুল গান্ধী। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে এই নির্বাচন নিয়ে প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা তথা জরিপ অর্থাৎ এক্সিট বা ওপিনিয়ন পোলেরও কোন কমতি নেই। দেশ বিদেশের সবগুলো নির্বাচনী পূর্বাভাসে এক বাক্যে বলা হয়েছে যে, সরকার গঠন করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন অর্থাৎ ২৭২টি আসন এককভাবে কোনো দলই লাভ করবে না। তবে দল হিসেবে এককভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাবে বিজেপি। এপ্রিল মাসে পরিচালিত মতামত জরিপে অনুযায়ী বিজেপি পেতে পারে সর্বাধিক ২১৪টি আসন। পক্ষান্তরে কংগ্রেস পেতে পারে ৯২টি আসন। আমি অসংখ্য জরিপ পর্যালোচনা করেছি। কিন্তু কোন জরিপেই কংগ্রেসকে ১০০টির বেশি আসন দেওয়া হয়নি। সকলেই জানেন যে, প্রাক নির্বাচনী জরিপ সব সময় সঠিক হয় না। অনেক সময় অনেক বড় বড় কর্পোরেট হাউজ কোন দল বা ব্যক্তিকে প্রমোট করার জন্য এই ধরনের মতামত জরিপ নিজেরা বানিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয়।
এসব কথা সত্য জেনেও একটি কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সারা ভারতে এখন বিজেপি তথা মোদি হাওয়া বইছে। আমরা ভারতীয় নির্বাচনে কোন দল বা ব্যক্তি বিশেষের প্রতি কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব দেখাবো না। এই ব্যাপারে আমরা বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ থাকবো। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এই যে, বাংলাদেশের একটি চিহ্নিত মহল, মনে হচ্ছে, ভারতীয় নির্বাচনকে নিজেদের নির্বাচন হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং তাদের লেখালেখি এবং বক্তব্যে কংগ্রেসের বিজয় এবং বিজেপির পরাজয়ের জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আগেই বলেছি যে, আমরা এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবো। তবে সংবাদ ও ভাষ্য প্রদানে সত্যনিষ্ঠতা বজায় রাখবো। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, আগামী ১৬ মে যে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষিত হবে সেখানে এককভাবে বা জোটগতভাবে বিজয়ী হবে বিজেপি এবং তার নেতৃত্বাধীন জোট। দিল্লীর মসনদে অধিষ্ঠিত হবেন গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি।
যে সব রাজ্য নির্বাচনী বিজয়ে প্রধান ফ্যাক্টর
ভারতীয় লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩টি। ২৮টি রাজ্য এবং ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভার রাজ্য ওয়ারী আসন বরাদ্দ রয়েছে। সে হিসাবে সর্বাধিক আসন রয়েছে উত্তর প্রদেশের। আসন সংখ্যা ৮০টি। সর্বনিম্ন আসন রয়েছে ৩টি রাজ্যের। এগুলো হলো, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং সিকিম। প্রত্যেকের ১টি করে আসন। ২টি করে আসন ৩টি রাজ্যের। এগুলো হলো, গোয়া, মনিপুর এবং মেঘালয়। উত্তর প্রদেশের পর সর্বাধিক আসন রয়েছে মহারাষ্ট্রের। আসন সংখ্যা ৪৮টি। এরপর ৪২টি করে আসন রয়েছে ২টি রাজ্যের। রাজ্যগুলো হলো, অন্ধ্র প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। বিহারে রয়েছে ৪০টি আসন। তামিল নাডুর রয়েছে ৩৯টি আসন। সুতরাং আসন বরাদ্দের নিরিখে ভারতের কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই ৬টি রাজ্যের। আর রাজ্যগুলো হলো, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং তামিল নাডু। এই ৬টি রাজ্যের সম্মিলিত আসন সংখ্যা হলো ২৯১টি। সুতরাং এই ৬টি রাজ্যে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে তারাই দিল্লীর সরকার গঠন করবে।
বিজেপির প্রাধান্য
অধিকাংশ প্রাক নির্বাচনী জরিপ থেকে দেখা যায়, উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ৫১টি আসন। মহারাষ্ট্রের ৪৮টি আসনের মধ্যে ৩৭টি আসন পেতে পারে বিজেপি। বিহারে রাম বিলাস পাসওয়ানের এলজেপি দলের সাথে বিজেপির জোট গঠিত হয়েছে। এখানে ৪০টি আসনের মধ্যে এলজিপি এবং বিজেপি পেতে পারে ২৪টি আসন। অন্ধ্র প্রদেশের ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ২১টি আসন। গুজরাটের ২৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ২২টি আসন। ঝাড়খ-ের ২৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ১২টি আসন। মধ্য প্রদেশের ২৯টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ২৬টি আসন। রাজস্থানের ২৫টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ২১টি আসন। এই পূর্বাভাস থেকে দেখ যাচ্ছে যে, বিজেপি তার শরিক দলসমূহ ছাড়াই এককভাবে পেতে পারে ২১৪টি আসন।
তিন মহিলার অসাধারণ গুরুত্ব
সুতরাং সরকার গঠন করতে গেলে বিজেপির প্রয়োজন আরো অন্তত ৫৮টি আসন। এটি হলো ন্যূনতম প্রয়োজন। ঠিক এখানেই এসে পড়েন ভারতীয় রাজনীতির ৩ গুরুত্বপূর্ণ মহিলা নেতা। এরা হলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি, তামিল নাডুর মুখ্যমন্ত্রী এবং এআইএডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা এবং উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) সভাপতি মায়াবতী কুমারী। প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষায় দেখা যায় যে, উত্তর প্রদেশে মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি পেতে পারে ১০টি আসন এবং মুলায়েম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি পেতে পারে ১৪টি আসন। তামিল নাডুর জয়ললিতার এআইএডিএমকে পেতে পারে ২৪টি আসন। তবে এ ব্যাপারে ড্রাইভিং সিটে থাকবেন পশ্চিমবঙ্গের অগ্নিকন্যা তৃণমূল নেত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ৪২টি আসনের মধ্যে তার দল পেতে পারে ৩০টি আসন। সুতরাং বিজেপিকে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সাথে কোয়ালিশন করতে হবে। এই পটভূমিতে এই ৩ মহিলা এবং মুলায়েম সিং যাদব আঞ্চলিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও সর্ব ভারতীয় রাজনীতি বিশেষকরে দিল্লীর সরকার গঠনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
এখানে একটি কথা বলা দরকার। বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য আসন প্রাপ্তি সম্পর্কে প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষায় যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে সেগুলো পরিসংখ্যানগতভাবে সঠিক হবে এমন কথা বলা যাবে না। তবে ফলাফল মোটামুটি আশেপাশে যাবে। সে বিচারে বলা যায় দিল্লীর মসনদের পরবর্তী অধিকর্তা হলেন নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। তার সম্পর্কে বাংলাদেশের আওয়ামী ঘরানা এবং ইসলামী ঘরানার রিজার্ভেশন থাকতেই পারে। কিন্তু কঠিন বাস্তব থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখলে বাস্তবতাকে ঠেকানো যাবে না।
অনেকের মনে এই প্রশ্নটি আইটাই করছে যে, নরেন্দ্র মোদি ভবিষ্যতে দিল্লীশ্বর হলে বর্তমান সরকারের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে? অথবা অন্যদের সাথেই বা কেমন হবে? সেই আলোচনা পরবর্তী কিস্তিতে।

শেয়ার করুন