দশ হাজারের বেশি মামলার জালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

0
98
Print Friendly, PDF & Email

মামলা জালে জড়িয়ে নাস্তানাবুদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষক-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের করা ১০ হাজারেরও বেশি মামলার বিরুদ্ধে লড়াই করছে এ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩টি মামলা দায়ের হচ্ছে। এসব মামলার বেশিরভাগের আসামিই শিক্ষা সচিব। এ ছাড়া অঙ্গসংস্থাগুলোর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসামি হচ্ছেন। দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মামলার বাদীদের নানা অন্যায়-অনিয়মের রাস্তা বন্ধ করতে গিয়েই বেশিরভাগ মামলা খেতে হয়েছে। অবশ্য দু-একটি ক্ষেত্রে কোনো কোনো বাদীকে সরকারি ভুল সিদ্ধান্তের ভুক্তভোগী ও সংক্ষুব্ধ হিসেবেও পাওয়া যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব মামলা মোকাবেলা করতে সরকারকে অযথাই লাখ লাখ টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে। এর বাইরে মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জনগণ সুশাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে শিক্ষাবাণিজ্য। মন্ত্রণালয় এবং অঙ্গ সংস্থাগুলোর দৈনন্দিন কাজেরও গতি কমছে। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এসব মামলা মোকাবেলায় সরকারি নির্দিষ্ট বিভাগ ও কর্মকর্তা থাকলেও বেশিরভাগ মামলার রায়ই বিপক্ষে যাচ্ছে। ফলে একদিকে মামলা চালানোর অর্থ যেমন গচ্চা যাচ্ছে, আরেকদিকে আর্থিক বিষয়ের মামলায় হেরে আক্কেলসেলামিসহ মূল অর্থও পরিশোধ করতে হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, নানা অন্যায়-অনিয়ম বন্ধ করতে গিয়েই তাদের বেশিরভাগ মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বর্তমানে শুধু মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধেই সাড়ে ৮ হাজার মামলার পাহাড় গড়ে উঠেছে। ১৫ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে তিনি জানান, তাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে তার বেশিরভাগই মূলত আইনের অভাবে উৎপত্তি লাভ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আদালতে সরকার পক্ষের কৌঁসুলিরা যথাযথ ভূমিকা না রাখার কারণে সরকারকে মামলায় হারতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও সংক্রান্ত ১২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সব কটিতেই সরকার হেরেছে। আবার ২০১২ সালের আগস্ট মাসের এক হিসাবে দেখা গেছে, ওই মাসে দেওয়ানিসহ ৭৬টি মামলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় সংস্থা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) বিরুদ্ধে। একই মাসে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে ২৩টি। এর মধ্যে আটটিতে মাউশি আপিল করেছে। ওই মাসে মোট তিনটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তিনটিতেই মাউশি হেরেছে। ২০১২ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাউশির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রয়েছে ২৫টি। আর ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে ৬৮টি।
মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, যেহেতু মন্ত্রণালয়ের মামলায় জয় লাভের রেকর্ড খুব কমই রয়েছে, তাই ভবিষ্যতে আর কোনো মামলায় যাতে হেরে যেতে না হয়, সে
লক্ষ্যে সরকার নতুন করে কোমর বেঁধে নামছে। এজন্য প্রথমত মামলাগুলো মোকাবেলার জন্য এ খাতে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। এছাড়া মামলাগুলো তদারকির জন্য প্রেষণে একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। এর বাইরে মামলা দক্ষ ও শক্তভাবে লড়াইয়ের জন্য প্যানেল আইনজীবীও নিয়োগ করা হবে।
শিক্ষাসচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক মামলা মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়ের উপরোক্ত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলার সরকারের বিপক্ষে চলে যায়। এতে শেষ পর্যন্ত সরকারকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয়। যে কারণে সামান্য অর্থ ব্যয় করে বড় আর্থিক ক্ষতি যদি রোধ করা যায়, তা হলে সার্বিকভাবে তা সরকারের জন্য ভালো।
কত মামলা বর্তমানে : এক হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে মাত্র দেড় হাজারের মতো। আর বেশিরভাগ মামলা মন্ত্রণালয়ের অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে আসামি হয়েছে মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা সচিব। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রয়েছে ৬৮টি। এসব মামলার বেশিরভাগই অধীনস্থ সংস্থাগুলোর।
বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মাউশির বিরুদ্ধে।
এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৩০ মার্চ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৭ হাজার ২২টি। এর মধ্যে দেওয়ানি মামলায়ই বেশি। এর বাইরে রিট পিটিশন মামলাও থাকে। মার্চ মাসে এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা হয় ২১টি আর রিট মামলা হয় ১১টি। এ প্রতিষ্ঠানের এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১২ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট মামলা ছিল ৫ হাজার ৪৪০টি। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত মামলার সংখ্যা ৭ হাজার ২২টিতে পৌঁছে। আর প্রতি মাসে গড়ে মামলা বেড়েছে প্রায় ৮৪টি। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৩টি মামলার শিকার হচ্ছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বিরুদ্ধেও বর্তমানে শতাধিক মামলা রয়েছে।
কোন ধরনের মামলা : মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা থেকে জানা গেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় নিয়েই বেশি মামলা হয়ে থাকে। সব চেয়ে বেশি মামলা হয় শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত আদেশ, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা লংঘন ইত্যাদি বিষয়েও মামলা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হাতে শিক্ষার্থী ও নারী সহকর্মীর যৌন হয়রানি সংক্রান্ত ঘটনাতেও মামলা হচ্ছে। সাধারণত এসব মামলায় সরকারকে বিবাদী করা হয় না।
মাউশির এক কর্মকর্তা জানান, অবৈধ প্রক্রিয়ায়ও শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলেই তারা আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছেন। এতে ঝুলে যাচ্ছে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া। আবার সরকারকে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ওইসব শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনও গুনতে হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেয়ার কারণে প্রতি মাসে সরকারকে গুনতে হচ্ছে অন্তত ১০০ কোটি টাকার বেশি। আবার অবৈধভাবে এমপিও নিয়েছে এমন অর্থের পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকারও বেশি।

শেয়ার করুন