শেষবেলায় মোদিমুখী বরুণ

0
144
Print Friendly, PDF & Email

শুনতে একটু কেমন কেমন লাগতে পারে, তবে ঘটনা হলো, সুলতানপুরে নরেন্দ্র মোদির ঠাঁই হয়েছে এই হালে। ইদানীং শহরের কিছু কিছু এলাকায় মোদির এক-আধটা হোর্ডিং দেখা যাচ্ছে। কিছু পোস্টারও। অথচ দিন কয়েক আগেও এখানে এলে নাকি বোঝা যেত না, নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইছেন। গোটা উত্তর প্রদেশের ছবির সঙ্গে সুলতানপুর ছিল এতটাই আলাদা।
কারণটা কী? জানা গেল, সুলতানপুরের বিজেপি প্রার্থী ফিরোজ বরুণ গান্ধী নাকি ঠিকই করেছিলেন, প্রয়াত পিতা সঞ্জয় গান্ধীর ‘কর্মভূমি’-তে ভোটে জিততে মা-বাবার আশীর্বাদ আর নিজের যোগ্যতা ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন তাঁর নেই। এই শেষবেলায় রাজ্যে মোদি-হাওয়ার লাভ তুলতে নিজের গরজে এখন মোদির ছবি দিয়ে হোর্ডিং লাগাচ্ছেন তিনি।
আমেথি ও সুলতানপুর যখন এক আসন ছিল, তখন ১৯৭৭ সালে সঞ্জয় গান্ধী এখান থেকে ভোটে লড়েছিলেন। সেবারের সেই ভোট কার্যত ছিল সঞ্জয় ও তাঁর মা ইন্দিরার বিরুদ্ধে গণভোট। স্বাভাবিক কারণেই সঞ্জয়ের হার হয়েছিল জনতা দলের হাতে। তিন বছর পর আসন আলাদা হয়ে গেলে সঞ্জয় আমেথি থেকে জেতেন। ভোটের মাস দেড়েকের মাথায় বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের যখন মৃত্যু ঘটে, বরুণ তখন চার মাসের শিশু।
গত ভোটে পিলিভিট থেকে জিতেও এখানে কেন দাঁড়ালেন, নিজেই সেই ব্যাখ্যা দিয়ে বরুণ বলেছেন, ‘কেউ আমাকে পিলিভিট ছাড়তে বলেনি। পিলিভিটও আমাকে ছাড়তে চায়নি। সুলতানপুরকে আমি বেছেছি স্রেফ বাবার স্বপ্ন সফল করতে।’ কী সেই স্বপ্ন? ‘বাবা চেয়েছিলেন কৃষির সঙ্গে শিল্পের বিকাশ ঘটাতে। আমি বলব না, সুলতানপুরকে আমি প্যারিস বানিয়ে দেব। কিন্তু শিল্প-বিকাশ ঘটিয়ে শহরের ছবিটা পাল্টানো যায়। ঠিক বাবা যেমন চেয়েছিলেন।’
আমেথি, সুলতানপুর ও রায়বেরিলি এত গা ঘেঁষাঘেঁষি যে একে অন্যের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পায়। অথচ, আমেথি ও রায়বেরিলিতে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থাকলেও সুলতানপুরে কোনো দলেরই মৌরসি পাট্টা নেই। একদা কংগ্রেস, পরে সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি ও বিজেপি নিজেদের মধ্যে বারবার এই কেন্দ্রটি ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছে। এই যেমন দুই বছর আগে রাজ্য বিধানসভা ভোটে সুলতানপুরের পাঁচ পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রই সমাজবাদী পার্টি দখল করে। সেই ফলের নিরিখে এবার সমাজবাদী পার্টির শাকিল আহমেদের তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমোনোর কথা। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র তিনিই আবার মুসলমান। কেন্দ্রে মুসলমান ভোটও কুড়ি শতাংশের মতো। কিন্তু ভোটের অঙ্ক সব সময় পাটিগণিতের সরল হিসাব মেনে চলে না। বরুণও শেষ পর্যন্ত তা উপলব্ধি করেছেন। তাই একলা চলো নীতি ছেড়ে উড়তে চাইছেন মোদি-হাওয়ায় পাখা মেলে।
গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই কেন্দ্রে ভোট পেয়েছিল কমবেশি মাত্র ৪০ হাজার। সেবার জিতেছিলেন আমেথির রাজা সঞ্জয় সিং। এই সঞ্জয়ের সঙ্গে বরুণের বাবার সম্পর্ক ছিল গলায় গলায়। রাজীবের মৃত্যুর পর আদ্যন্ত কংগ্রেসি সঞ্জয় সিংয়ের সঙ্গে দলটির সম্পর্কহানি হলে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ’৯৮ সালে আমেথি থেকে কংগ্রেসের সতীশ শর্মাকে হারিয়ে জেতেন সঞ্জয়। পরে আবার সম্পর্ক জোড়া লাগলে সঞ্জয় কংগ্রেসে ফেরেন ও ২০০৯ সালে সুলতানপুরে জেতেন। এবার সেই সঞ্জয়কে আসাম থেকে রাজ্যসভায় জিতিয়ে তাঁরই স্ত্রী অমিতাকে কংগ্রেস টিকিট দিয়েছে সুলতানপুরে। মোদি-হাওয়া না থাকলে কার ভাগ্যে যে শিকে ছিঁড়বে জোর দিয়ে বলা যেত না। এখনো বলা কঠিন, যদিও এটুকু বলা যেতেই পারে, মোদির নামে মেরুকরণ ও গান্ধী পদবির দৌলতে বরুণ কিছুটা এগিয়ে।
মেরুকরণের কথা ঠারেঠোরে অনেকেই স্বীকার করছেন। যেমন আম আদমি পার্টি। দলটি এখানে প্রার্থী দিয়েছে যাঁকে সেই শৈলেন্দ্র প্রতাপ সিংয়ের ব্যাখ্যায়, বিজেপি একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করেছে। মুজাফফরনগরের দাঙ্গার পর বেশ কিছুটা ধর্মগত মেরুকরণ করিয়েছে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যদের পাশে অনগ্রসর সমাজের একটা অংশকে মোদির নামে কাছে টানতে পেরেছে। জাঠ ভোটও লোকদলের মায়া কাটিয়ে এবার বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। বিজেপিকে হারাতে মুসলমান ভোট যত এককাট্টা হচ্ছে, ততই হিন্দু মেরুকরণও ঘটছে। এই প্রবণতার বিরুদ্ধ শক্তিগুলো জোটবদ্ধ নয়। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি একে অন্যের সঙ্গে লড়ছে। সুলতানপুরও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে আবার বরুণের পক্ষে রয়েছে তাঁর পদবি। এই তল্লাটে ‘গান্ধী’ পদবির একটা আলাদা ওজন আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রমেশ জয়সোয়াল ও কিরণ পান্ডে আবার এক অদ্ভুত কথা শোনালেন। ‘এই অঞ্চলের গ্রামের অশিক্ষিত অনেকের এখনো ধারণা, গান্ধীরাই নাকি দেশ চালায়। তাদের জন্যই নাকি এলাকার যা কিছু উন্নতি।’ মেরুকরণ কতটা তা-ও বোঝা গেল ওঁদের কথায়। জয়সোয়াল বললেন, ‘সত্যি বলতে কি এবার যতজন প্রার্থী, তাঁদের মধ্যে সেরা হচ্ছেন সমাজবাদী পার্টির শাকিল আহমেদ। চোখ বুজে ওঁকে ভোট দেওয়া যায়। কিন্তু জিতবেন বরুণ গান্ধী। কারণ সেই মোদি।’
অষ্টম পর্যায়ের এই ভোটে এমনিতে বিজেপির হারানোর কিছুই নেই। বড় পরীক্ষা আসলে কংগ্রেসের। সুলতানপুরসহ যে ১৫টি আসনে ৭ মে ভোট, সেগুলোর মধ্যে সাতটি পেয়েছিল কংগ্রেস, পাঁচটি বিএসপি ও তিনটি এসপি। বিজেপি একটাও পায়নি। সুলতানপুরে বরুণ গান্ধী জিতলে তাঁকেও তাই স্বীকার করতে হবে, প্রয়াত পিতার স্বপ্ন সার্থক করতে সাহায্যের বাড়ানো হাতটা গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীরই।

শেয়ার করুন