বিচার শেষ হলো না ১৩ বছরেও

0
190
Print Friendly, PDF & Email

রাজধানীতে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নারকীয় বোমা হামলার পর কেটে গেছে ১৩ বছর। এরপর চারবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি সেই বোমা হামলার বিচার। একই ঘটনায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলার বিচার থেমে আছে পাঁচ বছর ধরে। কবে শেষ হবে নারকীয় এই বোমা হামলার বিচার, সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কেউ দিতে পারছেন না। স্বজনহারাদের প্রশ্ন, বছর ঘুরে বৈশাখ আসে, রমনার বটমূলে আগের মতো সবই হয়, সরকার আসে, সরকারও যায়- কিন্তু বিচার কেন হয় না সেই বোমা হামলার। আর কতদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে ২০০১ সালে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচারের জন্যে?

আজ রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ১৩ বছর পূর্ণ হলো। ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার কাজ চলছে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের আগে মামলা নিষ্পত্তির তোড়জোড় থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের ভুলে এবার মামলা নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। আদালত সূত্র জানায়, গত বছরের ১৪ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু হেনা মো. ইউসুফ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মোহাম্মদপুরের যে বাড়িতে হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল সে ঘটনাস্থলের মানচিত্র আদালতে উপস্থাপন করেননি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভুলে তা উপস্থাপন ছাড়াই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই জটিলতায় মামলাটি ফের ঝুলে যায়।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলাটির ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২২ এপ্রিল এই মামলার শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। মামলার সাক্ষী সিআইডি ইন্সপেক্টর আবু হেনা মো. ইউসুফকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, এ মামলায় মুফতি হান্নানসহ আসামিরা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সদস্য ও নেতা। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় মামলা রয়েছে। ওই সব মামলায় তাদের হাজিরার জন্য আসামিদের পাঠিয়ে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। রমনা বটমূলের মামলাকে গুরুত্ব না দিয়ে আসামিদের অন্য আদালতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনের বিধানমতে, কারাগারে থাকা আসামির অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য নেওয়া যায় না। বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বের এটি একটি অন্যতম কারণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে এ ঘটনার বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাটির অবস্থা খুবই নাজুক। ২০০৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এ ঘটনায় করা দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলাটি ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল এবং বিস্ফোরক আইনের মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

এ সম্পর্কে ১ নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি আবু আবদুল্লাহ ভূঁইয়া জানান, রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে প্রায় চার বছর আগে পাঠানো হলেও সেখান থেকে এ পর্যন্ত মতামত পাঠানো হয়নি। তাই মামলাটির বিচার শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, হত্যা মামলাটি নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হওয়ায় দ্রুতবিচার আদালত ২০১০ সালের ২৪ মে আগের বিচারিক আদালত ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে অবশিষ্ট বিচারকাজ শেষ করার জন্য পাঠান। এ মামলায় আরও কয়েকজন প্রয়োজনীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলেই বিচারকাজ শেষের দিকে যাবে।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) রমনার বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এতে ১০ জন নিহত এবং ১১ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করে। প্রায় সাড়ে সাত বছর পর ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর সিআইডি মামলা দুটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়। তাতে ১৪ জনকে আসামি করা হয়। তারা সবাই নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নেতা-কর্মী। আসামিদের মধ্যে মুফতি আবদুল হান্নান, মুফতি আবদুর রউফ, মাওলানা শেখ ফরিদ, হাফেজ ইয়াহিয়া, হাফেজ আবু তাহের, মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাবি্বর, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ও শাহাদাত হোসেন ওরফে জুয়েল কারাগারে আছেন। আর মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, জাহাঙ্গীর বদর ও হাফেজ আবু বকর পলাতক। আরেক আসামি মাওলানা আকবর হোসাইন জামিনে মুক্ত আছেন।

এদিকে বিচার না পেয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এখন মামলার ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কিত। তাদের সন্দেহ, আদৌ এ মামলার বিচার শেষ হবে কি না। পহেলা বৈশাখের বোমা হামলায় অন্যান্যের সঙ্গে পটুয়াখালীর বাউফলের বাসিন্দা চাচাতো তিন ভাইবোন মামুন, রিয়াজুল ও শিল্পী নিহত হন। কাশেম গাজীর কলেজপড়ুয়া ছেলে মামুন বোমা হামলায় নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার পর পরিবারের কান্না এখনো থামেনি। একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হওয়ায় বৈশাখ এলেই তাদের কাছিপাড়া গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে পরিবারের সদস্যরা আশায় বুক বেঁধে আছেন তাদের সন্তানদের যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার হবেই। কিন্তু এখনো বিচার না হওয়ায় কাশেম গাজীসহ পরিবারের সবাই বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। কাশেম গাজীর প্রশ্ন, আর কত দিন অপেক্ষা করলে তাদের সন্তানদের হত্যার বিচার শেষ হবে!

শেয়ার করুন