সাত খুন মাফ!’

0
143
Print Friendly, PDF & Email

এই মৃত্যু-উপত্যকা আমার দেশ না,
এই জল্লাদের উল্লাস-মঞ্চ আমার দেশ না।
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না,

এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না’- পশ্চিমবঙ্গের কবি নবারুন ভট্টাচার্য্যের এই কবিতার কথাগুলোই যেন অনেক প্রবাসীর এখন মনের কথা।
 
অন্তত মঙ্গলবার রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত কয়েকজনের কথা শুনে তেমনই মনে হলো।
 
‘এই দেশে কোনো বিচার-আচার নাই। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন কেন, এখন কোথাও সাতশ খুন হয়ে গেলেও বিচারের গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না’- কন্ঠে ক্ষোভ, মুখে হাসি নিয়ে বাংলানিউজকে কথাগুলো বলছিলেন শারমীন আক্তার হ্যাপী।
 
মহাখালীর হ্যাপী শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেছেন বোনকে বিদায় জানাতে। তার বোন জেসমিন আক্তার লিপি ডেনমার্ক ফিরে যাচ্ছেন।
 
হ্যাপী জানান, স্বামী-সন্তান নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসেন লিপি। ইচ্ছা ছিল এবার দেশেই থেকে যাবেন, বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করাবেন।

 
কিন্তু কিছু স্বপ্ন পূরণ হয় না ধরে নিয়েছেন তিনি। আসার পর থেকে এ পর্যন্ত চারদিকে যা দেখেছেন আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
 
হ্যাপী বলেন, যেভাবে মানুষ নিখোঁজ হয়ে পরে লাশ হয়ে ফিরছে, তাতে ঘাবড়ে না গিয়ে পারা যায় না। কোন ভরসায় বাচ্চা নিয়ে এদেশে থাকবেন তারা?
 
‘তাই দেশের প্রতি প্রেম থেকে দেশে ফিরলেও, জীবনের প্রতি মায়া থেকে ভালোয় ভালোয় কেটে পড়ছেন তারা’- ছন্দ মিলিয়ে বলেন হ্যাপী।
 
তিনি বলেন, যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা আবার দূরদেশে, আর কিছু না, একটু নিরাপত্তার আশায়।
 
দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হা-হুতাশ যেন শেষ হয় না হ্যাপীর। তিনি বলেন, যে দেশে এতবড় বিডিআর বিদ্রোহের ঠিকমত ঘটনার বিচার হল না, সেখানে নারায়ণগঞ্জে সাতজনের খুনের বিচার হবে, এটা আশাই করা যায় না।
 
নারায়ণগঞ্জ সেভেন মার্ডার ঘটনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) জড়িত থাকার আশঙ্কাও সত্য হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
 
হ্যাপী বলেন, তারাও জড়িত থাকতে পারে। সত্যি যদি র‌্যাবের মধ্যে থাকে হয়ে থাকে, তাহলেতো বিচারের আশা বাদ দেওয়াই ভালো। তারা আইনের লোক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণই পাওয়া যাবে না। এক সময় ঘটনাটা চাপা পড়ে যাবে।
 
তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি এখন যা হয়েছে, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সবার সঙ্গে শেষ বিদায় নিয়ে যেতে হবে। কারণ ফেরার কোনো গ্যারান্টিতো নাই!
 
কথোপকথনের এক পর্যায়ে হ্যাপীর স্বামী আসেন। কাগজ-কলম, ক্যামেরা দেখে আগন্তুকদের পরিচয় বুঝে নেন তিনি। ইশারায় হ্যাপীকে সাবধান করে দেন।
 
চোখের ভাষায় যেন বুঝিয়ে দিলেন, সাংবাদিক হোক বা যেই হোক, কথা বলে বিপদ বাড়িও না। বিশ্বাস এখন কাউকেই করা যায় না।
 
এরপরই সুবোধ বালিকার মতো হ্যাপী জানালেন, তার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আর কিছু বলার নাই তার।
 
লিপি ও হ্যাপীর সঙ্গে বিমানবন্দরে এসেছেন তাদের ভাই সর্দার মো. আসলাম ও তার স্ত্রী।

 
খেলায় ব্যস্ত তাদের শিশুপুত্রদের দেখিয়ে আসলাম বলেন, বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেকেই বিদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এখানেতো কেউই নিরাপদ না। দেশ যেন মৃত্যুপুরী। দল করেও মরতে হয়, না করেও মরতে হয়।
 
নারায়ণগঞ্জ সেভেন মার্ডার ঘটনা প্রসঙ্গটি নিজেই তোলেন আসলাম।
 
তিনি বলেন, কিছু হলেই শামীম ওসমানের দিকে আঙুল। প্রকৃত অপরাধীকে না ধরে শুধু অভিযোগ তুলেই কেস ডিসমিস হয়ে যায়! বিচার তাহলে হবে কী করে?
 
আসলাম বলেন, এখন কথা কম বলে আগে অপরাধী চিহ্নিত করাটা জরুরি। খালি দোষারোপ করতে থাকলে আরও মারাত্মক ঘটনা ঘটতে পারে দেশে। মানুষ তখন শুধু শুধুই সরকারকে দায়ী করবে। দেশ শ্মশান হয়ে যাবে, আর কোনো লাভ হবে না।
 
বন্দরের নিচতলায় গাড়ির অপেক্ষা করছেন নোয়াখালীর তাসলিমা আক্তার। ওমান থেকে পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছেন তিনি, সঙ্গে সাড়ে তিনবছরের শিশুপুত্র।
 
বোরখা পরে রয়েছেন তাসলিমা, শুধু চোখ দু’টি দেখা যাচ্ছে। তবু তিনি ক্যামেরা ভয় পাচ্ছেন। বারবার কাপড় ঠিক করছেন, যেন চেহারা দেখা না যায়। হাতের গয়না লুকানোর চেষ্টাও চলছে সেই সঙ্গে।
 
নারায়ণগঞ্জের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত গণমাধ্যম থেকে জেনেছেন বলে জানালেন তিনি। তবে এ প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য করতে রাজি নন তিনি।
 
প্রশ্ন করতেই বারবার সন্তানের দিকে তাকান। এক পর্যায়ে বললেন, ‘দ্যাখেন, মাস দুয়েক থাকতে এসেছি। ভালোয় ভালোয় বাচ্চাটা নিয়ে ওমান ফিরে যেতে পারলেই বাঁচি। বিচার নিয়ে কথা বলার আমি কেউ না। বিচার থাকলে দেশের এই অবস্থা হয়, বলেন?’
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাসলিমার ভাই গাড়ি নিয়ে আসেন। দ্রুত পায়ে সেদিকে ছোটেন তাসলিমা, সন্তানকে আগলে রাখেন অচেনা মানুষের কাছ থেকে!

শেয়ার করুন