রামকৃষ্ণ মিশন স্টাইলে চলছে আওয়ামী লীগ

0
229
Print Friendly, PDF & Email

রামকৃষ্ণ মিশন স্টাইলে চলছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। সিটি নির্বাচনে ভরাডুবির পর উপজেলায়ও বিপর্যয়। তৃণমূলে দলাদলি। বছরের পর বছর নেই সম্মেলন। কেন্দ্রে না আছে সমন্বয়, না আছে নেতৃত্বের জবাবদিহিতা। ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়ে দায়িত্বশীল নেতারা বহালতবিয়তে। দলের অবস্থা স্থবির, নড়বড়ে। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটিতে এখন নিষ্ক্রিয়, গণবিচ্ছিন্ন, কর্মীবিমুখ সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এদের অনেকের না আছে দলে, না আছে মানুষের কাছে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি! সাধারণ সম্পাদক কেতাবে আছেন, গোয়ালে নেই। আওয়ামী লীগ এখন সমর্থকগোষ্ঠীতে পরিণত। হারিয়েছে রাজনৈতিক দলের অতীত গৌরব। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন সিনিয়র সদস্য ছাড়া দলীয় কর্মকাণ্ডে বাকিদের ভূমিকা নেই বললেই চলে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর থেকে ক্রমে প্রশাসননির্ভর হয়ে পড়ছে দলটি। দলের যে কোনো সংকটে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাই যেন একমাত্র ভরসা। বিশাল এ রাজনৈতিক দলের বৃহৎ পরিসরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনেকেই দর্শকের ভূমিকায়। এমনকি দলের সংকটে-দুর্যোগেও ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি অনেক সিনিয়র নেতাকে। আন্দোলন, সংগ্রাম আর রাজপথের সাহসী দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে এখন স্থবিরপ্রায়। গত পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দুবার পরিবর্তন এলেও নতুন নেতৃত্ব চাঙ্গা করতে পারেনি মাঠ পর্যায়ের দলীয় কর্মীদের। বরং জেলায় জেলায় দলীয় কোন্দল আরও বেড়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নেতৃত্বের মান। দলের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে নেতারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার অশুভ লড়াইয়ে মেতেছেন। নেতা-কর্মীদের মধ্যে আদর্শের বদলে স্বার্থের সম্পর্কই প্রাধান্য পাচ্ছে সর্বত্র। দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা আফসোস করে বলছেন, আওয়ামী লীগ ক্রমে তার নিজস্ব ঐতিহ্য হারাচ্ছে। নতুন মেরুকরণে ত্যাগীদের গুরুত্ব কমছে, হাইব্রিডদের প্রভাব বাড়ছে। সাংগঠনিক স্থবিরতায় দলের বিবর্ণ চিত্র কাউকে স্পর্শ না করলেও তৃণমূলে সংগঠন প্রতিনিয়ত দুর্বল হচ্ছে। মাঠের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বেরিয়ে আসছে এসব তথ্য। দলের দুই তৃতীয়াংশ সাংগঠনিক জেলায়ই সম্মেলনের খবর নেই বছরের পর বছর। দশক, যুগ পেরিয়ে গেলেও নতুন সম্মেলনের অপেক্ষায় থাকা কর্মীরা হতাশার জাল বুনছেন বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা কোনো কোনো প্রবীণ নেতা চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে, কিন্তু সেখানেও দল চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। স্মরণকালের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর দলীয় কাঠামোর নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। মন্ত্রিসভার মতোই চমক আসে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও। দলীয় কর্মীদের অতি আপনজন আর দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা প্রয়াত আবদুল জলিলের পরিবর্তে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। প্রেসিডিয়ামেও ঠাঁই হয় সৌভাগ্যবান অনেকের। নেতৃত্বে চমক এলেও কেন্দ্রের এসব নেতা দলকে ঢেলে সাজাতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই কর্মীদের অভিমত। উপমহাদেশের অন্যতম এই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি অতীতে কখনো এতটা সাংগঠনিক স্থবিরতার মুখে পড়েনি। ২০০৯ সালের ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নতুন এই কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় দল সাজাতে বিস্তর কর্মসূচি নেওয়া হলেও আজও তা কর্মসূচির মধ্যেই রয়ে গেছে। বাস্তবায়ন নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি অংশ কর্মীদের কাছে সুবিধাবাদী হিসেবে যতটা আলেচিত, সাংগঠনিকভাব ততটা গ্রহণযোগ্য নয়। কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিভাগওয়ারি দল সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হলেও গত পাঁচ বছরে হাতে গোনা কয়েকটি জেলায় দলীয় সম্মেলন হয়েছে। বাকি জেলাগুলোয় খবর নেই। ২০টি জেলায় নেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ১৫টি জেলায় সভাপতি আছে সাধারণ সম্পাদক নেই, আবার সাধারণ সম্পাদক আছে, সভাপতি নেই। আটটি সাংগঠনিক জেলায় ১৬ বছর ধরে সম্মেলন হয় না। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ অন্যতম। আওয়ামী লীগের মতো একটি গণতান্ত্রিক দলে সাংগঠনিক জেলার নেতৃত্বে টানা ১৬ বছরের কমিটি তৃণমূল নেতাদের হতাশই করেনি, কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়েছেন। হতাশ এই অংশ এখন শুধু সমর্থকের ভূমিকায়। মাঠের নেতারা বারবার তাগিদ দিলেও কেন্দ্র এ ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন।

সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আহমদ হোসেন ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী কিছুটা সক্রিয় থাকলেও বাকিদের খবর নেই।

পর পর দুবার কেন্দ্রে ঠাঁই পাওয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা হাতে গোনা কয়েকটি জেলায় সম্মেলন করলেও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে বিতর্ক এড়াতে পারেননি। মাঠের ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দের নেতৃত্ব নির্বাচনে নেপথ্য ভূমিকা রেখেছেন কেউ কেউ। এমন অভিযোগ এনে দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নালিশ করেছেন তৃণমূল নেতারা। দায়িত্বশীল একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরাসরি রাজনীতি করা তৃণমূলের অভিজ্ঞ নেতাদের কাছে দলের বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকদের খুব একটা আবেদনও নেই। প্রেসিডিয়ামেরও দু-একজন আছেন যারা রাজনীতির পথপরিক্রমায় উঠে না আসায় কর্মীদের কাছে পরিচিত মুখ নন। কেন্দ্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ঠাঁই পাওয়া নেতাদেরও অনেকেই কর্মীদের কাছে এখনো হাইব্রিড হিসেবেই আলোচিত। দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে এমন কেউ কেউ স্থান পেয়েছেন যাদের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার কোনো যোগ্যতা নেই, বরং খোরাক হতে পারে হাসি-ঠাট্টার। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়েই মুখরোচক আলোচনা শোনা যায় কর্মী-সমর্থকদের মুখে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে এমন দু-একজন ঠাঁই পেয়েছেন যাদের অতীত কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই।

মাঠ পর্যায়ে প্রবীণ আর নবীনের দ্বন্দ্বে কেটে গেছে অনেক সময়। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করতে সাংগঠনিক সফরও তেমন কাজে আসেনি। গত দুবারের কমিটিতে থাকা প্রেসিডিয়াম সদস্যরা সারা দেশে সাংগঠনিক সফর প্রায় ভুলেই গেছেন। ২০০৯ সালের পর থেকে মাত্র একবারই দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা তৃণমূলে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সফরে বেরিয়েছিলেন। এ সময়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই পাওয়া অভিজ্ঞ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও কেন্দ্রেীয় সফরে অংশ নিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় এ সফরেও প্রেসিডিয়ামের একাধিক সদস্য রাজধানীর বাইরে পা ফেলেননি। দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফরুল্লাহ, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মোহাম্মদ নাসিম, ওবায়দুল কাদের দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফরে অংশ নিলেও বাকিদের দেখা যায়নি। দলে পারফর্ম করতে না পারায় অবশ্য সবশেষ ২০১২ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে প্রেসিডিয়াম থেকে শেষ পর্যন্ত বাদ পড়েন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। বর্তমান কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্যের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়েও দলের অভ্যন্তরে হচ্ছে নানামুখী আলোচনা। পর পর দুই কমিটিতে প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই পাওয়া সতীশ চন্দ্র রায়কে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দেখা পাওয়া ভার। তবে দলের দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধু কনভেনশন সেন্টারের সভামঞ্চে সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্যদের পাশে তাকে দেখা গেছে।

দল ক্ষমতায় থাকার সুবাদে মাঠের চিত্র আমলে না নিয়ে বরং দলের কেন্দ্রীয় নেতারা চলছেন গা ভাসিয়ে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য মাঝেমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের সক্রিয় করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরেও যখন নেতারা সতর্ক হননি বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনা নিজেই তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেন। ২০১০ সালের ১২ নভেম্বর থেকে গণভবনে শুরু হওয়া এ মতবিনিময়ের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে অনেকটাই সফল হন। ২০১৩ সালের ২২ জুন পর্যন্ত চলে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতবিনিময়। ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৪৪টি জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন দলীয় সভানেত্রী। এ সময়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা গণভবনমুখী সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এ মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সংগঠনের কোন্দল, বিবাদ আর বিবর্ণ চিত্রই উঠে আসে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তৎপর হলেও কেন্দ্রের নেতাদের দায়িত্বহীনতা ও সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তাই প্রত্যক্ষ করছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা। পরিস্থিতির আলোকে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর জেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং আহ্বায়ক ও যুগ্ম-আহ্বায়কের কাছে লেখা এক চিঠিতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা শাখার সম্মেলন শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেন। সৈয়দ আশরাফের চিঠিতে সাড়া দেননি তৃণমূলের নেতারা। বাধ্য হয়ে সৈয়দ আশরাফ ২০১২ সালের ১০ জুন দলীয় সব সংসদ সদস্যকে আরেক দফা চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে তাগিদ দেন। দফায় দফায় তাগিদে সারা দেশে মাত্র ১২টি সাংগঠনিক জেলায় সম্মেলন হয়।

২০১০ সালের ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে জনমত গঠনে জেলায় জেলায় সমাবেশ এবং পরে সাতটি বিভাগে মহাসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়। বিভাগীয় সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হলেও একটি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়নি। এ কর্মসূচিরও ফলোআপ করতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই। তিনি সরকারি সফরে কোনো জেলায় গেলে সেখানে রাজনৈতিক সভা করে ঢাকায় ফিরেছেন। এ ছাড়া বিচ্ছিনভাবে দলের কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং দলের সাংগঠনিক সম্পাদকরা কয়েকটি জেলা সমাবেশে বক্তব্য দেন।

বর্তমান কমিটিতে প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই পাওয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ১৪ দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পাওয়ার পর ১৪ দল এখন অনেকটা সক্রিয়। গত শনিবার থেকে সারা দেশে তিন দিনের সাংগঠনিক সফরে বের হয়েছেন ১৪ দলের শীর্ষনেতারা।

শেয়ার করুন