ভারতের নির্বাচন, বাংলাদেশের কি ফায়দা

0
63
Print Friendly, PDF & Email

একটি ছোট দেশ তার আশপাশের বড় বড় প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব থেকে কখনোই ছাড় পায় না। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ক্রিমিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। বাংলাদেশও ভারত ও চীনের মত হেভিওয়েট রাষ্ট্রগুলোর মাঝখানে অবস্থান করছে। উভয় বড় দুটি দেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সদা মরিয়া। যেহেতু বাংলাদেশকে তিন দিক থেকে পরিবেষ্টি করে রেখেছে ভারত। সুতরাং বাংলাদেশের উপর প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

এই কারণে ভারতের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পুনরায় দিল্লির মসনদে ফিরে যায়, তবে দেশটিতে কার্যত কোন পরিবর্তন সাধিত হবে না। তবে ভারতের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন হতে পারে যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে।

প্রশ্ন হতে পারে যদি বিজেপি ক্ষমতায় যেতে পারে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি না? সবারই জানা আছে ক্ষমতাীসন কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনকে সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগকে দ্বিতীয়বারের মত ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। যদিও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি সংবিধান সম্মত কিন্তু কার্যত এই নির্বাচন করে ক্ষমতাসীনদের নৈতিক পরাজয় হয়েছে।

৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচনকে সাজানো ও মনগড়া উল্লেখ করে নির্বাচনটি বর্জন করে বিরোধী দল বিএনপি ও মিত্ররা। যার ফলে আওয়ামী লীগ ১৫৪টি আসনে বিনা ভোটে জয় লাভ করে সরকার গঠন করে।

দশম জাতীয় নির্বাচনের পর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ও উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা বিশেষ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে বেশ সমালোচনা করে নতুন করে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারকে আহবান জানায়। কিন্তুু এত সমালোচনা, আলোচনার পরও শুধু মাত্র ভারতের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। ভারতের কাছে বাংলাদেশের সংবিধান রক্ষা করার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তুু সংবিধান রক্ষার নামে, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য ৫ জানুয়ারির অনেকটা জনবিছিন্ন নির্বাচন আয়োজনে সরকারকে ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে কাজ করে ভারত সরকার, অথচ ভোটের নামের ভোটাধিকার চুরি, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি কি এক বারও ভারত সরকারের মনে নাড়া দেয়নি। ভারতে কি কখনো জনবিছিন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়? ভারতের ইতিহাসে এমন সাজানো নির্বাচনের কোন হদিস পাওয়া যাবে না। শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও পাশ্ববর্তী দেশকে শোষণ করার জন্য একটি বৃহৎ রাষ্ট্র তার প্রতিবেশি ছোট রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের পছন্দমত সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সকল অপকর্ম, ষড়যন্ত্র করেছে। কিšত্ম বিপরীতে আমাদের ছোট রাষ্ট্রের কিছু করার থাকে না। বিশেষ করে যখন আপনার পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রটি আপনার যৌক্তিক পাওনাগুলোও সময়মত দেয় না। তবে ক্ষমতা যদি অপনার কাছে মুখ্য না হয়, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যদি আপনার রাজনীতির আসল চেতনা হয়, রাষ্ট্রের নিজস্বতা যদি আপনার কাছে বড় মনে হয় তবে যে কোন প্রভাবশালী বড় প্রতিবেশি রাষ্ট্র আপনাকে ঠকাতে পারবে না, আপনাকে ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত রাখতে পারবে না। তাদের অস্ত্র থাকতে পারে, কিন্তুু আপনার তো মনোবল রয়েছে, সহযোগি বন্ধু রাষ্ট্র রয়েছে, সুতরাং একটি রাষ্ট্রকে অহেতুক ভয় পাওয়ার কি আছে?

ইতিহাস বলছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে ভারতের কোন সরকারই সরাসরি হ¯ত্মক্ষেপ করেনি। কিন্তুু বর্তমান কংগ্রেস সরকার ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনসহ সকল রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বিষয়ে সরাসরি নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে। তাই বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া হয়তো অপেক্ষা করছেন যে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি সরকার গঠন করলে নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাত করে চলতি রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তাদের হ¯ত্মক্ষেপ কামনা করতে পারেন। কারণ হ¯ত্মক্ষেপের রা¯ত্মা যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার দেখিয়ে দিয়েছে, সুতরাং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য খালেদা জিয়া ভারতের নতুন সরকারের সাহায্য কামনা করতেই পারেন। তবে বিজেপি যেহেতু হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল, আর বিএনপি মধ্যম ধারার রাজনৈতিক দল আর তাদের অন্যতম মিত্র হল কঠোর ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী, সুতরাং বিজেপির কাছে খালেদা জিয়ার সাহায্য কামনা করতে বেশ বেগ পেতে হতে পারে। এর মধ্যে আবার বিগত ২০০১-৬ শাসনামলে বিএনপি ভারতকে এড়িয়ে পশ্চিমা নীতি গ্রহণ করেছিল, তাই বিজেপির সাথে মিশতে হলে বিএনপিকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।

এই দিক দিয়ে আবার হাসিনা সরকারের সাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ, বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নামে ভারতকে ট্রানজিট, বন্দি বিনিময় ও নিরাপত্তাখাতে বিশেষ সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশ অনেক ছাড় ও সাহায্য দিয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার ও উন্নয়নের অন্যতম সহযোগি রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া ভারত সরকারকে সম্প্রতি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় তেলগ্যাস সন্ধান ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যার ফলে দক্ষিণ-এশিয়ার এই দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিহাসের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক উচ্চ শিখরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সময় কিন্তুু সব সময় এক থাকে না। সম্প্রতি আসামের একটি নির্বাচনী সভায় নরেন্দ্র মোদি অভিযোগ করেছেন যে অবৈধ বাংলাদেশিদের বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের জন্য কংগ্রেস সরকার তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন, যার ফলে আসামের ঐতিহ্যবাহি নিধণ শুরু হয়ে গিয়েছে। মোদির এমন বক্তব্য ঢাকার উপর বেশ প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া মোদি সরকারের আচরণের উপর ভবিষ্যত বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই নির্ভর করবে। কারণ প্রতিটি সরকারের কাছে বৈদেশিক নীতি অনেক গুরুত্ব পায়। উদাহারণ হিসেবে বলা যায় পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মহমোহন সিং বাংলাদেশের সাথে তি¯ত্মার পানি বন্টন নিয়ে কার্যত কোন চুক্তি করতে পারেননি। এর মধ্যে আবার যদি মোদি সরকার ক্ষমতায় আসে তবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তার বিশ্ব¯ত্ম বড় ভাইকে হারাতে পারে। সুতরাং বিএনপির উচিত হবে বিদেশি কোন রাষ্ট্রের উপর নির্ভর না করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে নিয়ে আসার কৌশলী পথ অবলম্বন করতে পারে এবং ভারতের কোন সরকারের উচিত হবে না বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আর বেশি নাক গলানো।

যেহেতু ভারত এই অঞ্চলের একটি প্রভাবশালী ও উন্নয়ন সহযোগি রাষ্ট্র তাই এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য দিল্লির উচিত হবে ঢাকায় একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনে সাহায্য করা। আবার বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসে তবে আওয়ামী লীগ সরকার যদি অতীতের কংগ্রেস সরকারের মত সুসম্পর্ক বজায় রাখে তবে বাংলাদেশের অনেক উপকার হবে এবং পর্যায়ক্রমে সরকার তার ন্যায্য দাবিগুলো ভারতের কাছে তুলে ধরতে পারবে।

শেয়ার করুন