সামনে বিশাল মঞ্চ। তার ওপর অশ্লীল ভঙ্গিতে নাচছে কয়েকজন তরুণী। তাদের সামনে কয়েক শ দর্শক। যাদের তিন ভাগের দুই ভাগই তরুণ। তাদের পেছনে বসে এই অশ্লীল নৃত্য উপভোগ করছেন পুলিশ সদস্যরা! কেউ কেউ আবার নৃত্যের ছন্দে নাচছেনও ! দেখে মনে হলো এটিই বুঝি তখনকার মতো তাদের প্রধান ডিউটি। আশ্চর্য হওয়ার মতোই ঘটনা। এটি কারো কারো কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে, তবে তাইই ঘটেছে।
এই চিত্র নগরীর লালদঘির মাঠের। বৈশাখি মেলা ও ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী আয়োজিত মেলায় লালদীঘি মাঠের তিনভাগের দুইভাগই দখল করে নিয়েছে এই অশ্লীল নৃত্যের আয়োজকরা। পুলিশকে মোটা অংকের চাঁদা দিয়ে এমন নৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানালেন আয়োজকরা।
এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানার ওসি এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘পুলিশ কখনো কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে না। তারপরও কোনো পুলিশ সদস্য যদি এ ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকে ও কারো বিরুদ্ধে চাঁদা নেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস’া নেয়া হবে।’ পুলিশ যদি এ ধরনের কাজে জড়ায়, তবে পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন।
মো. রুস্তম আলী নামক অশ্লীল নৃত্যের একজন আয়োজক সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘মেলা যতদিন চলবে ততোদিন পুলিশকে টাকা দেব এই শর্তে নৃত্যের আয়োজন করেছি। তবে চাঁদা কেবল এক-দুইজন পুলিশ সদস্যকে নয়, বেশ কয়েকজনকে দিতে হয়। টাকা দেব বলে পুলিশ সবসময় মঞ্চের ভেতরে ও বাইরের পরিবেশ ভাল রাখতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। গভীর রাত পর্যন্ত থাকার বিষয়ে তাদের সাথে চুক্তি হয়েছে।’
সরেজমিনে লালদিঘীর মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, পাশাপাশি প্রায় সাতটি অশ্লীল নৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে। এসব স’ানের বাইরে কোনোটিতে লেখা নাচের তালে তালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোনোটিতে লেখা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পীদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অন্যটিতে লেখা ‘বাজে বিন নাছে নাগিন’ ঢাকা, টাঙ্গাইল ও চট্টগ্রামের শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোমুকর সব অনুষ্ঠান …ইত্যাদি। ব্যানারে এসব লেখার নিচে ও ওপরে রয়েছে ১৫ থেকে ২০জন তরুণীর অশ্লীল ছবি। সাথে দেশি-বিদেশি নানা নায়িকার ছবিও আছে। তবে সব ছবিই প্রায় নগ্ন। আর এসবের প্রধান উদ্দেশ্য দর্শকদের ভেতরে প্রবেশে আকর্ষণ ও আগ্রহ জাগানো।
মেলা শুরুর প্রথম দিনে গতকাল সকালে দেখা গেছে, তীব্র রোদের মধ্যেও দর্শকদের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের বেশির ভাগই তরুণ। এদের কাউকে কাউকে দেখা গেছে মুখে কাপড় পরে লাইন দাঁড়িয়ে থাকতে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে লাইন আরও দীর্ঘ হতে থাকে। এক পর্যায়ে সন্ধ্যার দিকে পুরো মাঠ জুড়ে দর্শকদের উপচে পড়া লাইনের সৃষ্টি হয়। যা গভীর রাত পর্যন্ত ছিল।
সাতটি মঞ্চে অশ্লীল নৃত্যের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব মঞ্চের কোনোটির শো’র টিকেটের দাম ১০০ টাকা, কোনোটি ১২০ টাকা, কোনোটি আবার ১৩০ টাকা। একেকটি শো’র সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আধঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা। দর্শক টানার জন্য টিকিট কাউন্টারে কয়েকজন তরুণীকে প্রায় নগ্ন অবস’ায় বসানো হয়েছে। এরা নানা কৌশলে টিকিট বিক্রির চেষ্টা করছে। এসময় অনেককে দেখা গেছে একসাথে দুইটি শো’র টিকিট কিনতেও। প্রতিটি মঞ্চের বাইরে ও ভেতরে পুলিশ সদস্যদের উপসি’তি ছিল দেখার মতো। যাদেরকে বৈশাখি মেলার চারপাশের পরিবেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে সবচেয়ে বেশি সরব থাকার কথা, তাদেরকেই দেখা গেল অশ্লীল নৃত্য দেখতে দর্শকদের ভেতরে প্রবেশে সুযোগ করে দিতে। তাছাড়া এদের কাউকে কাউকে দেখা গেছে নিজের লোক বলে অনেককে বিনা টাকায় ভেতরে প্রবেশ করে দিতেও।
বৈশাখি মেলা ও ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব দেয়া হলেও তারা টাকার বিনিময়ে দর্শকদেরকে অশ্লীল নৃত্য দেখতে উৎসাহিত করছে। সেই সাথে তাদেরকে নিরাপদে ভেতরে প্রবেশেরও সুযোগ করে দিচ্ছে।







