ছয় কোটি টাকায় সাত খুন: র্যাবের কেউ থাকতে পারবে না তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের

0
180
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও সরকার বা প্রশাসন এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যা মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে। তবে এ ঘটনার আট দিনের মাথায় নজরুলের শ্বশুর র‌্যাবকে দায়ী করে বক্তব্য দেওয়ার পর সরকার ও প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে।
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির পৃথক বৈঠকে এ ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি র‌্যাবের উদ্যোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া হাইকোর্ট এ ঘটনার সার্বিক তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। কমিটিতে র‌্যাবের কোনো সদস্য থাকতে পারবেন না, হাইকোর্ট সে কথাও আদেশে বলেছেন।
বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল ওই আদেশ দেন। একইভাবে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দিয়ে মামলা তদন্ত করতেও নির্দেশ দেন আদালত। র‌্যাবের সাবেক বা বর্তমান কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা আছে কি না, সে বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত করতে র‌্যাবের মহাপরিচালককেও (ডিজি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের আদেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ওই কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। কমিটিতে তিনটি মন্ত্রণালয় থেকে উপসচিবের পদমর্যাদার নিচে নয়—এমন দুজন করে প্রতিনিধি রাখতে বলা হয়। কমিটিতে জনপ্রশাসন, আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন করে প্রতিনিধি রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এ প্রতিনিধি মনোনয়ন করবেন।
আদেশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে কমিটি গঠন ও কার্যক্রম বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে গতকাল বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী শামীম সরদার। প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। এ ছাড়া আদালত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দিয়েছেন।
মন্ত্রিসভার বৈঠক: সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ পরিস্থিতিসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলেন। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী ওই আলোচনায় নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মনোভাব প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক হয়ে থাকলে নারায়ণগঞ্জ এলাকায় কর্মরত র‌্যাবের সাবেক সিও এত ক্ষমতা পেয়েছেন কোথায়? এর উৎস খুঁজে দেখতে হবে। কারণ, ক্ষমতার সিঁড়ি ব্যবহার করে কোনো কর্মকর্তা অপকর্ম করলে তাতে সরকারই বিপদে পড়ে।
ওই মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রিসভার সদস্যদের নানা প্রশ্নের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বারবার কথা বলছেন। এ বিষয়ে যা যা প্রয়োজন, সব করা হবে। জড়িত ব্যক্তিরা যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, ছাড় দেওয়া হবে না।
আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক: সচিবালয়ে গতকাল আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠক প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে। বৈঠকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। র‌্যাবের সদস্যরা ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে হত্যা করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আমু বলেন, প্রতিটি অভিযোগই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে যদি কোনো র‌্যাব কর্মকর্তা বা অন্য কেউ জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার যে সুপারিশ করেছে, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যেসব ঘটনা ঘটছে, তারা সেসব নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। এ দেশের বিষয় আমরা দেখব।’
বৈঠক সূত্র জানায়, কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে।
র‌্যাবের কমিটি: ছয় কোটি টাকা নিয়ে সাতজনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় র‌্যাব সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্ত করতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এর প্রধান র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আফতাব উদ্দিন আহমেদ।
র‌্যাবের আইন ও জনসংযোগ শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এ টি এম হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এটি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হলেন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আফতাব উদ্দিন আহমেদ। অন্য সদস্যরা হলেন র‌্যাব-১০-এর পরিচালক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার, র‌্যাব-৩-এর কর্মকর্তা মেজর মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান এবং র‌্যাব-১০-এর কর্মকর্তা এএসপি মো. সাজ্জাদ হোসেন।
র‌্যাব কর্মকর্তাদের অপরাধে জড়িত থাকার ব্যাপার তদন্তের জন্য বাহিনীর ভেতরে ‘ইন্টারনাল ইনকোয়ারি সেল’ নামে একটি শাখা আছে। এটি আইইসি নামে পরিচিত। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সেলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ধরনের সেল থাকতে কেন নতুন কমিটি করা হচ্ছে—জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান বলেন, সেলের হাতে অনেক কাজ। সে কারণে আলাদা কমিটি করা হয়েছে।
গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহূত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। এর তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় একে একে ভেসে ওঠে সাতজনের মরদেহ।

শেয়ার করুন