আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের সমঝোতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোড় গুঞ্জন চলছে। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সাথে জামায়াত প্রার্থীদের সমঝোতা, দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গোপন সমঝোতা হচ্ছে- এমন খবরে বেগম খালেদা জিয়ার উদ্বেগ প্রকাশকে কেন্দ্র করেই এই গুঞ্জন সর্বত্র। তবে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা একে শ্রেফ গুজব বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত নেতা বলেন, রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। জামায়াত যেহেতু একটি রাজনৈতিক দল; সেদিক থেকে যেকোন রাজনৈতিক দলের সাথেই সমঝোতা হতে পারে।
উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, বগুড়াসহ আরও বেশ কয়েক স্থানে আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে বিজয়ী হয়েছে। সিরাজগঞ্জে জামায়াতের এক নেতার নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগে যোগ দান করেছে। এরপর গতকাল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলিতে জামায়াত শিবিরের ৭০ জন নেতাকর্মী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে যোগদানের খবরে জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। সরকার ও জমায়াতের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলে নানান আলোচনা।
সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতার চেষ্টা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন গুঞ্জন অনেক দিন আগে থেকেই শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গত উপজেলা নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা সমঝোতা করে বিজয়ী হওয়ায় এ গুঞ্জন আরও জোরালো হয়ে উঠে। বর্তমানে জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল বিভাগের রায়কে ঘিরেই সরকারের সঙ্গে তাদের সমঝোতার বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। বর্তমানে মিডিয়ার সঙ্গে জামায়াত নেতারা যোগাযোগ না রাখা এবং রাজনৈতিক ময়দানেও তাদের নীরবতা এ গুজব-গুঞ্জনের ডালপালা বিস্তৃত করছে। জোটের প্রধান শরিক বিএনপিও এমন আলোচনায় অনেকটা অস্বস্তি বোধ করছে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ১৯ দলীয় জোট নেতা বেগম খালেদা জিয়া নিজেই জোটের বৈঠকে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গোপন সমঝোতা হচ্ছে- এমন খবরে বেগম খালেদা জিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের ফাঁদে পা না দিতে জামায়াত নেতাদের সতর্ক করেছেন। গত ১৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়া উপস্থিত জামায়াত নেতাকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ আপনাদের ছাড় দেবে না। তারা অনেক ষড়যন্ত্র করবে। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত নেতাদের বিষয়ে। তাই এমন কিছু করবেন না যাতে আপনারা বিছিন্ন হয়ে যান। বৈঠকে বিএনপি নেত্রী উপস্থিত জামায়াত নেতার কাছে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের দলের অবস্থান জানতে চান। এসময় মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল হালিম জানান, নির্বাচনের আগে নানা সমস্যার কারণে সব সময় যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। আমরা সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। আমরা জোটের সঙ্গে আছে। ভবিষ্যতেও এ জোট অটুট থাকবে।
তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়টিকে রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ হোসেন চৌধুরী এমপি বলেন, জামায়াতের সাথে আঁতাতের ন্যূনতম কোন সুযোগ নেই। বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে কোন প্রকার ছাড় দেবে না। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি সখ্যতা গড়ে তোলে তাহলে তার দায় তাকেই নিতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতারা মুখে এ কথা বললেও সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডে জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতের সূত্র খুঁজে পাচ্ছে অনেকেই। এর মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চকে ভেঙে দেয়ার পেছনে হেফাজত ও জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি জনমনে সন্দেহ সৃষ্টির কারণ হিসেবে অনেকে মনে করছেন। বিশেষ করে হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতার পরেই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ইমরান এইচ সরকারকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়টি নিয়ে সংবাদপত্রে অসংখ্য প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সূত্র জানাচ্ছে, মাওলানা সাঈদীর বিষয়টি নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ যাতে ‘বাড়াবাড়ি’ না করতে পারে সে কারণেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। আর এতে করে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পথটি সুগম হতে পারে এমনটাই সচেতন মহলের ধারণা।
গত উপজেলা নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের গোপন সমঝোতার কারণে বিএনপির তৃণমূলেও প্রচ- ক্ষোভ বিরাজ করছে। তৃণমূলের নেতাদের ধারণা জামায়াতের কারণে অনেক স্থানে তাদের পরাজিত হতে হয়েছে। জামায়াত অতীতেও এমন বিশ্বাস ঘাতকতা করে আওয়ামী লীগের সাথে হাত মিলিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। এবারও তারা সে পথে হাঁটছে। তাদের বিষয়ে এখনই সতর্ক থাকতে হবে বলে বিএনপির তৃণমূল নেতারা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা সম্ভাব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ময়দানে পর্দার অন্তরালে নানান খেলা চলছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অতিগোপনে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে বলেও অনেকের ধারণা। আর এতে সরকার বিদেশী মিত্রের সহায়তা নিচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে জামায়াতকে ‘ম্যানেজ’ করতে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। আর জামায়াতের পক্ষে কাজ করছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তিনি এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরছেন না বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে।







