দেশে আগামী সাত মাস পর্যন্ত খরা ও অনাবৃষ্টি চলবে। এই দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রাও বাড়বে। এলনিনোর প্রভাবে দেশ এই অনাবৃষ্টি ও খরার শিকার হবে।
আমেরিকার হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্যাসিফিক ইএনএসও এপ্লিকেশন কাইমেট চেঞ্জ সেন্টারের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রাশেদ চৌধুরী গতকাল বুধবার নয়া দিগন্তকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
এসব তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়ে ড. রাশেদ চৌধুরী জানান, এল নিনোর প্রভাবে এবার খরার কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। এর প্রভাবে দেশে গরম আরো পড়বে। পুরো নভেম্বর পর্যন্ত এই অবস্থা চলবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। নভেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টিহীনও থাকবে দেশ। কারণ এলনিনোও এবার দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকবে। এটি নভেম্বরে পরিপূর্ণতা পাবে, তখন এর গতি বদলাবে।
আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তা আবদুর রহমান জানান, দীর্ঘ মেয়াদের জন্য তথ্য তাদের কাছে নেই। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, আগামী কয়েক দিন পরই বৃষ্টিপাত হবে। এর পাশাপাশি মওসুমিবায়ু সক্রিয় হবে।
এ দিকে আবহাওয়া অধিদফতরের অপর এক কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, সারা দেশে গত মার্চে বৃষ্টিপাতের কথা ছিল ৫২ মিলিমিটার। কিন্তু এবার হয়েছে মাত্র ১৮ মিলিমিটার, অর্থাৎ মাত্র ৬৬ ভাগ কম বৃষ্টি হয়েছে গত মার্চে। অপর দিকে চলতি মাসে গত ২৩ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ছিল ১৩০ মিলিমিটার, কিন্তু হয়েছে মাত্র ২২ মিলিমিটার। অর্থাৎ এ পর্যন্ত সারা দেশে এপ্রিলে ৮৩ ভাগ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তবে তিনি জানান, সামনে কী হবে তারা এখনই তা বলতে পারছেন না।
অপর দিকে ড. রাশেদ চৌধুরী জানান, এবার এলনিনোর প্রভাব খুবই ভয়ঙ্কর। এমনটাই তিনি লক্ষ্য করছেন এলনিনোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। তিনি বলেন, এলনিনোর প্রভাবে প্রচণ্ড খরা ও অনাবৃষ্টি ঘিরে ধরবে দেশকে। তিনি বলেন এলনিনো এমন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল ১৯৭২, ১৯৮২ এবং ১৯৯৭ সালে। ওই বছরগুলো এলনিনোর কারণে প্রচণ্ড খরা ও অনাবৃষ্টির মুখে পড়েছিল দেশ।
তবে আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদরা জানান, আরো কয়েক দিন সারা দেশে তাপদাহ চলবে। দেশের কুষ্টিয়া ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় রাঙ্গামাটি, খুলনায় তীব্র তাপদাহ বিরাজ করছে। গত সোমবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাঙ্গামাটিতে ৪০ দশমিক ৭ ডিগ্রি, যা আগের দিনের চেয়ে দশমিক ১ ডিগ্রি বেশি। এই সময়ে রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি। এ দিকে আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গেছে, দণি বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলেও তা আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাশেদ চৌধুরী জানান, প্রকৃতপক্ষে এই এল-নিনো এবং লা-নিনো বাংলাদেশের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। উল্লেখ্য লা-নিনো যে বছর সক্রিয় হয়, সে বছর বেশি বন্যা হয় এবং এল-নিনো বছরে স্বাভাবিক বছরের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়। অর্থাৎ শক্তিশালী এল-নিনো মানে কম বন্যা।
রাশেদ চৌধুরী জানান, প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলগুলোর জন্য এল-নিনো ও লা-নিনো ভিত্তিক জলাবায়ু সংক্রান্ত পূর্বাভাস তৈরি করাই রাশেদ চৌধুরীর প্রধান গবেষণার বিষয়। তিনি উপমহাদেশে বন্যা বৃষ্টিপাতের ওপর বিভিন্ন উদ্বোধনী পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে দেশে-বিদেশে উপস্থাপন করে সমাদৃত হয়েছেন। তিনি জানান, এখন পুরো বিশ্ব এলনিনোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে রেখেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘুমাতে পাড়ছি না। সবাই জানতে চাচ্ছেন এলনিনো আরো কত ভয়ঙ্কর হবে এবার।’
লা-নিনো আর এল-নিনো সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন রাশেদ চৌধুরী। তিনি জানান পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ১৬০ পশ্চিম থেকে শুরু করে ১২০ থেকে আরো পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যদি কোনো কারণে স্বাভাবিক বছরের চেয়ে বেশি হয় তখন পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত মওসুমি বায়ুপ্রবাহ কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে। অথবা কখনো বিপরীত দিক থেকে প্রবাহিত হয়। এটা এল-নিনো। এর প্রবাহে বাংলাদেশ এবং ভারত এবং পশ্চিম মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। তিনি জানান এবারের এল-নিনো আরো কতটা ভয়ঙ্ক হবে তা মে মাসে পুরো আঁচ করা যাবে।
এল-নিনো বা লা-নিনোর প্রভাব পৃথিবীতে অজানা নয়। হাজার হাজার বছর আগেও ছিল। আমাদের দেশেও যে এর প্রভাবে আবহাওয়ার হেরফের হচ্ছে তা কিছু বিজ্ঞানী আঁচ করতে পেরেছেন। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন আমাদের এই অঞ্চলে অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি খরার বছরগুলোর নেপথ্যে ছিল এল-নিনো।
রাশেদ চৌধুরী আরো বলেন, ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া পূর্বাভাসে তিন মাস আগে থেকে এল-নিনো ও লা-নিনো সম্পর্কে ছয় মাসে ধারণা দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে যেমন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর কাইমেট অ্যান্ড সোসাইটি, কাইমেট প্রেডিকশান সেন্টার এবং একইরকম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইউরোপের কয়েকটি দেশেও সরবরাহ করে থাকে। যাদের সহায়তায় বাংলাদেশে বন্যা ও খরা সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাসের ধারণা পেতে পারে।







