নজরুলকে হত্যার প্রকাশ্য ঘোষণা ছিল নূর হোসেনের

0
144
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন। হত্যা করার জন্য তিন দফা গুলি করলেও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম বেঁচে যান এবং এসময় ২ জন নিহত হন। নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন অপহরণের পর উদ্ধার তত্পরতা ছিল শুধুই শ্লোগান, আর প্রশাসনে ছিল ঢিলেঢালা অবস্থা। কোর্টে হাজিরা দেয়ার আগের দিন এক নেতাকে নজরুল ইসলাম ফোন করে বলেছিলেন, ‘ভাই আমি আগামীকাল হাজিরা দিতে কোর্টে যাব। আমার প্রতি একটু খেয়াল রাখবেন।’ ঘটনার ৬ দিন পর প্রধান আসামি নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার একটি অংশ। কেউ কেউ সাজানো নাটক বলেও দাবি করেছেন। ঘটনার সময় আইনজীবী চন্দন সরকার দেখে ফেলায় এবং খুনিদের কাউকে চিনতে পারায় তাকেসহ গাড়ী চালককে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় নিহত স্বজন, এলাকার ব্যবসায়ী, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে আলাপকালে তারা কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে হত্যার মোটিভসহ বিস্তারিত তুলে ধরেন। মুক্তিপণ আদায়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা ও লেনদেন নিয়ে বিরোধ, দখল পাল্টা দখল, পরকীয়া, অপহরণ, গুম ও হত্যার প্রতিকার না হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ শহরসহ সমগ্র জেলা সন্ত্রাসের জনপদে রূপান্তরিত হয়েছে বলে তাদের দাবি। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকা জুড়ে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। স্বজনহারাদের আহাজারি থেমে নেই।

ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি ফারুক ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, সাত হত্যাকাণ্ডে কিছু অগ্রগতি হয়েছে এবং জড়িত সন্দেহে ২ জনকে আটক করা হয়েছে। নিশ্চিত হয়ে জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে বলে দুই কর্মকর্তা জানান।

কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের ভাই আবদুস সালাম ও আশপাশের বাসিন্দারা জানান, ১ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিমপাড়া এলাকার রাস্তা নির্মাণকালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের ফুফাতো ভাই মোবারক হোসেনের সাথে তর্ক হয়। উভয়ের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। ঐ সময় মোবারক ফোন করে নূর হোসেনকে বলেন, ‘তুমি আওয়ামী লীগের নেতা থাকতে নজরুল ইসলামের হাতে আমি লাঞ্ছিত হলাম। এনিয়ে একটা কিছু করবো।’ ঘণ্টাখানেক পর ১২টি মাইক্রোবাসযোগে নূর হোসেন ওরফে নূর বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা ঘটনাস্থলে এসে এলোপাতারি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। খুঁজতে থাকে নজরুল ইসলামকে। রাস্তা ভেঙ্গে ফেলে সন্ত্রাসীরা। পরদিন নূর হোসেনের উপস্থিতিতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মোবারক হোসেনের পুত্র আশিক বাদি হয়ে নজরুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ১৬ জন সহকর্মীর নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এ মামলায় হাইকোর্ট থেকে নজরুল ইসলামসহ ১৬ জন এক মাসের জামিন পান। এরপর তাদেরকে নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেয়ার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। সেই আদেশ অনুযায়ী ২৭ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ আদালতে নজরুল ইসলামসহ ১৬ জন হাজিরা দেয়ার জন্য যান। ঢাকা থেকে রওয়ানা দেয়ার আগে তিনি স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির সঙ্গে কথা বলেন।

সেলিনা ইসলাম বলেন, এই মামলার পর স্বামী নজরুল ইসলামের জীবন রক্ষায় ঢাকায় পাঠিয়ে দেন তিনি। সেলিনা সন্তান নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে থাকেন। ঢাকা থেকে রওয়ানা দেয়ার আগে পাঞ্জাবি পরার সময় ফোন করে নজরুল স্ত্রীকে বলেন, বিউটি আমার পাঞ্জাবিটি এক জায়গায় ছিদ্র।’ এ অবস্থায়ই তিনি পাঞ্জাবি পরে রওয়ানা দেন। এসময় বিউটি স্বামীকে বলেন, ‘সাবধান তোমার শত্রুরা তত্পর। তোমার ক্ষতি করতে পারে। সতর্কতার সাথে আসিও।’ কোর্টে উপস্থিত হয়ে স্ত্রীকে হাজির হয়েছি বলে জানান। বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটে স্ত্রীকে কোর্ট থেকে নজরুল জানান, আমার জামিন হয়েছে। ঢাকায় চলে যাচ্ছি। সাবধানে যাইও বলে স্ত্রী টেলিফোন রেখে দেন। এটাই স্ত্রীর সঙ্গে নজরুলের শেষ কথা। এর কিছুক্ষণ পর ফতুল্লা স্টেডিয়ামের কাছে নজরুল ইসলাম ও আইনজীবীসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। এরপর নজরুল ইসলামসহ সাতজন পরিবারের কাছে লাশ হয়ে ফিরে আসেন। পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নূর হোসেনের মাদক, চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকার ভাগ স্থানীয় প্রশাসন থেকে শীর্ষ প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়মিত পেয়ে আসছিলেন। একইভাবে দলীয় এক শ্রেণির নেতা নূর হোসেনের কাছ থেকে পেতেন মোটা অংকের চাঁদা। এ কারণে নূর হোসেন প্রকাশ্যে সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ও সন্ত্রাসী লালন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা বীরদর্পে করে আসছিলেন। নূর হোসেন ও তার ক্যাডার বাহিনীর কাছে সিদ্ধিরগঞ্জবাসী এক যুগ ধরে জিম্মি ছিল।

১৯৮৬ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জসহ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ- ৪ (সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লা) আসনে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে বিপুল ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পিছনে নজরুলের ব্যাপক ভূমিকা ছিল বলে এলাকাবাসী জানান। এরপর সংসদ সদস্যের সাথে নজরুল ইসলামের সর্ম্পক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। পরের বছর ১৯৯৭ সালে নজরুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। এ বছর নূর হোসেনও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন। নূর হোসেন সে সময় ট্রাকের শ্রমিক ছিলেন। ১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৩ প্রার্থীর একজন নূর হোসেন। সে সময় বিতর্কিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে নূর হোসেন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে একই ইউনিয়ন পরিষদে নজরুল ও নূর হোসেন চেয়ারম্যান প্রার্থী হলে তত্কালীন সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামকে সমর্থন করলে নজরুল চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকে নূর হোসেনের সাথে নজরুলের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে বলে এলাকাবাসী জানান। এলাকাবাসী আরও জানান, একদিকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া, অপরদিকে সংসদ সদস্যের সাথে সুসম্পর্ক- এ বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। এরপর থেকেই নজরুলকে ঘায়েল করার জন্য নূর হোসেনসহ অন্যরা নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকে। এরই অংশ হিসাবে ১৯৯৭ সালে এক মিছিলে নুর হোসেন বাহিনী নজরুল ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি করলে সেময় গুলিতে শুক্কুর আলী নামে এক রিক্সা চালক নিহত হন। এরপর ১৯৯৯ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের অফিসে নজরুলকে টার্গেট করে গুলি করলে তারই বন্ধু আব্দুল মতিন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ ঘটনায় নুর হোসেনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা হয়। বর্তমানে আদালতে এ মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এরপর থেকে উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। নজরুলকে ঘায়েল করতে নুর হোসেন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সাথে হাত মেলান। এ সুযোগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নুর হোসেনের পক্ষ নিয়ে নজরুলকে ঘায়েল করতে নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নজরুল ২ নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী হন। নুর হোসেন ৪ নং ওয়ার্ড থেকে প্রার্থী হলেও নজরুলকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। তখন ৫ বার নজরুলের মনোনয়নপত্র বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। একবার নির্বাচনের কয়েকদিন পূর্বে আইন-শৃখংলা বাহিনী দিয়ে নজরুলকে তার বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। নজরুলের পরিবারের দাবি- এসব হয়েছিল নুর হোসেনের ষড়যন্ত্রের কারণেই। সে যাত্রায় ব্যর্থ হয়ে নুর হোসেন তার প্রতি আরও ক্ষিপ্ত হতে থাকেন। নজরুলের স্বজনরা জানান, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে নুর হোসেন বাহিনী নজরুলকে হত্যা করতে তার বাড়ি ঘেরাও করে আক্রমণ করে। সে সময় পুুলিশ নজরুলকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেলে নজরুল প্রাণে বেেঁচ যান। এরপরও থেমে থাকেনি নুর হোসেন ও তার বাহিনী। এসময় তার হাতকে শক্তিশালী করতে আদমজী ইপিজেডে নজরুলের সাথে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুব লীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতির ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্ব থাকায় তাকেও দলে নিয়ে নেন নুর হোসেন। এ সুযোগে নজরুলের আদমজী ইপিজেডের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন যুবলীগ নেতা মতিউর রহমান মতি ও সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নেন কাউন্সিলর নুর হোসেন। এরপর থেকে কাউন্সিলর নজরুল ও তার সহযোগিরা অপহরণ আতংকে ছিলেন। নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তার স্বামী হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেছেন। তিনি আরও জানান, গণমাধ্যমে নুর হোসেনের বিরুদ্ধে কোন রিপোর্ট আসলেই ফোনে হুমকি দিচ্ছে। তিনি তার ছেলে-মেয়ে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

শেয়ার করুন