আতঙ্কের নাম সাদা পোশাক ও সাদা মাইক্রোবাস

0
212
Print Friendly, PDF & Email

আতঙ্কের নাম সাদা পোশাক আর মাইক্রোবাস। এই সাদা পোশাকধারীরাই নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে একের পর এক অপহরণ করছে। ব্যবহার করছে মাইক্রোবাস। অপহৃত ব্যক্তিদের কারো কারো লাশ পাওয়া যাচ্ছে। আর কেউ কেউ নিখোঁজ রয়েছেন। গত ১৩ ঘণ্টায় এক ডজন মানুষকে অপহরণ করা হয়েছে। বেশির ভাগ ঘটনায়ই সাদা পোশাকধারীরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়েছেন। এ দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। কারো সাথে কথা বললে বলা হয়, এসবের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত নয়, হয়তো সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধীরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে এই অপকর্ম করছে। কিন্তু কারা করছে তা-ও উদঘাটনে ব্যর্থ পুলিশ গোয়েন্দারা। এমনকি বহুল আলোচিত আবু বকর সিদ্দিক অপহরণের সাথে কারা জড়িত তা-ও দুই সপ্তাহে উদঘাটন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
গত রোববার বেলা আড়াইটার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার চার সঙ্গী। নজরুলের ব্যবহৃত গাড়িটি গাজীপুরের শালবন থেকে উদ্ধার হলেও তাদের কোনো খোঁজ নেই। প্রায় একই সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে অপহৃত হয়েছেন অ্যাডভোকেট চন্দন ও তার ড্রাইভার। তাদের কোনো হদিস গত সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর গ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী দীন মোহন মণ্ডল (৫০) ও তার ভাই কেদানী মোহন মণ্ডলকে (৪৫) পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকধারীরা গতকাল ভোর রাতে অপহরণ করে। তারা ওই গ্রামের মাধব মোহন মণ্ডলের ছেলে।
অপহৃত দীন মোহন মণ্ডলের স্ত্রী পুরবী রানী বর্মণ তার স্বামী ও দেবরকে অপহরণের কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, রাত ৩টার দিকে দু’টি প্রাইভেটকার ও একটি মাইক্রোবাসে অন্তত ১০ জন তাদের বাড়িতে গিয়ে এই অপহরণের ঘটনা ঘটায়। তারা ছিল সাদা পোশাকে ও নিজেদের পুলিশের লোক বলে পরিচয় দেন। কালিয়াকৈর থানার এএসআই তোফায়েল আহমেদ জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কালিয়াকৈর থানার ওসি ওমর ফারুক বলেন, অপহৃতদের খোঁজ মেলেনি। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে এই ঘটনা ঘটাতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য তাদের আটক করেনি। রাতে জানা গেছে অপহৃত দুই ভাইকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিস্তারিত জানা যায়নি।
গতকাল ভোর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় ঘরের দরজা ভেঙে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়েছে দুই শিক্ষককে। স্থানীয় গণজাগরণ টিউটোরিয়াল কোচিং সেন্টারের প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন সবুজ (৩৫) ও একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক স্বপনকে (২৮) অপহরণ করা হয়। অস্ত্রধারীরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দেয়। তারা সবুজ ও স্বপনের হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা জানতে চাইলে অস্ত্রধারীরা সকালে থানায় খোঁজ নেয়ার জন্য বলে। সকালে থানায় খোঁজ নিয়ে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ময়মনসিংহের গুলপুকুরপাড় এলাকা থেকে অপহৃত হয়েছেন ইসলামী ব্যাংক ময়মনসিংহ শাখার কর্মকর্তা ইলিয়াস উদ্দিন। এখনো তার খোঁজ মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়। গত ১৯ এপ্রিল রাতে পুলিশ পরিচয়ে বন্দুকধারীরা এই এলাকার পানিবাণ্ডা গ্রামের কলিমউল্লাহর ছেলে ময়মনসিংহ হোমিওপ্যাথিক কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইউসুফ আলী সোহাগকে তুলে নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা। ওই রাতে একই গ্রামের ফয়জুল হকের ছেলে ঢাকা তিতুমীর কলেজের অর্থনীতি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বছির আহমেদ, পাঁচগাঁও গ্রামের আজহার আলীর ছেলে মোর্শেদ আলী ও তার ছোট ভাই সোহেল ঢাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। বছিরের বোন তিতুমীর কলেজের ছাত্রী রহিমা আক্তার রিয়া অভিযোগ করেছেন, ঢাকার কোনো থানায় তার ভাই নিখোঁজের ব্যাপারে একটি সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত দায়ের করতে পারেননি। ময়মনসিংহে গত রোববার রাতে রাসেল নামের আরো একজন অপহৃত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অপহরণ নিয়ে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সম্প্রতি যেভাবে গুম ও অপহরণ হচ্ছে তা সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। তাই সরকারের সামনে এখন দু’টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ অন্যটি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, অপহরণ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা রয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পরে সারা দেশে আইনের শাসনে বিশ্বাসী মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
গতকাল এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, দেশে আইনবহির্ভূত হত্যা, গুম, অপহরণ বেড়েই চলেছে। অথচ সরকার এ বিষয়ে কোনো হস্তপে করছে না। সরকারের র‌্যাব, পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা এই হত্যা, গুম, অপহরণ করছে।
এ দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে এই ঘটনা ঘটাচ্ছে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধীরা। তবে কারা এই অপরাধী তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। শীর্ষ কর্মকর্তারা বলে আসছেন, কিছু প্রতারক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে এই অপরাধ করে আসছে। কর্মকর্তারা এই দাবি করলেও কারা এই ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের শনাক্ত করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এমনকি বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রেজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকরকে দুর্বৃত্তরা ছেড়ে দিলেও তাকে কারা অপহরণ করেছিল তাদের ব্যাপারে তথ্য পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপহরণকারীদের কাউকে শনাক্ত অথবা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা-মানবাধিকারের নির্বাহী পরিচালক আবুল বাসার বলেছেন, রেজওয়ানার স্বামীকে কারা অপহরণ করল তাদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুর্বৃত্তরা ধরা না পড়ায় একের পর এক ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, এই অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অপরাধের ঘটনা অনেক কমে যেতো।

শেয়ার করুন