সরকারের ঋণের জোগান দিতে গিয়ে বেকায়দায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

0
255
Print Friendly, PDF & Email

সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের প্রায় ৮০ ভাগই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় ও আমানত সংগ্রহ করতে ব্যাংকের যে পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে, সরকারকে ঋণ দিয়ে আয় হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। এক হিসাবে, সরকারকে প্রতি ১০০ টাকা ঋণ দিতে ব্যাংকের ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে ৭ টাকা। ব্যাংকারদের মতে, এভাবে লোকসান দিয়ে ব্যাংকিং খাত সামনে দীর্ঘ মেয়াদে সঙ্কটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। মারাত্মক তারল্য সঙ্কটের মুখেও পড়বে। এতে ব্যাংকের সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে বলে তারা মনে করছেন।
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি রয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় হচ্ছে গড়ে দেড় শতাংশ। আর আমানত সংগ্রহ করতে গড়ে ব্যয় হচ্ছে ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে ব্যাংকের মোট ব্যয় হচ্ছে ১৮ শতাংশ। কিন্তু সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলোর গড়ে আয় হচ্ছে ১১ টাকা। এতে ব্যাংকের ১০০ টাকার মধ্যে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে ৭ টাকা। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই সরকার তার বিল ও বন্ডের সুদ নির্ধারণ করে মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় নিয়ে। কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। এতে ব্যাংকের সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকার তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে দু’টি পদ্ধতিতে ঋণ নেয়। এর একটি হলো ট্রেজারি বিল যার সর্বোচ্চ মেয়াদ এক বছর। বর্তমানে প্রচলিত তিন ধরনের ট্রেজারি বিলের মধ্যে রয়েছে ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন। ২৮ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
অপর দিকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নেয়া হয় বন্ডের মাধ্যমে। যার মেয়াদ পাঁচ বছর, ১০ বছর, ১৫ বছর ও ২০ বছর হয়। সাধারণত আগে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমেই সরকার বেশি ঋণ গ্রহণ করত। কিন্তু ২০০৯ সালের প্রথম দিকে এ নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিলে স্বল্প সময়েই তা পরিশোধ করতে হয়। এতে মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দেয়। এ জটিলতা এড়াতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর পর থেকেই সরকার ট্রেজারি বিলের চেয়ে বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে থাকে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সরকারে ঋণের জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে। কারণ ঋণের বিপরীতে বন্ড নামক কাগুজে মুদ্রা ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট চাঙ্গা না হওয়ায় তা বিনিময় করা যাচ্ছে না। এর ফলে সরকারের ঋণের জোগানদাতা ব্যাংকগুলোতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩১ জানুয়ারি প্রান্তিকের হিসেবে মোট আমানতের বিপরীতে এক লাখ ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাধ্যতামূলক জমা রাখার কথা ছিল। এর মধ্যে সম্পদের মধ্যে রাখার কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড। এ হিসেবে ব্যাংকের কাছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার বন্ডই উদ্বৃত্ত রয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যাংকগুলোর মতে, সরকারি ট্রেজারি বন্ডে সুদ পাওয়া যায় সর্বোচ্চ পৌনে ১০ শতাংশ। বেশির ভাগ অংশেরই পাওয়া যাচ্ছে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু তারা আমানত সংগ্রহ করছে ১২ শতাংশ হারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুদব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে। এ উচ্চ সুদের আমানতের অর্থে সরকারকে ঋণ দেয়ায় তাদের পরিচালনব্যয় বেড়ে চলেছে। বছর শেষে কাক্সিত মুনাফা দূরের কথা, কোনো কোনো ব্যাংককে লোকসান গুনতেও হতে পারে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও তারা বিনিয়োগ করতে পারছে না। এতে কমে যেতে পারে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ।
সরকারের ঋণের জোগানদাতা একটি প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আগে বিনিয়োগ স্থবিরতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কম ছিল। তখন ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য তহবিল ছিল। টাকা অলস না রেখে পরিচালনব্যয় মেটাতে ব্যাংকগুলো স্বল্প সময়ের জন্য সরকারকে ধার দিতো। এ কারণে তখন পিডিগুলোর ওপর চাপ কম ছিল।
কিন্তু এখন বিনিয়োগ স্থবিরতার তেমন কোনো পরিবর্তন না হলেও অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বেড়ে গেছে। এ কারণে পিডির বাইরে অন্য ব্যাংকগুলো শুধু এসএলআর সংরক্ষণের জন্য যতটুকু ট্রেজারি বিল ও বন্ড প্রয়োজন ততটুকু বিনিয়োগ করে থাকে। এর বাইরে কোনো বিনিয়োগ করে না। এর ফলে পিডিগুলোর ওপর চাপ বেড়ে গেছে। প্রতিটি পিডি ব্যাংকের হাতে এসএলআর সংরক্ষণের জন্য যেটুকু থাকা প্রয়োজন তার অতিরিক্ত দেড় থেকে ৪-৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড তাদের হাতে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এসএলআর সংরক্ষণের পর বর্তমানে অতিরিক্ত প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার বন্ড আটকা পড়েছে।
অপর এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, শুধু সরকারের ঋণ জোগান দিতে গিয়ে তাদের সুদব্যয় বেড়ে চলেছে। ১২ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ করে ৭ থেকে ৮ শতাংশে সরকারকে ধার দিচ্ছেন। এখানে নিট ঘাটতি থাকছে ৫ থেকে ৬ শতাংশ। এতে তাদের পরিচালনব্যয় বাড়ছে। বছর শেষে তাদের মুনাফার পরিমাণ কমে যাবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন