রেলস্টেশন থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
ভারতের গুজরাট রাজ্যের ছোট্ট শহর ভাদনগরের রেলস্টেশনে চা বিক্রি করত এক বালক। কালক্রমে সে বালকই ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে লড়ছেন। তিনি আর কেউ নন, ভারতীয় জনতা পার্টির [বিজেপি] নেতা নরেন্দ্র মোদি। শৈশবের সেই স্মৃতি ভুলিয়ে অনেক আগেই নাম লিখিয়েছিলেন রাজনীতিতে। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রবেশ করেন জাতীয় রাজনীতির মূল মঞ্চে। তার উত্থানটা রূপকথার মতোই। রেলস্টেশনের চা বিক্রেতা মোদির রাজনীতিতে হাতেখড়ি হিন্দু কট্টর মৌলবাদী দল আরএসএসের কর্মী হিসেবে। মোদির আসল উত্থান ২০০২ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়। সে সময় হিন্দু দাঙ্গাবাজদের উসকে দিয়ে হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যার ষড়যন্ত্রে মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও গুরু আদভানির কল্যাণে বেঁচে যান। এর পরও নরেন্দ্র মোদির নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে গুজরাট দাঙ্গার ছায়া। এ সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছেন তারা সে বিষয়ে আদৌ চিন্তিত নন। বরং মোদিই তাদের তুরুপের তাস। যত বিতর্ক আর অভিযোগই থাকুক না কেন, মোদির ওপর ভর করেই আরও একবার ভারতের ক্ষমতায় আসীন হবে বিজেপি- এমনটাই ভাবছেন সবাই। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক হয়েছিল অনভিজ্ঞ মোদির। তারপর মাত্র ১২ বছরের মাথায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী। তার সহকর্মীদের মতে, যৌবনের শুরু থেকেই লক্ষ্য অর্জনে আপসহীন ছিলেন হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ৬২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
নেতিবাচক একজন
বাংলাদেশ তো বটেই পশ্চিমা জগতেও নরেন্দ্র মোদির কোনো পজিটিভ ইমেজ নেই। সর্বত্রই তার পরিচয় একজন ‘দাঙ্গাবাজ’ এবং কট্টর হিন্দু হিসেবে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোদিকে দাঙ্গাবাজ হিসেবে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গুজরাট দাঙ্গার সব অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেও বিশ্বজুড়ে মোদির নেতিবাচক ইমেজটাই বেশি। এর পরও এবার ভারতে মোদির জয়জয়কার হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল বলে মানছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। নরেন্দ্র মোদি মানে কী? কট্টর মোদি সমর্থকরা বলবেন, ‘উন্নয়ন’ আর ‘সুশাসন’। বিরোধীরা ব্যাখ্যা করবেন, ‘কট্টর হিন্দুত্ব’। এটাই মোদি। তাকে অস্বীকার করা যায় না। সংঘ-অন্তপ্রাণ নরেন্দ্র মোদি কাজ শুরু করেছিলেন একজন সামান্য প্রচারক হিসেবে। ২০০১ সালে গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কেশুভাই প্যাটেলকে সরিয়ে দিলি্ল অফিসের সাধারণ একজন নরেন্দ্র মোদিকে দায়িত্ব দিয়েছিল বিজেপি। তার মেন্টর ছিলেন লাল কৃষ্ণ আদভানি। ‘হিন্দুত্বের পোস্টারবয়’ মোদির উত্থানের পিছনেও ছিল এই ‘লৌহপুরুষের’ হাত। এর পরের বছরই ঘটল সবরবতী এঙ্প্রেসের আগুন লাগার ঘটনা ও তৎপরবর্তী দাঙ্গা। দাঙ্গার অভিযোগ থাকলেও গত দুটি রাজ্যসভা নির্বাচনে গুজরাটে মুসলমানদের ভোট পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। গত এক দশকে সেখানে সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বরং গুজরাটের উন্নয়ন, চোখ ধাঁধানো বিদেশি বিনিয়োগ খোদ ভারত রাষ্ট্রের উন্নয়ন গতির সীমা অতিক্রম করেছে। আর তাই নেতিবাচক কট্টর হিন্দুত্বের ইমেজ ছাপিয়ে নিজের সম্ভাবনাটাই উজ্জ্বল করেছেন তিনি।
বিস্ময়কর উত্থান
সত্যিকার অর্থেই যেন রূপকথা হার মানায় নরেন্দ্র মোদির উত্থান কাহিনী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে মানুষটির নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে তার প্রাথমিক জীবন ছিল অতি সাধারণ। ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গুজরাটের মেহসানা জেলায় একটি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোদি। বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার বাবা দামোদর দাস একটা ছোট্ট দোকানে চা বানাতেন। কেটলিতে চা ভরে ভাদনগর রেলস্টেশনের ট্রেনযাত্রীদের কাছে বিক্রি করতে যেতেন ছোট্ট মোদি। তাদের থাকার বদ্ধঘরটিতে কেরোসিনের কুপিই ছিল একমাত্র ভরসা। মোদিকে যারা ছোটবেলা থেকে চেনেন তারা বলেন, তিনি ছিলেন সাধারণ ছাত্র। আর মোদির মতে তিনি চার দশক ধরে একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু এবং ‘নবরাত্রি’-তে শুধু পানি খেয়ে উপবাস করে আসছেন। জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, মোদি খুব অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলেন কিন্তু টেকেনি। তার ওই বিয়ের কথা গোপন রাখতে হয়েছিল কারণ তা না হলে আরএসএসের [রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ] একজন ‘প্রচারক’ হতে পারতেন না। স্কুলেই মোদি তার বাগ্মিতা দিয়ে আকর্ষণ কেড়েছিলেন। তিনি প্রায়ই পরিবার থেকে বের হয়ে পড়তেন। মাসের পর মাস বিভিন্ন নির্জন এলাকা, হিমালয়ের আশপাশ ঘুরে বেড়াতেন। একবার গিরি বনের একটি ছোট্ট মন্দিরে আবাস গড়েন। ১৯৬৭ সালে তো পরিবার থেকে একেবারেই বের হয়ে পড়েন। মোদি আরএসএসে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর। তিনি দিলি্লতে আরএসএসের অফিসে চলে আসেন। ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে অফিস পরিচ্ছন্ন থেকে শুরু করে চা বানানো, সিনিয়র নেতাদের নাশতা বানানো ও চিঠিপত্রের জবাব লিখতেন। বাসন-কোসন পরিষ্কার করা ও পুরো বিল্ডিংটাই ঝাড়পোছ করে পরিষ্কার করতেন। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে পোরা শুরু করলে মোদি গুজরাটে ফিরে আসেন। আত্দগোপন করলেও মাঝেমধ্যে দিলি্লর কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লিফলেট, পুস্তিকা ছাপিয়ে বিলি করতেন। রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার পরও দিলি্ল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পাস করেন এবং গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ে যান মাস্টার্স করতে। এর মধ্যেই কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার কারণে ১৯৮৭-৮৮ মেয়াদে বিজেপির গুজরাট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
গুজরাটের গুরু
এ দায়িত্ব পাওয়ার পর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন অন্য এক মোদি। তিনি গুজরাট বিজেপির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের মুঠোয় নিয়ে আসেন সর্বস্তরের কর্মীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মাধ্যমে। ১৯৯০ সালে আদভানির ‘রথযাত্রা’ আয়োজনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত ওই রথযাত্রার মাধ্যমেই বিজেপি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। ১৯৯১ সালে মুরালি মনোহর জোশির কন্যাকুমারী-শ্রীনগর ‘একতা যাত্রা’রও আয়োজন করেন মোদি। উল্লেখ্য, জোশি তখন ছিলেন দলের সভাপতি। তার ওই রাজনৈতিক উত্থানের অনেক সমালোচকও ছিলেন। ১৯৯২ সালে গুজরাট বিজেপিতে একা হয়ে পড়েন মোদি। কেশুভাই প্যাটেল, শঙ্করসিং ভাগেলা ও কাশীরাম রানার মতো সিনিয়র নেতারা মোদির উত্থানে ছিলেন ভীত। তিনি অন্যদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বিভিন্ন নেতার মধ্যে ভিন্নতার সুযোগ নিতেন- রয়েছে এমন অভিযোগও। ঘটনা পরিক্রমায় একসময়ের বিশ্বস্ত সহচর মোদি প্যাটেলের স্থলাভিষিক্ত হন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ২০০১ সালে। মোদির বর্তমান এ অবস্থানের পেছনে ২০০২ সালের দাঙ্গার প্রভাব রয়েছে, যার পেছনে তার সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ। মোদির ওপর অভিযোগের তির প্রায় এক দশক ধরে ঝুলে আছে। মোদির পদ রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন আদভানি। ২০০২ সালের নির্বাচনে দলের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মোদি। এরপর শুধুই এগিয়ে চলা। সময়ের পরিক্রমায় মোদি উন্নয়নের আদর্শ ও সুশাসনের দলীয় মডেল হয়ে পড়েন। বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণি তার পিছনে নেমে পড়ে। বিশেষ করে তার ‘আমি করতে পারি’ [আই ক্যান ডু অ্যাটিচিউড] দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিকসহ দেশের বড় বড় সমস্যা সমাধানের দৃঢ়তা তাদের মন জয় করতে সাহায্য করেছে। প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিজেপির কাছে সেরা অস্ত্র ছিলেন একমাত্র মোদিই।
বিয়ে বিতর্ক
বহুদিন ধরে নির্বাচনী হলফনামায় স্ত্রীর নাম লিখতেন না নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী মোদি স্ত্রীর নাম লিখে বিতর্কে জড়িয়েছেন। গুজরাটের বডোদরায় মনোনয়নপত্র পেশের সময় হলফনামায় প্রথমবার স্ত্রী হিসেবে যশোদাবেনের নাম লেখেন। এর পরই বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির মধ্যে শুরু হয়ে যায় বিতর্ক। কংগ্রেসের প্রশ্ন- এতদিন মোদি হলফনামায় স্ত্রীর নাম লেখেননি কেন? বিজেপির পাল্টা দাবি- এ পদক্ষেপ নিয়ে মোদি গোটা বিষয়টির নিষ্পত্তি করলেন। এর আগে গুজরাট বিধানসভায় মনোনয়নপত্র পেশের সময় মোদি কখনই স্ত্রীর নাম লেখেননি। মোদির প্রায় সমবয়সী ও বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা যশোদাবেনকে ১৭ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন মোদি। তবে কিছু দিন এ নিয়ে সর্বত্র হৈ-হুল্লোড় হলেও শেষ পর্যন্ত মোদি নিজেই স্বীকার করেন যে যে তিনি বিবাহিত এবং তার স্ত্রীর নাম যশোদাবেন। লোকসভা নির্বাচনের জন্য দাখিল করা এফিডেভিটে তিনি এ স্বীকারোক্তি দেন। এর আগে মোদি যতবারই নির্বাচন করেছেন, এফিডেভিটে ‘স্ত্রী’ কলামটি ফাঁকা রেখেছিলেন। স্ত্রীর কাছে কত সম্পদ আছে- সে ঘরে তিনি লিখেছেন, তার কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। তবে তার নিজের দেড় কোটি রুপির সম্পদ আছে বলে তিনি জানিয়েছেন। মোদির স্ত্রী যশোদাবেন বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা। তিনি মোদির শহর ভাদনগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ব্রাহ্মণওয়ারায় থাকেন। বিয়ের সময় উভয়ের বয়স ছিল প্রায় ১৭ বছর। বর্তমানে তাদের বয়স ৬২ বছর। কীভাবে বিয়েটা ভাঙল, তা মোদি জানাননি। তিনি বিয়েটা চেপেই যাচ্ছিলেন। যশোদাবেনের সঙ্গে মোদির বিয়ে টিকে ছিল তিন বছর। এরপর তাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। মোদিও আর বিয়ে করেননি। ২০০৯ সালে একটি ম্যাগাজিন যশোদাবেনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তিনি তার ‘ক্ষমতাধর স্বামী’র ভয়ে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে কয়েক দিন আগে এক বিরল সাক্ষাৎকারে যশোদাবেন বলেন, ‘আমি জানি তিনি [মোদি] একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন।’ বর্তমানে মাসে ১৪ হাজার রুপি পেনশন পাচ্ছেন যশোদাবেন এবং তিনি পশ্চিম গুজরাটে তার এক ভাইয়ের সঙ্গে নিভৃত জীবনযাপন করছেন। এর আগে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস বিয়ের ব্যাপারটি পরিষ্কার করে বলতে মোদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। গুজরাটের ২৬টি লোকসভা আসনের মধ্যে ভাদোদারা মোদির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বারানসি থেকেও নির্বাচন করবেন।৪৬ বছর মোদির সামাজিক, নৈতিক, আইনি অধিকার থেকে এতদিন স্ত্রীকে বঞ্চিত রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মহিলা কংগ্রেসের সভাপতি শোভা ওঝা। দিলি্লতে দলের সদর দফতরে এই নেত্রীর প্রশ্ন- ‘যিনি নিজের স্ত্রীকেই উপযুক্ত মর্যাদা দিতে পারেন না, তিনি কী করে দেশের নারীদের মর্যাদা দেবেন?’ স্ত্রীকে এতদিন যোগ্য সম্মান না দেয়ার নেপথ্য কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিজেপি পাল্টা জবাবে বলেছে- ‘কংগ্রেস মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, অপশাসন নিয়ে কিছু বলতে পারছে না বলেই এখন মোদির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অহেতুক প্রচারে নেমেছে।’ তবে বিজেপির এ দাবিও ধোপে টিকছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা কপিল সিবাল বলেছেন, ‘ভোটাররা প্রার্থীর গোপন রাখা বিষয়গুলোও জানতে চায়। আর মোদির মতো একজন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আরও বেশি জরুরি।’
আলোচনার কেন্দ্রে
ভারতের চলমান নির্বাচনে এবার সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদি। গুজরাটের গুরু থেকে এবার তিনি ভারতীয় গুরু হিসেবে আবিভর্ূত হচ্ছেন। কারণ অধিকাংশ জরিপ ও সমীক্ষার মতে তিনিই এ নির্বাচনে বেশ এগিয়ে রয়েছেন এবং তার দল বিজেপি ও মোর্চা সরকার গঠনে সক্ষম হলে তিনিই হবেন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী। যদিও শাসক কংগ্রেস এবং বিজেপিবিরোধী দলগুলো এসব জরিপের সঙ্গে একমত নয়, তথাপি নরেন্দ্র মোদির দল এবং মিত্ররা মনে করছে দেশে শাসকদের পরিবর্তন অনিবার্য এবং ‘হাওয়া’ তাদেরই অনুকূলে। কংগ্রেস এবং শাসক ইউপিএ জোটের শরিকরা দাবি করছে, মোদির পক্ষে জনমতের বিষয়টি যেভাবে ‘ভুল’ প্রমাণিত হয়েছিল ২০০৪ ও ২০০৯ সালে; এবারও তা ‘ভুল’ প্রমাণিত হবে মোদিবিরোধীরা তাদের জয়ের পক্ষে ব্যাপক আশাবাদী। তা সত্ত্বেও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের ধারণা যে মোদিই এগিয়ে আছেন ভোটের লড়াইয়ে। তবে তা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট কি না এ নিয়ে সংশয় রয়েছে অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের মধ্যে। মোদি ভাবছেন তিনিই জয়ী হতে যাচ্ছেন।
টাইমের তালিকায়
টাইম ম্যাগাজিন তাদের ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার-২০১৩’ নির্বাচনের জন্য সারা বিশ্ব থেকে ৪২ জন রাজনীতিক, উদ্যোক্তা ও সেলিব্রেটিকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান দিয়েছে। আর এ তালিকায় ঢুকে পড়েছেন নরেন্দ্র মোদি। মোদি প্রসঙ্গে টাইম বলেছে, ‘বিতর্কিত হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মোদি পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির শাসনক্ষমতা থেকে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে সরিয়ে দিতে পারেন।’ টাইমের এ সংক্ষিপ্ত তালিকায় একমাত্র ভারতীয় হিসেবে মোদিই স্থান পেয়েছেন। টাইম ম্যাগাজিনের বিজয়ীকে চূড়ান্ত করার আগে অনলাইন পাঠকদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়- ‘কে এ বছর সংবাদে ইতিবাচক অথবা নেতিবাচকভাবে সবচেয়ে প্রভাব তৈরি করতে পেরেছেন?’ বিস্ময়করভাবে নরেন্দ্র মোদি ২ হাজার ৬৫০ ভোট পান, যা মোট ভোটের ২৫ শতাংশ। তিনি অনলাইন ভোটে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।
মোদি ঝড়
চলছে ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচন। আর এ নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই চলছে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণা। হিন্দুত্ববাদ এবং ভারতীয় জাতীয়তার উগ্র প্রচারক, গুজরাটে ২০০২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মুসলমান নিধন প্রজেক্টের কারিগর নামে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদিই এ মুহূর্তে ভারতীয় নির্বাচনে ঝড় তোলা প্রার্থী। তার ক্যারিশমা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রযুক্তিনির্ভরতা, ভারতীয় জাতীয়তার প্রচার তাকে এনেছে পাদপ্রদীপের আলোয়। কংগ্রেসের নেহেরু পরিবারের হাত থেকে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা জনতার হাতে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে মোদি উচ্চারণ করেছেন ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’, ‘সব কা সাথে সব কা বিকাশ’- এ জিগির। বিজেপির নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের মূল জিগির হচ্ছে ‘ভোট ফর ইন্ডিয়া, ভোট ফর মোদি, ফর এ বেটার টুমরো’। মোদির প্রচারণায় আছে পাঁচ ‘টি’-এর ব্র্যান্ড ইন্ডিয়া। এ পাঁচ ‘টি’ হলো ট্যালেন্ট, ট্রেড, ট্র্যাডিশন, ট্যুরিজম, টেকনোলজি। এটাই হলো মোদির নির্বাচনী ভিশন। মেধা, বাণিজ্য, ঐতিহ্য, পর্যটন আর প্রযুক্তি দিয়ে তিনি বদলে দিতে চান ভারতকে। এনে দিতে চান এক উন্নততর সমৃদ্ধি। ভারতীয় সংস্কৃতি, যুবশক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ, গণতন্ত্র, নলেজ- এ সাত নীতির ওপর ভর করে ঘোষিত হয়েছে তার রেইনবো অব ইন্ডিয়া ক্যাম্পেইন। তিনি দিয়েছেন আট দফা উন্নয়ন মডেল। এগুলো হলো যুবশক্তির জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, নারী ও শিশুর ক্ষমতায়ন, নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি সংস্কার, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, আঞ্চলিক প্রত্যাশার ওপর ফেডারেল স্ট্রাকচার এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ। নরেন্দ্র মোদির পরিষ্কার লক্ষ্যভেদী ক্যাম্পেইন ভারতের ভোটারদের নজর কেড়েছে। নিজ রাজ্য গুজরাটেতিনবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর উন্নয়ন আর সুশাসনের যে নজির তিনি গড়েছেন তা ভারতে অনন্য হিসেবে প্রচারণা পেয়েছে।উন্নয়নের গুজরাট মডেল এখন বিশেষ আলোচ্য বিষয়। সব মিলিয়েই ভারতে মোদি ঝড় বইছে। আর এ ঝড়ের পিঠে চেপে তিনি সত্যিকার অর্থেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠতে পারেন কি না এখন দেখার বিষয় তা-ই।









