আমার স্বামী আবদুর রশিদ কয়েক মাস আগে আমাদের একই মহল্লার বেবিচালক আবুল হাশেমকে গাড়ি চালানোর শিক্ষা দেওয়ার জন্য নগদ ২ হাজার টাকা দেয়। টাকা নেওয়ার পরও সে আমার স্বামীকে গাড়ি চালানোর শিক্ষা দেয়নি। পরে তার কাছে টাকা চাইলে সে রাগারাগি করতে থাকে। ১৯৮৯ সালের ৭ জুলাই মিরপুর, ৬বি, সড়ক-১ নম্বর বাসা থেকে স্বামী আবদুর রশিদকে অপহরণ করে নিয়ে যায় হাশেম। এরপর থেকে স্বামীকে আর পাইনি। আবুল হাশেম আমার স্বামীকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ করেছে। স্বামীকে উদ্ধার করে দিন এবং হাশেমকে গ্রেফতার করুন।’
১৯৮৯ সালের ১২ জুলাই মিরপুর থানায় স্বামী অপহরণ মামলার এজাহারে এ আকুতি জানিয়েছিলেন মাহমুদা বেগম। মামলা হওয়ার তিন দিন পর মিরপুর এলাকায় রশিদের লাশ খুঁজে পায় পুলিশ। কিন্তু মামলার একমাত্র আসামি হাশেম গ্রেফতার হননি। হাশেমকে অভিযুক্ত করে ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এরপর গত ২৫ বছরেও শুরু হয়নি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ। ঢাকার বিশেষ জজ-৩ আদালতে বিচারাধীন এ মামলার নথি ঘেঁটে জানা গেছে এসব তথ্য।
নিহত রশিদের একমাত্র ছেলে কামরুজ্জামান টুকু রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘যে হাশেম আমার বাবাকে অপহরণ করে হত্যা করল, তাকেই পুলিশ ধরতে পারল না। বিচার হল না। বাবা খুন হওয়ার পর প্রাণভয়ে মিরপুর এলাকা থেকে পটুয়াখালী গ্রামের বাড়িতে চলে যান তার মা। বিচারের আশায় দিন গুনতে গুনতে পার হয়ে গেছে ২৫ বছর। ইহকালে হয়তো আমরা বাবার অপহরণ ও হত্যার বিচার দেখে যেতে পারব না।’
আবদুর রহমানের মতো এমন অসংখ্য ঘটনায় দায়ের করা মামলা অনিষ্পন্ন থাকছে বছরের পর বছর। আবার যেগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই খালাস হচ্ছে আদালতের রায়ে। সরকারি আইনজীবী ও পুলিশের চরম অবহেলায় যুগ যুগ ধরে চলছে ২৩৭৯টি অপহরণ মামলার বিচারকাজ। ঢাকার ৪২টি নিু আদালতে এসব মামলা বিচারাধীন।
বিচারসংশ্লিষ্টদের দাবি, এভাবে চলতে থাকলে এসব মামলা নিষ্পত্তি হতে লাগতে পারে কয়েক যুগ। ততদিনে মামলার বাদী কিংবা সাক্ষীদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইতিমধ্যে অনেক সাক্ষী মারাও গেছেন। এর ফলে মামলার দায় থেকে পার পাবেন অপহরণকারীরাও। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন বিচারপ্রার্থী জনগণ। সংশ্লিষ্ট আদালতগুলোর পেশকাররা বলছেন, মামলার অধিকাংশ সাক্ষী আদালতে আসেন না। তাদের সবার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। বিচারাধীন মামলার নথি পর্যালোচনা ও যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে উল্লিখিত সব তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৫ বছরে নিষ্পত্তি হওয়া ২১২ অপহরণ মামলার মধ্যে ১৯০ মামলাতে খালাস পেয়েছে আসামিরা। সাজা হয়েছে মাত্র ২১ মামলায়। এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন ২১০৩ আসামি। ইতিমধ্যে ২ হাজার আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন। এদের মধ্যে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দেন ১৬৭৭ জন। জামিন পাওয়ার পর আদালতে আর হাজির হননি, এমন পলাতক আসামির সংখ্যা ৫২৬ জন। এ ছাড়া মামলা দায়েরের পর থেকেই ২৮৭৬ আসামি পলাতক আছেন।
আরও জানা যায়, গত ১২ বছরে সারা দেশে দায়ের করা ২৭০৮০টি অপহরণ মামলার মধ্যে ঢাকায় হয়েছে ১৯৬৯টি। এর মধ্যে ২০১৩ সালে সারা দেশের ৮৭৯টির মধ্যে ঢাকায় হয়েছে ১৫৩টি, ২০১২ সালে ৮৪০টির মধ্যে ঢাকায় ১৫৪টি, ২০১১ সালে ৭৯২টির মধ্যে ঢাকায় ১২৭টি এবং ২০১০ সালে সারা দেশে দায়ের করা ৮৭০টির মধ্যে ঢাকায় ১৫৫টি। এ ছাড়া ঢাকার আদালতগুলোতে বিচারাধীন ২৩৭৯টি অপহরণ মামলার মধ্যে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ৬১২টি মামলার বিচার কাজ। এর মধ্যে অপহরণ এবং হত্যা মামলার সংখ্যা ২২০টি।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৯-গ এর ২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘দায়রা জজ, অতিরিক্ত দায়রা জজ বা সহকারী দায়রা জজের বিচারের জন্য মোকদ্দমাপ্রাপ্ত হওয়ার ৩৬০ দিনের মধ্যেই বিচার সমাপ্ত করবেন।’ এ ছাড়া ২০০৯ সালের ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস ভলিউম-১ অনুযায়ী সাক্ষীদের আদালতে নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে হাজির করার দায়িত্ব পুলিশ এবং প্রসিকিউশনের।
জানতে চাইলে ঢাকার মহানগর পুলিশের গণসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান সোমবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের কারণে অপহরণ মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না এটা সঠিক নয়। পুলিশ সমন কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানার খবর পেলে আদালতে যায়।’ তিনি জানান, ‘বিচারাধীন পুরাতন অপহরণ মামলা বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।’
উল্লিখিত আবদুর রশিদ হত্যা মামলা পরিচালনাকারী ঢাকার বিশেষ জজ-৩ আদালতের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর রফিক উদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘সাক্ষীদের আদালতে হাজিরের দায়িত্ব পুলিশের। যেসব পুলিশ সদস্য আদালতে আসছেন না তাদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করব।’ বছরের পর বছর বিচারাধীন অপহরণ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আইন বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত ছয় বছরের বেশি সময় ধরে মামলা চললে আসামিপক্ষ লাভবান হয়। কারণ এ সময়ের পর সঠিকভাবে আদালতের কাছে মামলার প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে ব্যর্থ হন সাক্ষীরা। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরার তোপে সঠিক তথ্য না দেয়ার কারণে মামলার রায় অধিকাংশ সময়ই আসামির পক্ষে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘অপহরণকারীদের সাজা না হওয়া’ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক মো. ইফতেখারুজ্জামান রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘অপহরণ মামলার বিচার না হওয়া বড়ই উদ্বেগের বিষয়। অপহরণকারীদের শাস্তি না হওয়ার কারণেই অপহরণ, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজিসহ বড় বড় ফৌজদারি অপরাধের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যদি সঠিক বিচার না হয় তবে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।’







