টেকনাফ সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের হাট

0
69
Print Friendly, PDF & Email

কক্সবাজার থেকে শাহ আমিন পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার মইজ্জ্যারটেক সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে এসে থামে। স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে ওই বাস থেকে নামেন এক যুবক। এ সময় সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য কর্ণফুলী থানার দুই এসআই ব্যাগে কি আছে জানতে চান ওই যুবকের কাছে। ওই যুবকটি ব্যাগ ফেলেই শাহ আমানত সেতুর দিকে দৌড় দেয়। পেছন থেকে ধাওয়া করলেও কিছুক্ষণ পর অদৃশ্য হয়ে যায় যুবকটি। পুলিশ ব্যাগটি তল্লাশি চালিয়ে দেখতে পায় সেখানে আস্ত এক অটোমেটিক রাইফেল। আরও রয়েছে দুটি ম্যাগজিনসহ ৮ রাউন্ড গুলি। অস্ত্রটির গায়ে লেখা আছে ‘মেড ইন চায়না-২২ একে’। পুলিশের ধারণা, এই ভারি অস্ত্রটি এসেছে কক্সবাজার থেকে। মায়ানমার থেকে উখিয়া সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমন ভারী অস্ত্রের চালান আসছে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে। সীমান্ত ঘিরে এই অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এখন জমজমাট। বাংলাদেশ সীমান্তে অস্ত্র এনে কখনও স্কুল ব্যাগ, কখনও বাজারের ব্যাগসহ বিভিন্ন উপায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চট্টগ্রামে। সেখান থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে এখন অত্যাধুনিক সব ভারী অস্ত্র।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, টেকনাফ ও উখিয়া থেকে বিগত এক বছরে শতাধিক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের বেশির ভাগই চোরাচালান হয়ে দেশে ঢুকেছিল। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন স্তরে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, এই দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকার ৯টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের চালান আসছে। অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের অন্যতম রুট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের। দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরাও এই অঞ্চলে ভীষণ তৎপর। কখনো কখনো অস্ত্রের চালান থেকে খোয়া যাওয়া এক দুটি অস্ত্র আটক করে পুলিশ। অধিকাংশের কোনো খবর থাকে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এতে করে অস্ত্রের চালান আসছে নিয়মিত। সূত্র জানায়, উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় টেকনাফ উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা থাকে অরক্ষিত। যে কারণে চোরাকারবারিরা এ রুটটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে মায়ানমার ও ভারত হয়েই সাধারণত অস্ত্র ঢুকছে। তবে ভারী অস্ত্রগুলো ঢুকছে মায়ানমার সীমান্ত হয়ে এ পথেই। একে-৪৭ রাইফেল, এলএমজি, এম-১৬ রাইফেলসহ নানা ধরনের ভয়ঙ্কর অস্ত্র। স্প্যানিশ অস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগই আসে মায়ানমার থেকে। চাইনিজ রাইফেল, পিস্তল, রিভলবার, স্টেনগান, মেশিনগান, সাব- মেশিনগান, কালাশনিকভ সিরিজের একে-৪৬, একে-৪৭, একে-৫৪, একে-৫৬, একে-৭৪ ও এম-১৬-এর মতো ভয়ঙ্কর অস্ত্র আসছে এই রুটে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মায়ানমার বিচ্ছিন্নতাবাদী দল আরাকান আর্মি (এএ), ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান লিবারেশন ফ্রন্ট, মিজো বাহিনী, রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (আরএনও), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি), আরাকান কমিউনিটি পার্টি (এসিপি), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (নুপা)সহ ডজনখানেক গ্রুপ সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্রের ব্যবহার এবং অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এই রুটেই অবৈধ অস্ত্রের বড় ব্যবসায়ী টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। অস্ত্র নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্ধেক টাকা জামানত হিসেবে দিতে হয় এবং দুই এক দিনের মধ্যেই অস্ত্র এসে পৌঁছে যায় ক্রেতার হাতে। সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র বাংলাদেশের সীমান্ত গলিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে নির্ধারিত পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্ন উপায়ে দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসছে অস্ত্র। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাই অস্ত্র বহন করে থাকে বেশি। বিশেষ করে শ্রমজীবী রোহিঙ্গাদের এ কাজে এখন বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। সরেজমিনে জানা গেছে, সীমান্তের ওপার থেকে চোরাই পথে আসা অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য পাচারের ক্ষেত্রে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক ও মেরিন ড্রাইভ সড়কটি অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত একদিকে যেমন পেশাদার সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারিদের নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তেমনি পাচারের ক্ষেত্রেও নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কক্সবাজার-টেকনাফ আরাকান সড়ক। এছাড়াও অঘোষিত অস্ত্র চোরাচালানের গডফাদারেরা সাগর পথেও অস্ত্র পাচার করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। গত সপ্তাহে উখিয়ার বালুখালীর থাইংখালী ঢালারপাড় এলাকা থেকে দুই রাউন্ড গুলিসহ একটি বন্দুক উদ্ধার করে বিজিবি। পরিত্যক্ত অবস্থায় তা উদ্ধার করা হয় বলে বিজিবির দাবি। বিজিবির দাবি মতে, উখিয়ার থাইংখালী ঢালার মুখ এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ২ রাউন্ড গুলিসহ বন্দুকটি উদ্ধার করে তারা । বিজিবি সূত্র বলেছে, দেশের সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কক্সবাজার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ডাকাতের উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তে আরও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তবে এসব ভারী অস্ত্রশস্ত্র ওইসব সন্ত্রাসী দলের হতে পারে বলে বিজিবির দাবি। সন্ত্রাসীরা কক্সবাজার ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এসব অস্ত্র ব্যবহার ও বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে আসছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক পাচারকারীদের কাছে বাংলাদেশ ট্রানজিট রুট হিসেবে বেশ নির্ভরযোগ্য হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০০১ সালে জাতিসংঘ প্রদত্ত একটি প্রতিবেদনে এর মূল কারণটা চিহ্নিত হয়েছিল। বলা হয়েছিল ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। কারণ মাদক উৎপাদনকারী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ এবং ক্ষুদ্র অবৈধ অস্ত্র উৎপাদনকারী ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্টের’ মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের অবস্থান। একই মত পোষণ করে লন্ডনভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক অন স্মল আর্মস’ ও কলম্বো ভিত্তিক ‘সাউথ এশিয়ান স্মল আর্মস নেটওয়ার্ক’। কক্সবাজার জেলার এসপি আজাদ মিয়া জানান, সীমান্ত গলিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের বিষয়টি আগে ছিল। এখন অনেকটা কমে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে। এরপরেও অস্ত্রসহ ব্যবসায়ীরা গ্রেফতার হচ্ছে। পুলিশের নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

শেয়ার করুন