ঢাবি শিক্ষক কবি সামাদ কৌশলী উপাচার্য

0
191
Print Friendly, PDF & Email

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। পরিবার নিয়ে বাস করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গিয়াসউদ্দিন আবাসিক এলাকায়। তবে বর্তমানে নিযুক্ত রয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড সায়েন্স (ইউআইটিএস)-এ। অনেক কৌশল করেই তিনি এই উপাচার্য। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, নানা ফন্দি-ফিকির করে একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানের গাঁটছড়া বেঁধেছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের নাম ড. মুহাম্মদ সামাদ। অনেকেই চেনেন কবি মুহাম্মদ সামাদ হিসেবে। সমাজকল্যাল ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক। বর্তমানে ছুটি নিয়ে ইউআইটিএস- এর উপাচার্য হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন তিনি কিছুই দিচ্ছেন না। তবে ব্যবহার করছেন এর সব সুবিধাই।

এখানে নীল দলের প্রভাবশালী শিক্ষক তিনি। ফলে সেই প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক আবাসিক ভবনগুলোতে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না থেকেও এখানকার ফ্ল্যাটটি ধরে রেখেছেন ড. সামাদ। তবে এর জন্য বাড়তি অর্থ পরিশোধ করছেন তিনি।

বড় অংকের বেতনে নতুন কর্মস্থল। বাড়তি অর্থ খরচে বাধা নেই। কিন্তু এতে সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক, আক্ষেপের সুরে বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক।

সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটেও অধ্যাপক সামাদের জন্যে কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। সেখানে সেই কক্ষটিও রয়ে গেছে তারই ব্যবহারের জন্য ফাঁকা। ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, তিনি নিজের কাজে সেখানে মাঝে মধ্যে আসেন। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ইনস্টিটিউটের শিক্ষকদের বসার জন্য কক্ষ সঙ্কট রয়েছে। অনেক শিক্ষকই দুই-জন মিলে একটি কক্ষ শেয়ার করছেন। সেখানে ড. সামাদের কক্ষ থেকে যাচ্ছে তারই জন্য বরাদ্দ।

আর এভাবে শুধু যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নিচ্ছেন তা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে নানা কৌশলে আদিবাসী কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও রয়েছেন তিনি। এছাড়াও জাতীয় কবিতা পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিষদের অন্যতম সংগঠক তিনি। জাতীয় কবিতা উৎসবগুলোতে তার প্রভাব প্রতিবছরই দেখা যায়।

এর বাইরেও এশিয়ান-প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল ওয়ার্ক এডুকেশন (এপিএএসডব্লিউই) এর বোর্ড মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন গত বছরের জুনে। শামসুর রহমান স্মৃতি পরিষদ এর সভাপতিও তিনি।

২০১২ সালের ৭ জুলাই ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ। চার বছরের জন্যে তার এই নিয়োগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র বাংলানিউজকে জানায়, ড. সামাদ ডেপুটেশনে রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার মো. মনিরুজ্জামানও বাংলানিউজকে বলেন, তিনি ডেপুটেশনে রয়েছেন। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করার জন্যে লিয়েনে ছুটি নেওয়ার সুযোগটি শিক্ষকরা বেছে নেন বলে বাংলানিউজকে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান বিধি অনুযায়ী ড. সামাদের পক্ষে ডেপুটেশনে গিয়ে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক বাংলানিউজকে বলেন, ডেপুটেশন নয় তিনি লিয়েনে ছুটি নিতে পারবেন।

এই শিক্ষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে একজন শিক্ষক তার পুরো বিশ্ববিদ্যালয় কর্মজীবনে মোট চার বছর লিয়েন নিতে পারবেন। কেউ যদি একবার লিয়েন নিয়ে নেন তাহলে তার পক্ষে আর ছুটি নেওয়া সম্ভব হবে না।

ডেপুটেশনে ড. সামাদ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ‌উপাচার্য হয়েছেন এমন প্রসঙ্গে এই শিক্ষকটি বাংলানিউজকে বলেন, এটি সম্ভব নয়। কারণ তিনি কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব নিয়ে যাননি। তিনি চার বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হলে তা লিয়েন নিয়েই করতে হবে।

এদিকে সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের একজন প্রভাবশালী শিক্ষক হলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের কাছে অচেনা, অজানা নামটি। নতুন যারা ভর্তি হচ্ছেন তাদের কাছে নাম অপরিচিত। বরাদ্দ কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মনে প্রশ্ন জাগছে, কে এই ড. সামাদ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বাংলানিউজকে বলেন, আমরা শুধু স্যারের নাম শুনেছি। কোনদিনি উনাকে দেখিনি।

প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলেছেন, তারা এই নামটি শুধু নেম প্লেটেই দেখছেন।

শুধু ইউআইটিএস’এর উপাচার্য হওয়ার কারণে যে অধ্যাপক সামাদ অনেকদিন ধরে ঢাবিতে অনুপস্থিত সেটি নয়, বছরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তিনি থাকেন বিদেশ সফরে।  এছাড়াও এর আগে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ডেভলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা) এর সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।

কবি, শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ইত্যাদি পরিচয়ে বিদেশ সফর করেন তিনি। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৬৫তম অধিবেশনে যোগ দিতে গেলে কবি পরিচয়ে তার সফরসঙ্গী হন ড. মুহাম্মদ সামাদ।

এছাড়াও সুইডেনের গোথেনবার্গে ‘গোথেনবার্গ বইমেলায় অংশ নেন তিনি। সুইডেনের পর নরওয়েতেও সফর করেন তিনি। তবে এসব কিছুই তিনি করছেন ছুটিতে থেকে!

সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএস-এ ড. সামাদ কিভাবে উপাচার্য হন সেটিও একটি বড় প্রশ্ন ও বিতর্ক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজের উপাচার্যগিরিকে বৈধতা দিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সমাজ কল্যাণকে সম্পর্কিত করে একটি বিভাগও খোলা হয়েছে।

ইউআইটিএস এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বাংলানিউজকে বলেন, মূলত প্রযুক্তি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হয় ইউআইটিএস’এ। সরকারের শক্ত লবিং রয়েছে এই বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মোটা অংকের অর্থ দিয়ে নিয়ে আসেন ড. সামাদকে। অথচ এখানে সে সময় সমাজকল্যাণ বিষয়টিও ছিলো না।

এ নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা চলতো। তা বন্ধ করতে ২০১৩ সালের অক্টোবরে সমাজকর্ম নামে বিষয়ের অনুমোদন নেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন থেকে, জানালেন ওই শিক্ষক।

শুধু তাই নয় ড. সামাদকে সামনে রেখে নানাবিধ অনিয়মও করে যাচ্ছে ইউআইটিএস। ইতিমধ্যে ভুয়া সনদপত্র বিক্রির অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে। এছাড়াও অবৈধ শাখার মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৩ সালে প্রতিষ্টিত হলেও এখন পর্যন্ত বারিধারায় জামালপুর টুইন টাওয়ারে কয়েকটি ফ্লোর নিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে অধ্যাপক সামাদের ফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

শেয়ার করুন