রহস্যে ঘেরা বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক (এ বি সিদ্দিক) অপহরণের ঘটনা। অপহরণকারীরা কেনই বা এ বি সিদ্দিককে অপহরণ করেছিল, আবার দুই দিন পর কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের আগেই তাকে অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দিল- এ নিয়ে সর্বত্র তোলপাড়। অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়ার পর ধানমন্ডি থানায় সাংবাদিকদের কাছে এ বি সিদ্দিকের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ধানমন্ডি থানায় এ বি সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, অপহরণকারীরা তাকে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর আনসার ক্যাম্পের সামনে ৩০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফেলে রেখে যায়। পরে তিনি রিকশাযোগে কাজীপাড়া যান। সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের বাসায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ধানমন্ডি মাঠের বিপরীতে গ্রিন রোড স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে চেকপোস্টের পুলিশ তাকে বহন করা সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসার পর ধানমন্ডি থানায় নিয়ে আসে। তবে আনসার ক্যাম্প থেকে উল্টোপথে রিকশাযোগে কাজীপাড়া যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এ বি সিদ্দিক। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ওই সময়টায় আমার মাথা কাজ করছিল না’। অপহরণকারীরা তাকে কোথায় রেখেছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গাড়িতে ওঠানোর পর পরই তার চোখ ও হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর একটি বাড়ির কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যে গাড়ি পরিবর্তন করে অন্য একটি গাড়িতে তাকে উঠিয়েছিল। বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার রাত ১১টা পর্যন্ত তিনি ওই কক্ষেই অবস্থান করছিলেন। কেউ তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেনি। দুজন লোক সর্বক্ষণ তার পাহারায় ছিল। এ বি সিদ্দিক আরও বলেন, অপহরণকারীরা কয়েক দফা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল এবং পাশে বসে থেকে তার মুক্তিপণের টাকার পরিমাণ নিয়ে কথা বলছিল।
গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে হাঁটানো হয়েছিল কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গাড়িটি একটি ভবনের ওপরের দিকে উঠছিল। পরে অপহরণকারীরা আমাকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল।’
এদিকে, এ বি সিদ্দিককে বহন করে নিয়ে আসা সিএনজির চালক হাফিজুর রহমান মণ্ডল এ প্রতিবেদককে বলেন, “রাত সোয়া ১টার দিকে আমি কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার মধ্যবর্তী নতুন ফুটওভার ব্রিজের সামনে যাত্রীর অপেক্ষা করছিলাম। ওই সময় ছেঁড়া জামা, হাতে গামছা এবং পা জুতাবিহীন অবস্থায় ওই ব্যক্তি আমার কাছে এসে বলে- ‘ভাই, ছিনতাইকারীরা আমার সব নিয়ে গেছে। দয়া করে আমাকে আপনি একটু ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে নিয়ে যান’।”
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমি তাকে নিয়ে আগারগাঁও ও মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে ধানমন্ডি মাঠের সামনে আসামাত্র চেকপোস্টের পুলিশ সিএনজি থামায়। পরে আমাদের থানায় নিয়ে আসে।’
ওই রাতে ধানমন্ডি মাঠের বিপরীতে চেকপোস্টে ডিউটি পালন করা কলাবাগান থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক বাবলুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাত দেড়টার দিকে আমার নেতৃত্বে ছয়জন পুলিশ সদস্য ওই চেকপোস্টে ডিউটি করছিলাম। সিএনজিতে আসা ওই ব্যক্তির শার্ট বাইরে বেরিয়ে বাতাসে দোলার কারণে সিএনজিটি থামানোর সিগন্যাল দিই। পরে সিএনজিতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞেস করি। তার নাম এ বি সিদ্দিক জানতেই আমি বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার নুরুল স্যারকে জানাই। পরে স্যারের দেওয়া মোবাইল ফোন নাম্বারে আমার মোবাইল দিয়ে ওই ব্যক্তিকে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিই। পরে স্যারের নির্দেশে ওই সিএনজি ধানমন্ডি থানায় নিয়ে আসি।’
এদিকে, পুলিশ সদর থেকে গঠিত বিশেষ অনুসন্ধান দলের প্রধান, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান বলেন, ‘দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই আমরা কর্মপন্থা ঠিক করি। রিজওয়ানার বাসায় যাই। এখনো তদন্ত কার্যক্রম চলছে। কারা, কীভাবে এবং কেন এ বি সিদ্দিককে অপহরণ করেছিল সবকিছুই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ধারণা সার্বিক চাপের মুখেই অপহরণকারীরা এ বি সিদ্দিককে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মিডিয়াকে অনেক কিছুই বলা সম্ভব হচ্ছে না।’
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম জানান, ‘পরিকল্পনামাফিকই এ বি সিদ্দিককে অপহরণ করা হয়েছিল। অপহরণকারীরা অনেক অভিজ্ঞ এবং দক্ষ। সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, বিশেষ করে গণমাধ্যমের জোরালো সংবাদ পরিবেশনের কারণে অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে অপহরণকারীরা ছেড়ে দিলেও আমরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলাম। তদন্ত তার নিজ গতিতেই চলবে।’
অন্যদিকে, গতকাল বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি সেন্ট্রাল রোডের বাসা থেকে পুলিশের পিকআপ ভ্যানে এ বি সিদ্দিক ও তার স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেন ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। বেলা পৌনে ১২টার দিকে এ বি সিদ্দিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এস কে ফরহাদ। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. যাবিদ হোসেনের খাস কামরায় নিয়ে যাওয়া হয় এ বি সিদ্দিককে। বেলা পৌনে ১টার দিকে এ বি সিদ্দিক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে বেলা পৌনে ৩টার দিকে বেরিয়ে আসেন।
ওই সময় এ বি সিদ্দিক উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘বুধবার দুপুরে নিজ কর্মস্থল হামিদ ফ্যাশন থেকে বের হয়ে গাড়িতে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। ফতুল্লা ভুঁইগড় এলাকায় গাড়িটি পৌঁছালে একটি নীল রঙের হাই-এইস আমার গাড়িটিতে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। গাড়ির ক্ষতি হয়েছে কি না তা নেমে দেখার সময় কয়েকজন ওই গাড়ি থেকে নেমে আমাকে জোর করে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়। পরে হাত-পা-চোখ বেঁধে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর একটি বাড়ির মেঝেতে আমাকে নিয়ে রাখা হয়। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে সোয়া ১০টার দিকে ওই বাড়ি থেকে একটি গাড়িতে আমাকে বের করা হয়। গাড়িটি এক থেকে দেড় ঘণ্টা চলার পর মিরপুর আনসার ক্যাম্পের সামনে আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘চোখ বাঁধা থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি’।
আদালতে জবানবন্দি শেষে এ বি সিদ্দিককে পুলিশ হেফাজতে তার কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জের দাপা ইদ্রাকপুর এলাকার হামিদ ফ্যাশনে ও বেলা সোয়া ৩টার দিকে অপহরণের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ধানমন্ডি সেন্ট্রাল রোডের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
সিদ্দিকের মায়ের বক্তব্য : ‘ছেলেকে ফিরে পেয়েছি, এটাই আমার শান্তি। আল্লাহর কাছে আমি ছেলেকে ভিক্ষা চেয়েছিলাম। আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন।’ নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে বসে এসব কথা বলেন আবু বকর সিদ্দিকের মা মঞ্জুরা জলিল। তিনি বলেন, ‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ছেলের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম উৎকণ্ঠায় কাটাতে হয়েছে আমাকে। ছেলে মুক্ত হওয়ার খবর শুনেই ছুটে গিয়েছিলাম ধানমন্ডি থানায়।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে কেন অপহরণ করা হয়েছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। ছয় ছেলে-মেয়ের মধ্যে সংসারের ব্যাপারে মেজ ছেলে আবু বকরের ওপর বেশি ভরসা করি আমি। আমার ছেলের কোনো শত্রু থাকতে পারে না।’
প্রসঙ্গত. বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভুঁইগড় থেকে অপহৃত হন এ বি সিদ্দিক। এরপর তার স্ত্রী রিজওয়ানা হাসান ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘পেশাগত কারণে আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করে আসছি, যা অনেকের অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করেছে। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এসব মহল বিভিন্ন সময় আমার বিরুদ্ধে প্রচারমাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালিয়েছে এবং বিভিন্নভাবে আমাকে আমার কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে। আমার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে।’








