‘ইলিশ আমাগো জন্য স্বপ্ন’

0
263
Print Friendly, PDF & Email

‘বাজারে ইলিশের যে দাম, তাতে এইডা আমাগো জন্য স্বপ্ন। ম্যাডাম ভালোবাইস্যা আমাগোরে আজ খাওয়াইলেন বইলা খাইলাম তৃপ্তি লইয়া।’
এভাবে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন নিরাপত্তারক্ষী তৈয়ব মিয়া।
আজ সোমবার বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনের মাঠে চলছে বৈশাখী আয়োজন। স্থানীয় ফ্ল্যাট মালিক সমিতি এর আয়োজক।
ভেতরে একটি ভবনের নিচে দেখা গেল তৃপ্তির সঙ্গে নানা পদের ভর্তাসহ পান্তা-ইলিশ খাচ্ছেন তৈয়ব মিয়া ও কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী।
শহীদুল্লাহ নামের আরেকজন বলেন, ‘ঢাকা আইছি দুই বছর অইলো। এইহানে আইসা দ্যাখতাছি বৈশাখের পরথম দিনে মাইনসে মজা কইরা পান্তা খায়। গেরামে তো আমাগো কাছে পান্তা প্রতিদিনকার খাবার।’
হবিগঞ্জের মমিন আলী পেশায় রিকশাচালক। আসাদ গেটে অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীর অপেক্ষায়। তিনি বলেন, ‘আমরা অইলাম গরিব মানুষ। আমরা আসতা বছরউ পান্তা ভাত খাই। পয়লা বৈশাখের দিন আর কিতা পান্তা ভাত খাইতাম।’
আরেক রিকশাচালক খবির মিয়ার কথা, ‘হেই ভোরবেলায় পান্তাভাত খাইয়া রিকশা লইয়া বাইর অই। তারপর টাকা রুজি হইলে চাল-তরকারি কিইন্যা লইয়া নিয়ে বাসায় যাই। তবেই রান্না হয়, নইলে উপোস থাকতে অয়।’
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সবার সঙ্গে নববর্ষ উদযাপনে শামিল হয়েছিল অনেক ছিন্নমূল শিশুও। ১০-১২ বছর বয়সী সুমন, জামাল, খাদিজা, মনসুর, শারমীন নতুন পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আর নিজেদের মতোই আনন্দ করছিল ছিন্নমূল এই শিশুরা। তারা জানাল, অনেক দিন পর আজ মজা করে খেয়েছে। সকালে ইলিশ ও নানা রকমের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত খেয়ে নববর্ষের দিনটি শুরু করেছে।
সুমন বলল, ‘এক স্যার আইছিলেন ফ্যামিলি নিয়া। আমাগো সবাইরে ডাইকা খাওয়াইলেন দোকানের মইধ্যে।’
শারমীন বলল, ‘খুবই মজা পাইছি। হারা বছরই তো ঠিকমতো খাইতে পারি না। কিন্তুক আইজক্যা পেট পুইরা খাইছি।’
মনসুরের ভাষ্য, ‘পান্তা ভাত তো আমাগো লাইগ্যা ইসপিশিয়াল কিছু না। পান্তা ভাত-পচা-বাসি ভাত আমাগো সব সময়ের সঙ্গী। আমাগো লাইগ্যা ইসপিশিয়াল অইলো ইলিশ। কারণ এইডা তো চোখখেও দ্যাহি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তারা সবাই থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। নববর্ষে পান্তা-ইলিশের স্বাদ নেওয়ার বিষয়টি তাদের কাছেও নতুন। লিমা, ইশিতা, সুমন, তানিয়া এবারই ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। জানালেন, বৈশাখে এক ধরনের উত্সব আমেজ থাকলেও গ্রামে পান্তা ইলিশের প্রচলন তেমনটা দেখেননি তাঁরা।
সুমন মনে করেন, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেসব মানুষের কাছে নববর্ষ নিয়ে আলাদা কোনো আমেজ নেই। সারা বছর যাদের পান্তাভাত খেয়েই কাটে, তাদের জন্য বছরের এই এক দিন উত্সব সহকারে পান্তা খাওয়াটা আসলেই বেমানান। ‘একদিনের বাঙালিয়ানা’ দেখাতে গিয়ে আনন্দচিত্তে তাদের জন্য পান্তা খাওয়াটা গরিবের ভ্রান্তি বিলাসেরই নামান্তর।
তাঁর সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন মত ইশিতার। তিনি মনে করেন, বৈশাখী উত্সবে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই উত্সবের আমেজে শামিল হয়েছেন। এখানে পান্তা-ইলিশ খাওয়া না খাওয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সর্বজনীন এ উত্সব বাঙালির প্রাণের উত্সবে রূপ নিয়েছে।
তানিয়া বৈশাখের সর্বজনীন বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চান। তিনি মনে করেন, বৈশাখের এ উত্সবে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতে পারলেই এ উত্সব সার্থক হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আনন্দ করছি ঠিক আছে। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই যদি আমাদের পাশের দরিদ্র-ছিন্নমূল একটি মানুষের সঙ্গে এ আনন্দকে ভাগ করে নিই, তাহলে সবাই এ আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।’

শেয়ার করুন