অর্থনৈতিক ক্ষত কমাতে শ্রম আইনে বিশেষ ছাড়

0
250
Print Friendly, PDF & Email

মীর মনিরুজ্জামান: ২০১৩ সালের শেষ ভাগ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থির এক সময়। হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা ক্ষত রেখে যায় অর্থনীতিতে। সে ক্ষত সারাতে শ্রমিকদের দিয়ে বাড়তি কাজ করিয়ে নেয়ার সুযোগ চায় স্থানীয় ও বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি শ্রম আইনে বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে সে সুযোগই শিল্প মালিকদের করে দিয়েছে সরকার। গত ২২ এপ্রিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে তৈরি পোশাক শিল্পকে শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা থেকে ছয় মাসের জন্য অব্যাহতি দিয়েছে। একই দিন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোকেও শ্রম আইনের ৬, ৯, ১০০, ১০২, ১০৫ ও ১১৪ ধারা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এ অব্যাহতির মাধ্যমে কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে বাড়তি কাজ করানোর অধিকার পেয়েছেন। তবে সরকারের এসব ছাড়ের সুযোগ নিয়ে মালিকরা অস্থিরতার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারলেও শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাড়তি কর্মঘণ্টার চাপে পড়েছেন তারা। সরকারের এসব উদ্যোগকে শ্রমিক নেতারা দেখছেন শ্রমিকস্বার্থবিরোধী হিসেবে। তাদের মতে, শ্রম আইনের কোনো ধারা রহিত করার অর্থ হলো শ্রমিকদের অধিকার হরণ করা। শ্রম আইনের ১০০ ধারায় বলা হয়েছে, শ্রমিকদের দিয়ে দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। তবে ওভারটাইমের জন্য অতিরিক্ত বেতন দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা কাজ করানো যাবে। ১০২ ধারায় বলা আছে, কোনো শ্রমিককে দিয়ে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। তবে ওভারটাইমের বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো যাবে। কিন্তু বছর হিসাবে তা সাপ্তাহিক ৫৬ ঘণ্টা অতিক্রম করবে না। শ্রম আইনের এ দুই ধারা থেকে অব্যাহতি আদায় করে নিয়েছেন পোশাক শিল্প মালিকরা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী শ্রমিকদের দিয়ে এখন থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করিয়ে নিতে পারবেন পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। এদিকে শ্রম আইনের ১০৫ ধারায় শ্রমিকের ক্ষতিপূরণমূলক সাপ্তাহিক ছুটির কথা বলা হয়েছে। কোনো কারণে শ্রমিক সাপ্তাহিক ছুটির দিন কাজ করলে তা পুষিয়ে নিতে অন্য কোনো দিন ছুটি ভোগ করতে পারবেন। কর্মঘণ্টা সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে ধারাটিতে। তাতে বলা হয়েছে, আহার বিরতিসহ শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ১০ ঘণ্টার বেশি হবে না। এটি বাড়াতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। ৬ ধারায় সার্ভিস বুক সংরক্ষণের কথা বলা আছে। আর শ্রমিক রেজিস্টার, টিকিট ও কার্ড সংরক্ষণের কথা বলা আছে ৯ ধারায়। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর জন্য আগামী ছয় মাস এসব ধারা রোহিত করা হয়েছে। এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মিকাইল শিপার বলেন, গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এখন এ খাতে বাড়তি চাপ রয়েছে। এ কারণে শ্রমিকরা যাতে ৬০ ঘণ্টার অধিক কাজ করতে পারেন, সেজন্য শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা থেকে এ শিল্পকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকরা যাতে সাপ্তাহিক ছুটি পান, তা নিশ্চিত করা হবে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রমিকের স্বার্থেই শ্রম আইন। এ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা থেকে যখন কোনো খাত বা প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি দেয়া হয়, তখন শ্রমিকের অধিকার ও কল্যাণ বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমিকস্বার্থ। আর শ্রমিকের স্বার্থ যখন ক্ষুণ্ন হয়, মালিক তখন লাভবান হন। মূলত মালিকপক্ষকে সুবিধা দিতেই শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারা থেকে শিল্প-কারখানাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। শ্রমিকের সঙ্গে আলোচনা করে কখনো এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। বাংলাদেশ সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আকতার বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা থেকে পোশাক শিল্পকে অব্যাহতি শ্রমিক অধিকার হরণের নামান্তর। এতে মালিকরা তাদের ইচ্ছামতো শ্রমিকদের খাটিয়ে নেয়ার সুযোগ পাবেন। অনেক শ্রমিক এতে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। কাজের মানও এতে খারাপ হবে। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের দৈনিক ১৬০ কোটি টাকার বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে। আলোচ্য সময়ে ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে ৪১ কোটি টাকার। ১২ কোটি টাকার মূল্যহ্রাস হয়েছে ও বিলম্বিত জাহাজীকরণের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি টাকা। এছাড়া সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ২২ কোটি ও অতিরিক্ত পরিবহন খরচ হয়েছে ৬৮ লাখ টাকা। এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বাংলাদেশের শ্রম আইনে সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ করার বিধান নেই। তৈরি পোশাক শিল্পে অনেক সময় ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ হয়। সেক্ষেত্রে পৃথক হিসাব দেখিয়ে শ্রমিকদের ওভারটাইম ভাতা দেয়া হয়। কিন্তু শ্রম আইনের এ দুটি ধারা থেকে অব্যাহতি পেলে পৃথক খাতা খোলাসহ কমপ্লায়েন্স নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই। কমপ্লায়েন্স মেনেই শ্রমিকরা ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবেন। চীন ও সিঙ্গাপুরে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ৬০ থেকে বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি দরকার।

শেয়ার করুন