কোটি কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারায় ঝামেলা আর ক্ষমতার বিতর্কেই মারা গেছে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন। নানা বিতর্ক আর মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতায় গুটিয়ে গেছে মঞ্চের আন্দোলন। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্রের বিরুদ্ধে মঞ্চের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু মঞ্চের অন্যান্য কর্মীরা এর হিসাব চাইলে মুখপাত্র ও তার সমর্থকরা এই হিসাব দিতে কালক্ষেপন করছে।
এছাড়া মুখপাত্রের বিরুদ্ধে আলাদা দল গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে গণজাগরণ মঞ্চ এবং ইমরান এইচ সরকার চরম বিতর্কে উঠে এসেছে। এছাড়া মঞ্চের কর্মীরা ত্রি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে মাত্র ১৪ মাসের মাথায় ইমরান এইচ সরকার ও গণজাগরণ মঞ্চ বিতর্কিত হয়েছেন পুরো জাতির কাছে। মঞ্চের বিতর্কিত এই তিনটি ধারা হলো- ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে একটি অংশ, আওয়ামী লীগ নেতা কামাল পাশা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি অংশ এবং ব্লগারদের সমন্বয়ে গঠিত অপর একটি অংশ। এই তিনটি অংশের পাশাপাশি আরো একটি অংশ রয়েছে যেটি মুক্তিযুদ্ধা সংসদ সন্তান কমা- নামে পরিচিত। তারা প্রকৃত গণজাগরণ মঞ্চের সমর্থক দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কামাল পাশা চৌধুরীর সাথেই আছেন। তিন পক্ষই পারস্পরিক কুৎসা রটনায় ব্যস্ত রয়েছে। ফলে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে গণজাগরণ মঞ্চের তিন পক্ষের কর্মীরা।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়। প্রথমদিকে অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং বাম ছাত্র নেতারা সম্পৃক্ততা থাকলেও পরবর্তীতে এই আন্দোলনের পালে হাওয়া দেয় সরকার সমর্থক কয়েকটি সংগঠন। এক পর্যায়ে সরকারের পরোক্ষ মদদে চলে অবস্থান কর্মসূচি। সরকার সমর্থক কিছু প্রতিষ্ঠান গণজাগরণ মঞ্চের খরচ বহন করতে শুরু করে। মিডিয়ায় এটা আলোচনার শীর্ষে চলে আসে। সে সময় আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে নির্বাচন করা হয় রংপর মেডিকেল কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও অনলাইন এক্টিভিস্ট ডা. ইমরান এইচ সরকারকে।
ধীরে ধীরে এই আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে ছাত্রলীগ এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও পরবর্তীতে সরকারি ইশারায় আন্দোলন থেকে সরে পড়ে। এরপর থেকেই আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে মঞ্চের মুখপাত্র হওয়ার পর ইমরান এইচ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা ও মঞ্চের আয় ব্যয়ের স্বচ্ছতার হিসাব না দেয়ায় ছাত্রলীগের সাথে তাদের বিরোধ আরো পাকাপোক্ত হয়। এর পরপরই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে সরকারপন্থী সমর্থকেরা ইমরান এইচের বিরোধিতা শুরু করে এবং তারা ইমরান এইচকে মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানায়।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দাবি করে ইমরান এইচ সরকার জনগণের আবেগ ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে। সে মঞ্চের মুখপাত্রের আড়ালে সরকার বিরোধী আলাদা দল গঠন করার চেষ্টা করছে। এছাড়া অভিজ্ঞ মহল ইমরানের অর্থসম্পদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিদেশে ইমনরানের ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল ধারণা করছে।
ইমরান বিরোধী সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চ, নির্বাচন নিয়ে ইমরানের মন্তব্য, ঘরোয়া আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইমরানের বক্তব্য, লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের জন্য ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার সমালোচনা এসব বিষয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ আমলে নেয়। এ সময় ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী ফেসবুকে ইমরান এইচ সরকার ও গণজাগরণ মঞ্চের বিভিন্ন কর্মকা-ের সমালোচনা করতে থাকেন।
একই সময়ে ছাত্রলীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত মঞ্চেরই একটি অংশের সঙ্গে ইমরান পক্ষের বিরোধ জোরালো হয়। ছাত্রলীগ আন্দোলন থেকে সরে আসার পর মঞ্চের একটি অংশ গৌরব ’৭১ নাম নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। এই অংশটি ছাত্রলীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
সাধারণত যে জায়গায় গণজাগরণ মঞ্চ অনুষ্ঠান করে, সেই জায়গায় গৌরব ’৭১-এর নামে মঞ্চ তৈরি করা হলে এদের সঙ্গেই গত ৩ এপ্রিল রাতে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের দুই দফা মারামারির ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে পরদিন উভয় দলই শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। কিন্তু সমাবেশের অনুমতি না থাকায় কোন পক্ষই সমাবেশ করতে পারেনি।
পরবর্তীতে ইমরানের পক্ষ জোড়াজুড়ি শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠি পেটা করে। এতে প্রায় ১০ জনের মত আটক ও ৪ জন আহত হয়। ইমরান এইচ সরকার এই ঘটনার জন্য পুলিশ প্রশাসন, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ কর্মীদের দোষারোপ করে। এর পরপরই সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ইমরানকে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে মঞ্চের অপর পক্ষ।
এর আগে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে ২৫ মার্চ রাতে ইমরানের সমর্থকরা চারুকলার সামনে মঞ্চ করতে উদ্যত হয়। ওই সময় চারুকলায় বৈশাখের সরঞ্জমাদি তৈরি করা হচ্ছিল। চারুকলার শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ নেতা ও এক সময়ে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক শেখ আসমান এই মঞ্চ তৈরির বিরোধিতা করে। ফলে তাদের সাথে শেখ আসমানের বাক-বিত-া হয়। এতে ইমরানের পক্ষের এক কর্মীকে মারধর করা হয়। সে সময় ইমরান এই হামলার জন্য ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের দায়ী করে বলেন, ছাত্রলীগ তাদের কাছে চাঁদা দাবি করেছিল, তারা চাঁদা না দেয়ায় মঞ্চের কর্মীদের ওপর হামলা করেছে।
এরপর গত ১১ এপ্রিল ইমরান শাহবাগে সাংবাদিক সম্মেলন করে কর্মসূচি ঘোষণার একদিন পর ১২ এপ্রিল মঞ্চের ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা পাল্টা সাংবাদিক সম্মেলন করে ইমরান এইচ সরকারকে মুখপাত্রের পদ থেকে অব্যহতির ঘোষণা দেয়। আর এর মধ্যেই ইমরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ পায়।
এছাড়া গত ১৯ এপ্রিল ইমরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ইমরানকে অব্যাহতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ অনলাইন ব্লগার অ্যান্ড অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান) এর একটি অংশ। সম্মেলনে বলা হয় ইমরান তার নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেছে। যার ফলে গণজাগরণ মঞ্চ ও ইমরান এইচ সরকার বিতর্কের শীর্ষে উঠে আসে।
ইমরানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের যে অভিযোগ ওঠেছে তার জবাবে তিনি মঞ্চে আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব দাখিল করতে পারেননি। তিনি এ প্রসঙ্গে গণমাধাম্যকে দেয়া বক্তব্যে বলেন, গণগাজারণ মঞ্চে যারা অনুদান দিয়েছেন তারা প্রকাশ্যেই দিয়েছেন। আর তা খরচও করা হয়েছে প্রকাশ্যে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ইমনরানের সংগৃহীত চাঁদার পরিমাণের একটি তালিকা ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর মধ্যে ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর উপস্থিতিতে ইমরান এইচ সরকারকে পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা এসপি মাহবুব চার লাখ টাকা দিয়েছেন বলে উল্লেখ আছে। বাপ্পাদিত্য বসুও এই লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে।
এ ছাড়া গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রবাসীদের চার লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৩ টাকা ইমরান এইচ সরকারের হাতে দেয়া হয়; যা পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আন্দোলনের প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর কীভাবে চলেন গণমাধমের এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. ইমরান বলেন, আমি বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থাকি। আর খরচ চালানোর সামর্থ আমার পরিবারের আছে।
এছাড়া ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, গত বছরের জুন-জুলাই থেকে মঞ্চকে একটি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দেয়ার চিন্তা শুরু করেন ইমরান এইচ সরকার। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এ চিন্তা জোরালো হয়। এ সময় ইমরান মঞ্চের ছয় দফার বাইরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। পেছন থেকে এ বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট তিনজন ব্যক্তি কাজ করছেন বলে জানা যায়।
তবে এ বিষয়টি অস্বীকার করে ইমরান এইচ সরকার গণমাধ্যমকে বার বার বলেছেন, দল গঠনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ভবিষ্যতের ব্যাপার বলা কঠিন। দল গঠনের বিষয়ে বিশিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি দাবি করে ইমরান আরও বলেন, দেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে তার আলোচনা হয়, তাদের মতামত নেন। তিনি বলেন, টাকার বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই টাকার হিসাব প্রকাশ করা হবে।








