রূপের ফাঁদ

0
57
Print Friendly, PDF & Email

রূপ-যৌবন তাদের পুঁজি। আর তা দিয়েই ফাঁদে ফেলা তাদের পেশা। প্রথমে বিত্তশালী কারো সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। পরে তাকে নিজের বাসায় নিয়ে যাওয়া। চলে দৈহিক মেলামেশা। সুযোগ বুঝে একদিন কৌশলে বাসায় আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি। কখনো বা গোপন ক্যামেরায় ভিডিও করে তা দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা। মুক্তিপণ বা ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় হলেই ছেড়ে দেয়া হয় ভুক্তভোগীদের। লোক-লজ্জার ভয়ে কেউ এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপও নিতে চান না। এই সুযোগই কাজে লাগাতো তারা। গতকাল পুলিশ-র‌্যাবের পৃথক অভিযানে এমন দুটি চক্রকে আটক করা হয়েছে। আটকের পর তারা নিজেরাই এসব অপকর্মের কথা স্বীকার করেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শুক্রবার উজ্জ্বল নাগ (৪৩) নামে এক গার্মেন্ট কর্মকর্তাকে এভাবেই দেহের ফাঁদে ফেলে আটকে রাখে একটি চক্র। এরপর তার কাছে প্রথমে ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য নেই জানালে শেষে ১০ লাখ টাকায় রফা হয়। এর মধ্যে এক বন্ধুর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়েও যায় চক্রটি। পরে পরিবার ও গার্মেন্ট কারখানার পক্ষ থেকে পৃথক দুটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। একই সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হলে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তিন দিনের মাথায় উজ্জ্বল নাগকে বাসাবোর কদমতলার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করেন। এসময় আটক করা হয় রোজী আক্তার তানহা (২৩) ও তার চার সহযোগীকে। অন্যরা হলো- নিলয় আহমেদ রাজু (২৫), ইসমাইল (১৮), মিলন (১৮) ও ইব্রাহীম (১৯)। আটককৃত রাজু ও তানহা বাসাবোর ওই বাসায় লিভটুগেদার করতো বলেও স্বীকার করেছে।

অপহৃত উজ্জ্বল নাগ বলেন, তিনি গাজীপুরের কোনাবাড়িতে গ্রীনল্যান্ড নামে একটি গার্মেন্ট কারখানায় ডিজিএম হিসেবে চাকরি করেন। কয়েক মাস আগে তানহা নামে এক তরুণীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর থেকে তানহার সঙ্গে তার নিয়মিত ফোনে কথা হতো। তানহা তাকে নানা বলে ডাকতো। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় তানহা তাকে ফোন করে তার শিশু বাচ্চা ভীষণ অসুস্থ বলে জানায়। তাকে একবার তার বাসায় গিয়ে শিশুটিকে ডাক্তার দেখাতে সহযোগিতা করতে বলে। সন্ধ্যার দিকে উজ্জ্বল নাগ ফলমূল নিয়ে বাসাবোর ৬ নম্বর কদমতলার ষষ্ঠ তলায় তানহার বাসায় যান। বাসার ভেতরে ঢুকেই বুঝতে পারেন তিনি ভুল করে ফেলেছেন। তানহার মন ভোলানো আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে ফাঁদে পড়েছেন। উজ্জ্বল নাগ বলেন, ওই বাসায় ঢোকার পরপরই কয়েকজন যুবক তার হাত বেঁধে ফেলে। মুখে স্কচটেপ আটকিয়ে প্রথমে তাকে পেটানো হয়। পরে তার কাছে ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। তিনি এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য নেই জানালে দেন-দরবার করে শেষে ১০ লাখ টাকায় রাজি হয়। তানহা ও তার সহযোগীরা তার পকেট থেকে এটিএম কার্ড ও পিন নম্বর নিয়ে যায়। কিন্তু ওই একাউন্টে কোন টাকা ছিল না। রাতেই তারা স্ত্রী মল্লিকা বিশ্বাসকে ফোন করে মিথ্যা বলতে বলে। তাদের শেখানো মতে তিনি স্ত্রীকে ফোন দিয়ে এক বন্ধুর বাসায় পার্টিতে আছেন বলে জানান। একেবারে সকালে ফিরবেন বলে স্ত্রীকে কোন চিন্তা করতেও নিষেধ করেন। উজ্জ্বল নাগ বলেন, আমার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে এসব আমাকে বলতে বাধ্য করা হয়েছে। রাত দুইটার দিকে আমাকে গার্মেন্ট মালিক জুলফিকার সাহেবকে ফোন করতে বলে। ওরা শিখিয়ে দেয় ‘মা অসুস্থ, হার্ট ও কিডনি নষ্ট হয়েছে। এ্যাপোলোতে ভর্তি। জরুরি ১০ লাখ টাকা লাগবে, মাদ্রাজ নিয়ে যাবো’ বলার জন্য। তাদের কথামতো কাজ করি। এমডি স্যার সকালে টাকার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে জানান। সারা রাত আমাকে বসিয়ে রাখা হয়। পরদিন এমডি বাদ দিয়ে অন্য কোন বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে দিতে বলে। পরে অপু ও ইমনের সঙ্গে কথা বলি। ওদের সঙ্গেও একই কথা বলি। ওরাও টাকা দেয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু এদিকে ওরা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে। পরে জাহাঙ্গীর নামে আরেকজনকে ফোন দেই। সে প্রাথমিকভাবে ৪০ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়। শনিবার সন্ধ্যায় ওদের শেখানো কথামতো খিলক্ষেতে আমার এক মাসতুতো বোন যাবে। ওর নাম শৈলী। পরে তানহা নিজে শৈলী সেজে রাজুকে সঙ্গে নিয়ে জাহাঙ্গীরের অফিস পিয়ন বিশ্বজিতের কাছ থেকে ওই টাকা নিয়ে আসে। পরদিন তাকে এমন কাউকে ফোন করতে বলা হয় যাকে অফিস কিংবা পরিবারের কাউকে চেনে না। পরে তিনি কৌশলে তার নিজ অফিসের ম্যানেজার কো-অর্ডিনেশন বাদল রায়কে ফোন দেন। বাদল রায় পাঁচ লাখ টাকা দিতে চায়। গতকাল সন্ধ্যায় বাদল রায়ের কাছে টাকা আনতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তানহা। পরে পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার করে। একই সঙ্গে বাসায় থাকা অন্যদের আটক করে।

এদিকে তানহা জানায়, তার আগে একটি বিয়ে হয়েছিল। ওই স্বামী তাকে বাচ্চাসহ ফেলে গেছে। এরপর থেকে সে দেহব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। উত্তরার তিন নম্বর সেক্টরের ১০ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাটে সে নিয়মিত যেত। সেখানেই বিভিন্ন ক্লায়েন্টের সঙ্গে সে অর্থের বিনিময়ে দৈহিক মেলামেশা করতো। ওই ফ্ল্যাটেই উজ্জ্বল নাগের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর উজ্জ্বল নাগ তাকে আলাদা ফ্ল্যাটে রাখার জন্য চুক্তি করেন। ছয় মাসে ছয় লাখ টাকা দেয়ার কথা ছিল তার। এগার হাজার টাকায় ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়া হয়। তানহা বলে, ফ্ল্যাটে আমার সঙ্গে বয়ফ্রেন্ড রাজু থাকত। আমরা লিভটুগেদার করতাম। আর মাসে ৪-৫ বার উজ্জ্বল নাগ বাসায় আসতো। এছাড়া, মাঝে মধ্যেই সে আমাকে বিভিন্ন বায়ারের কাছে নিয়ে গেছে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমার টাকা দেয়নি। তাই আমি কৌশলে তাকে ডেকে এনে আটকে রেখে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছিলাম। তানহার বয়ফ্রেন্ড রাজু জানায়, এয়ারপোর্টের একটি অফিসে কাজ করার সময় তানহার সঙ্গে তার পরিচয়। এরপর তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। আমরা একসঙ্গে থাকতাম। আমি জানি ও কী করে। ও ভালো হতে চেয়েছিল। এ জন্য আমি ওকে সঙ্গ দিতাম। উজ্জ্বল নাগকে ওর পরিকল্পনায় আটক করি। ৪০ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। কিন্তু বাকি টাকা নেয়ার আগেই পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে।

এদিকে র‌্যাব-১ এর একটি দল গতকাল বারিধারার ডিওএইচএসের ৭ নম্বর লেনের ৪৪৮ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের তৃতীয় তলায় অভিযান চালিয়ে বার জনকে আটক করেছে। তারাও বিভিন্ন গার্মেন্ট মালিকসহ ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ওই বাসায় ডেকে আনতো। পরে অফিসে থাকা মহিলাদের সঙ্গে অবৈধ মেলামেশা করার সুযোগ করে দিতো। কৌশলে এসব দৃশ্য ভিডিও করা হতো। পরে আপত্তিকর অবস্থার সেই ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। আদায় করা হতো বিপুল অর্থ। কখনো কখনো অবৈধ অস্ত্র দেখিয়ে শারীরিক ভাবে নির্যাতন এবং সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখেও টাকা আদায় করতো তারা। ওই বাসা থেকে আটককৃতরা হলো- ওমর ফারুক (২০), আল ইমরান হোসেন (২৪), আতিকুর রহমান রায়হান (২৫), নিহার রঞ্জন দাস (২৫), মোন্তাছের রহমান রাজীব (২৩), তুহিন হোসেন (১৮), সাখাওয়াত হোসেন (৩৩), আনোয়ার হোসেন (৩৪), আল আমীন হোসেন (১৭), আইযুব আলী (৩৫), মঈনুল ইসলাম (২২) ও মোস্তফা (৩১)। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ওয়াজিবুল্লাহ মিলন প্রকাশ ওরফে তপু (৩৩) ও রিসাদ প্রকাশ ডিটাস (২৮) নামে দুই যুবক পালিয়ে গেছে। তারাই হলো এই অফিসের মালিক ও মূল হোতা। আটককৃতরা তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। ওই অফিস থেকে ৩৮টি ব্ল্যাংক কার্টিজ পেপার, ১৫টি পাসপোর্ট, ১টি মোটরসাইকেল, ২ বোতল ফেনসিডিল, ১টি ম্যাগাজিন ও ১টি মেটাল ডিটেক্টর উদ্ধার করা হয়। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এটিএম হাবিবুর রহমান বলেন, বায়িং হাউজের আড়ালে তারা এই ব্ল্যাকমেইলিং করতো। তাদের টার্গেট ছিল সমাজের বিত্তশালীরা। বিশেষ কারে গার্মেন্ট সেক্টরের বড় কর্মকর্তাদের তারা অফিসে নিয়ে নারীঘটিত ব্যাপারে ব্ল্যাকমেইল করতো। আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন