প্রচণ্ড তাপদাহে পুড়ছে দেশ। এর সাথে বিদ্যুতের লাগামহীন লোডশেডিং জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রচণ্ড খরায় মানুষের পাশাপাশি পশুপাখির জীবনও ওষ্ঠাগত। বৃষ্টির অভাব ও খরায় জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় তীব্র পানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফসল পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাপদাহে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারছেন না। রাস্তাঘাট ও বাজার জনশূন্য হয়ে উঠেছে। স্বস্তির জন্য মানুষ গাছের ছায়া ও নদীর তীরে ছুটছেন। বৈশাখের প্রথমার্ধে পেরিয়ে যেতে চললেও বৃষ্টি দেখা মিলছে না। বৃষ্টির জন্য গতকাল বাদ জুমা দেশের বিভিন্ন স্থানে ইশতিসকার নামাজ আদায় ও বিশেষ দোয়া-মুনাজাত করা হয়েছে।
ধামরাই (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, তীব্র তাপদাহে ধামরাইয়ে জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এখানে ভূগভর্স্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে গেছে। নদী, খাল, বিল, পুকুর, ডোবা হাওর-বাঁওড়গুলো শুকিয়ে উত্তপ্ত বালুচরে পরিণত হয়েছে। পানি সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। তীব্র গরমও তাপদাহে জনজীবনসহ পশু পাখির অবস্থাও কাহিল হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে তাপমাত্রা ও বাতাসের আদ্রতা বেড়ে যাওয়ায় গরমে অস্বস্তিতে পড়েছে মানুষ। তীব্র গরমের হাত থেকে রেহাই পেতে ছুটে যাচ্ছে গাছের তলায়, পুকুর বা নদীর ধারে। ঠাণ্ডার জন্য অনেকে খাচ্ছে আইসক্রিম। সেই সাথে বিক্রি হচ্ছে কোমল পানীয়। এ দিকে গরম ও তাপদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবনে আরো দুর্বিষহ করে তুলছে। গরম ও তাপদাহে অসুখ-বিসুখ ছড়িয়ে পড়ছে। খরার কারণে উঠতি ধান ও শাকসবজি উৎপাদনে ব্যাহত হচ্ছে। ধামরাই কৃষি কর্মকর্তা এম এ সালাম বলেন, মওসুমি বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত সেচে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ভূগভর্স্থ পানির স্তর নেমে গেছে।
রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, বৈশাখের তাপদাহে পুড়ছে ফসলের ক্ষেত। বৃষ্টির অভাবে সেচ দিয়ে পাট বুনছেন কৃষকেরা। তীব্র তাপদাহে প্রাণীকূলে নাভিশ্বাস উঠেছে। এখানে হাজার হাজার কৃষক প্রচণ্ড রোদে মাঠে কাজ করতে পারছেন না। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বেলে মাটিতে পায়ে সেন্ডেল দিয়েও পথচলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাট চারা বেড়ে ওঠার পর বৃষ্টির অভাব ও খরার কারণে চারা পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
পদ্মা, যমুনা-গড়াই পারের লোকজন জানান, বৈশাখ মাসে চৈত্রের তাপদাহ বা খরা চললেও নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তারা নদীর বুক চিরে লাগানো বোরো ধান লাগালেও তা কাটতে শুরু করেছেন। ফলন ভালো হয়েছে বলে দাবি তাদের। এ দিকে জেলার সর্বত্র মরুময় লু-হাওয়া বিরাজ করছে। এতে অসহনীয় তাপদাহ, সাথে ভ্যাপসা গরমে মানুষ ও পশুপাখির জীবন ওষ্ঠাগত। এই গরমে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। গৃহপালিত পশুপাখি ছাড়াও বন্য প্রাণীদেরও প্রাণ চলমান তপ্ত আবহাওয়ায় ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। অসহনীয় তাপদাহ ও ভ্যাপসা গরমে কর্মস্থলে যেতে না পারায় নি¤œবিত্ত পরিবারগুলোর সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। ক্ষেত-খামারের পরিচর্যা করতে না পারায় বেকায়দায় পড়েছেন কৃষকেরাও। ব্যবসায়ীরাও কঠিন সমস্যায় পড়েছেন হাটবাজারগুলো প্রায় জনশূন্য থাকায়। এ দিকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া অসহনীয় তাপদাহ ও ভ্যাপসা গরমে উপজেলার সর্বত্র ডায়রিয়া, আমাশয় ও নিউমোনিয়াসহ শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ শত শত মানুষ স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি কিনিক, বেসরকারি হাসপাতাল-কিনিক এবং ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিয়েছেন।
কালাই (জয়পুরহাট) সংবাদদাতা জানান, জয়পুরহাটের কালাইয়ে বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। চলছে ১৬-১৮ ঘণ্টার লোডশেডিং। ফুঁসে উঠছে সর্বসাধারণ।
জানা গেছে, উপজেলা সদরসহ সর্বত্র মধ্যরাতে ৪-৫ ঘণ্টা ছাড়া বাকি সময় থাকছে বিদ্যুৎহীন। এতে চলমান এইচএসসি পরীার্থী ও বোরোচাষিরা পড়েছেন মারাত্মক বিপর্যয়ে। ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ অফিসগুলোতে দেখা দিয়েছে কাজকর্মের স্থবিরতা। তীব্র গরমে মানুষ দ্রুত মাঠঘাটের কাজ ফেলে বাড়ি ফিরেও বিদ্যুতের অভাবে গরমে ঘরবাড়ি ছেড়ে গাছতলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেই সাথে বাড়ছে শিশুদের গরমজনিত শ্বাসকষ্টসহ নানা রকম অসুখ। তবে বিদ্যুৎ না পেয়েও মিনিমাম বিলের সাথে কেরোসিন কিনে বাড়তি খরচ করে মানুষ রীতিমতো ুব্ধ হয়ে উঠছে। যেকোনো সময় বিদ্যুতের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসতে পারেন সর্বসাধারণ।
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, দামুড়হুদায় গত ২ দিনে প্রচণ্ড তাপদাহে স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শিশু, নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের স্থানীয় কিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। কর্মজীবী মানুষ পেটের তাগিদে বাইরে বের হলেও অল্প সময়ের জন্য একটু স্বস্তি পাওয়ার আশায় গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে। গবাদিপশু, পাখি স্থানীয় পুকুর ডোবাতে প্রচণ্ড গরমে নেমে যাচ্ছে। দর্শনা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক জানিয়েছেন, গত দুই দিনে ২৩ ছাত্রী গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চিৎলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে বেশির ভাগ রোগী আসছে ডায়রিয়া ও গরমে অসুস্থজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়া। মডার্ন কিনিকের এমবিবিএস ডাক্তার তারিকুল ইসলাম জানান, গত ২০ বছরে এ ধরনের তাপ দেখা যায়নি, ফলে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বেশির ভাগ রিকশা-ভ্যানচালক পেটের তাগিদে সামান্য পরিশ্রম করার পরপরই একটু স্বস্তির আশায় গাছ-গাছালির নিচে বসেন ও শুয়ে পড়েন। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার চুয়াডাঙ্গার ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড তাপদাহে পুড়ছে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা। তীব্র রোদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গরম। গরম বাতাস যেন শরীরে বিঁধছে আগুনের হল্কার মতো। বেশি প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে মানুষ বের হচ্ছেন না। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। প্রচণ্ড তাপদাহ, আগুনের হল্কার মতো বাতাস উপো করে খেটে খাওয়া মানুষ মাঠেঘাটে পুুড়ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব, বিদ্যুতের সীমাহীন লোডশেডিং ও মশার কামড়। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ এখন দুঃসহ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকুলেও এখন নাভিশ্বাস অবস্থা। বৃষ্টি না হওয়ায় খাল-বিল, পুকুর জলাশয় শুকিয়ে গেছে। পানির জন্য, বৃষ্টির জন্য মানুষ হাহাকার করছেন। তীব্র খড়ায় এখানকার হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল পুড়ে যাচ্ছে। পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ায় ভেড়ামারার হস্তচালিত প্রায় ২০ হাজার অগভীর নলকূপে ঠিকমতো পানি উঠছে না।
এ দিকে গত মঙ্গলবার স্থানীয়ভাবে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিংয়ের ফলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে শিার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীরা পড়ছেন মারাত্মক দুর্ভোগে। একবার বিদ্যুৎ গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ আসছে না। এ নিয়ে ুব্ধ এলাকাবাসী সমস্যা নিরসনে কর্তৃপরে কাছে বার বার ধরনা দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। ফলে বিদ্যুৎ কর্তৃপরে এ রকম আচরণে ফুঁসে উঠছেন এলাকাবাসী।
জানা য়ায়, সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মধ্যেই থাকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে অবাধে লোডশেডিং। বিকেল ৫ থেকে রাত ৯টার মধ্যে ২-৩ বার আসা যাওয়ার মধ্যে থাকে। কিছুণ পরে এলেও তাও কিছু সময়ের জন্য, তার ওপর দেখা যায় লোভোল্টেজ। ফলে কম্পিউটার ও ফটোকপিসহ প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হয় না। আবার যায় আবার আসে এভাবে চলে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত।
এতে স্কুল-কলেজের শিার্থীদের পড়ালেখাসহ সাধারণ মানুষের কাজকর্মে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। সারা দিন বিভিন্ন স্থান থেকে কাজকর্ম করে কান্ত শ্রান্ত হয়ে মানুষ রাতে একটু ঘুমাতে যাবে এমন সময় আবার লোডশেডিং।
পল্লী বিদ্যুতের এই অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্ট হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তারা গরমে ঘর্মাক্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মোটকথা মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম লাটে ওঠার উপক্রম হয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে সবার মধ্যে।
মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিনের প্রচণ্ড তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবনে প্রশান্তির জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে বৃষ্টি কামনা করে মাধবদী জাল পোলট্রি মসজিদ কমিটি আয়োজনে ইসতিসকার নামাজ আদায় করা হয়েছে।
গতকাল সকাল ১০টায় মাধবদী জাল পোলট্রি মাঠে অনুষ্ঠিত এ নামাজ পরিচালনা করেন জামে মসজিদের পেশ ইমাম হজরত মাওলানা ইমরান হোসেন কাসেমী। নামাজে অংশগ্রহণ করেন মাধবদী বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, পৌর কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক, পুলিশসহ মাধবদী এলাকার বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা। নামাজ শেষে বাংলাদেশের শান্তির জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়।








