শাহবাগ-লিগ বিরোধ ও শাহবাগের ভবিষ্যৎ : আখতারুজ্জামান আজাদ

0
74
Print Friendly, PDF & Email

গণজাগরণ মঞ্চ (কিংবা প্রজন্ম চত্ত্বর) এখন নিদারুণ ক্রান্তিকালে। অন্তর্দ্বন্দ্বে-বহির্দ্বন্দ্বে মঞ্চ এখন জর্জরিত-জরাগ্রস্ত-জীবন্মৃত। এই ক্রান্তিকালে প্রয়োজন কিছু নির্মোহ বিশ্লেষণ, আয়নার সমুখে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা ও মঞ্চের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি রাজাকার কাদের মোল্লার বিতর্কিত রায়ের প্রতিবাদে শাহবাগে অনলাইনকর্মীদের আহ্বানে বিকেলে যে জমায়েত হয়েছিল, সন্ধের পর সভাপতি-সম্পাদকের নেতৃত্বে সেই জমায়েতে এসে যোগ দিয়েছিলেন ছাত্রলিগের একঝাঁক নেতা-কর্মী। বলা চলে ৫ তারিখের শুরুর দিককার সেই জমায়েতের একটি বিরাট অংশই ছিলেন ছাত্রলিগকর্মী। পরদিন থেকে জনতার ঢল নামার পর শাহবাগে ছাত্রলিগের কর্মতৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলিগ ও এর হল কমিটির নেতৃবৃন্দ তাদের কর্মীদেরকে শাহবাগে নিয়ে আসেন এবং তাদের সেøাগান-মিছিলও আলাদা করেই চোখে পড়েছে। চোখে পড়েছে ছাত্রলিগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকি নাজমুল আলমের আন্তরিক কর্মযজ্ঞ। তাকে দেখা গেছে নিজ হাতে স্যালাইনের বোতল জনতার মাঝে বিতরণ করতে, বিশৃক্সখল জনতাকে নিজ হাতে সুশৃক্সখল করতে, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শিশুতোষ নাচ নেচে-নেচে স্লোগানে অংশ নিতে। ফেব্র“য়ারির সেই উত্তাল দিনগুলোতে আওয়ামি লিগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন শাহবাগের সবচেয়ে বড় শুভাকাক্সক্ষী। তিনি খোদ সংসদে দাঁড়িয়ে তখন শাহবাগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেছিলেন তার মনও শাহবাগে পড়ে আছে, ঘরে বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে তিনি শাহবাগের আলোকপ্রজ্বলন কর্মসূচির সাথেও সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। ৬ তারিখ থেকে শাহবাগে শুরু হয়েছিল লিগের শীর্ষনেতাদের উপস্থিতি। অন্তরের টানে হোক কিংবা সময়ের তালে তাল মিলিয়ে নিজেকে বিজ্ঞাপিত করার জন্যই হোক, লিগের শীর্ষনেতাদের প্রায় সবাই অন্তত একবার তখন শাহবাগে এসেছিলেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগের শীর্ষনেতাদের রমরমা উপস্থিতি দেখে এবং শাহবাগের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ আশীর্বাদছাতা দেখে তখন জামায়াত শাহবাগকে লিগের পাতানো আন্দোলন বলে আখ্যা দিয়েছিল।
নানা কারণে শাহবাগ ক্রমশ বিবর্ণ হলো, সুদিন কেটে গিয়ে শাহবাগের দুর্দিন এল। শাহবাগের প্রথম বিভক্তি ঘটল কথিত ব্লগার আহমেদ হায়দার রাজীবের হত্যাকা-ে। ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মতো এই হত্যাকা-ের মাধ্যমে জামায়াত শাহবাগকে সুকৌশলে আস্তিকতা-নাস্তিকতা ইস্যুতে বিভক্ত করে দিল; এতে দুর্বলচিত্তের ইমানদারেরা শাহবাগ ছেড়ে গেলেন, সবলচিত্তের ইমানদারেরা শাহবাগের মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেন।
এক পর্যায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো এবং যে উদ্দেশ্যে শাহবাগে ঐতিহাসিক গণজাগরণ ঘটেছিল, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেল। কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়ে যাবার পর শাহবাগ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষিত হওয়া কিংবা মঞ্চের কার্যক্রম সংকুচিত করে কেবল রাজাকারদের বিচারসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকাটা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু কী যেন এক রহস্যের প্রভাবে শাহবাগলেবুটিকে অতিরিক্ত কচলাতে-কচলাতে তেতো করে ফেলা হলো। একটি নাগরিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাবার পরও সম্মানজনকভাবে বিদায় না নিয়ে আন্দোলনটিকে অহেতুক প্রলম্বিত করলে যা হবার কথা, শাহবাগের ভাগ্যে ঠিক তা-ই ঘটল

প্রথমে আসা যাক শাহবাগ-লিগের দোস্তিভাঙন প্রসঙ্গে। নিবন্ধের শুরুতেই শাহবাগ আন্দোলনে লিগের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছে; লিগ সরকার শাহবাগকে সব ধরনের পুলিশি নিরপত্তা দিয়েছে, রাজীবহত্যার পর কতিপয় ব্লগারকে গানম্যানও দিয়েছে বলে শোনা গেছে। আচমকা কোনো এক অলৌকিক কারণে লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শাহবাগের ওপর বিরাগভাজন হলো এবং শুরু হলো শাহবাগের প্রতি লিগের বিপিতাসুলভ আচরণ। শাহবাগে তোফায়েল আহমেদের প্রতি অবমাননাকে লিগ প্রায়শই শাহবাগবিরাগের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করে থাকে। বাম ছাত্রনেত্রী লাকি আখতার কর্তৃক তোফায়েল-অবমাননার কথিত অভিযোগটি লিগ, মঞ্চ বা ছাত্র ইউনিয়নের কোনো পক্ষ থেকেই খোলাসা করা হয়নি; ব্যাপারটা বরাবরই ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। অবশ্য গোটা প্রজন্ম চত্বর ও মঞ্চজুড়ে বামদের অতি-উপস্থিতি অনেকের কাছেই বিরক্তির কারণ হয়েছে এবং এই অতি-উপস্থিতি অনেকের কাছে বামদের নিষ্ফল আস্ফালন বলেও গণ্য হয়েছে। বাংলাদেশে বাম আন্দোলনের অবস্থা অতি করুণ, সিংহভাগ বামপন্থি জানেনই না তারা কী উদ্দেশ্যে ‘বিপ্লব’ ঘটিয়ে যাচ্ছেন; কিংবা জানেন না লাল নিশান আর লাল-কালো-শাদা ব্যানার-পোস্টার-প্লাকার্ড হাতে মুক্তাঙ্গন-প্রেস ক্লাব-জাদুঘর-টিএসসি-রাজু ভাস্কর্যে পৌনে একশো কর্মী নিয়ে আর কত শতাব্দীকাল ধরে সভা-সমাবেশ করলে তাদের বিপ্লবটি শেষ হবে! বাংলাদেশের বামপন্থিরা তাদের সমাবেশে কখনও হাজারো-লাখো জনতার উপস্থিতি দেখতে অভ্যস্ত নন, শাহবাগে লাখ-লাখ জনতা দেখে বামদেরও একটু ইচ্ছে জেগেছিল জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো লাখো জনতার সমাবেশে কিছু-একটা করে দেখাতে এবং এই কিছু-একটা করে দেখাতে গিয়েই অতি জোশে বামদের অর্বাচীন একাংশ শাহবাগে অপমানিত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি তোফায়েল আহমেদকে। অবশ্য মঞ্চের শুরুর দিকে বাম নেতাদের ইতিবাচক অবদানও ছিল লক্ষণীয়। যেসব সেøাগানের তালে-তালে শাহবাগ থেকে টেকনাফ-তেঁতুলিয়া তরঙ্গায়িত হয়েছে, সেসব সেøাগানের সিংহভাগের স্রষ্টাই বাম ছাত্রনেতারা এবং সেসব সেøাগান ধ্বনিত হয়েছে তাদের কণ্ঠেই। কিন্তু তোফায়েল-অবমাননার পরও দীর্ঘদিন শাহবাগে ছাত্রলিগের সরব উপস্থিতি এই অভিযোগকে কর্পূরের মতো উবিয়ে দেয়।

লিগ এরপর শাহবাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলা-না-বলা নিয়ে। এটি অভিযোগ নয়, অজুহাত মাত্র। কাদের মোল্লার ফাঁসির পরই শাহবাগের বৃহত্তম অর্জন হচ্ছে ‘জয় বাংলা’ সেøাগানের পুনরুদ্ধার। ‘জয় বাংলা’-কে যে বিভ্রান্ত সাধারণ জনতা বরাবরই লিগের দলীয় সেøাগান ভেবে এসেছে, সেই সাধারণ জনতাই দলনির্বিশেষে শাহবাগে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে ধ্বনিমুখরিত হয়েছে। লিগ নয়, শাহবাগই পেরেছে জনমানুষের মুখে একাত্তরের ‘জয় বাংলা’-কে ফিরিয়ে আনতে। অপরপক্ষে লিগ ‘জয় বাংলা’ ও বঙ্গবন্ধুকে বরাবরই বিবেচনা করেছে দলীয় সম্পত্তি হিসেবে।

২.
স্বাধীনতার চার দশক পরও দেশের মানুষের একটা বিরাট অংশ বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে না, ‘জাতির জনক’ বলে স্বীকার করে না, বঙ্গবন্ধুকে মনে করে লিগের দলীয় নেতা হিসেবে; অতি-শক্তিশালী প্রচার সেল ব্যবহার করেও লিগ বিভ্রান্ত জনগণের ভুল ভাঙাতে পারেনি, পারেনি বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বনেতা কিংবা নিদেনপক্ষে অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে! ব্যর্থতার এই দায়ভার যখন লিগের কাঁধে, শাহবাগ যখন অন্তত ‘জয় বাংলা’-কে পুনরুদ্ধার করেছে; তখন লিগ কোনোভাবেই পারে না ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ পুনরুদ্ধারের দায়িত্বও শাহবাগের ঘাড়েই চাপিয়ে দিতে।
শাহবাগে ছুটে-আসা জনতার সবাইই রাজাকারদের বিচায় চায়, কিন্তু সবাই লিগ করে না। গোলাম আজমের ফাঁসি না হয়ে যখন তার নব্বই বছরের রোমান্টিক কারাদ- হলো, তখন ক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ ভেবেই বসতে পারে পর্দার আড়ালে হয়তো লিগ-জামায়াতের সমঝোতা চলছে; ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের প্রাক্কালে সংঘটিত লিগ-জামায়াতের অলিখিত মিতালি এই সন্দেহের পালে কিছুটা হাওয়াও যোগায় বৈকি। রায়ের পর সেই ক্ষুব্ধক্ষণে মিছিলের অজস্র জনতার ভীড়ে মুখ ফসকে কেউ একবার সেøাগান দিয়ে বসেছিল ‘শেখ হাসিনার সরকার রাজাকারের পাহারাদার’ এবং সেই সেøাগান মঞ্চের মাইক থেকে উচ্চারিত কোনো আনুষ্ঠানিক সেøাগানও ছিল না, ছিল অজ্ঞাতনামা কোনো বিক্ষুব্ধের সাময়িক ক্ষোভের অভিমানী বহিঃপ্রকাশ। এত জনতার ভীড়ে কে কোথায় কী সেøাগান দিলেন; মঞ্চের তা জানারও কথা না, তদারকি করারও কথা না। অথচ এই তিলটিকে তাল বানিয়ে পরবর্তীকালে আওয়ামি লিগ বারবার জিকির তুলেছে যে, শাহবাগ আওয়ামি লিগ-বিরোধী!
আবার লিগের কেউ-কেউ এ কথাও বলে থাকেন যে, শাহবাগের কারণে লিগ গণহারে নাস্তিক খেতাব পেয়েছে। মূলত জামায়াতের বিপক্ষে যারাই অবস্থান নেয়, জামায়াত তাদেরকেই নাস্তিক-অমুসলিম-মুরতাদ খেতাব দিয়ে থাকে; জামায়াতের কাছে শেখ হাসিনা কিংবা খোদ বঙ্গবন্ধুও বহু আগে থেকেই নাস্তিক, জামায়াত একাত্তরেও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নাস্তিক-মালাউন বলে প্রচার করেছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিরা চুয়ান্নর নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রচার করেছিল যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিলে ঈমান থাকবে না। অতএব লিগের সাথে ‘নাস্তিক’ খেতাবটা অতি পুরোনো, শাহবাগ লিগকে নতুন করে ‘নাস্তিক’ বানায়নি। আবার আওয়ামি লিগ এতটা ধার্মিকদের দলও না যে, জামায়াত নাস্তিক বললেই লিগারদের গাত্রদেশে ফোসকা পড়ে যাবে!
সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোয় হেফাজত বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে ভূমিকা রেখেছে এবং সে অনুযায়ী শাহবাগ লিগের পক্ষে ভূমিকা রাখেনি বলেও লিগের পক্ষ থেকে অনুযোগ আছে। হেফাজত নতুন কোনো সংগঠন নয়, শাহবাগ আন্দোলনের আগেও তাদের অখ্যাত অস্তিত্ব ছিল; হেফাজতিরা বরাবরই জামায়াতের ভোটার, শাহবাগের উদ্ভব না ঘটলেও তারা জামায়াতকেই ভোট দিত; লিগকে কখনও না। বরং লিগই বারবার হেফাজতকে তোষণ করে হেফাজতের ভোট পাবার হাস্যকর চেষ্টা করেছে। অপরপক্ষে শাহবাগিদের ভোটের প্রায় পুরোটাই লিগের পক্ষেই পড়ে; লিগ মারুক-কাটুক, শাহবাগিরা শেষতক অশ্র“ মুছে লিগকেই ভোট দেয়। লিগের কেউ-কেউ আশা করেছিলেন শাহবাগ লিগের ভোটব্যাংক তৈরি করবে, শাহবাগ লিগকে নির্বাচনী বৈতরণি পার করিয়ে দেবে। কিন্তু লিগ ভুলে গিয়েছিল শাহবাগ কোনো নির্বাচনী বুথ না, কাউকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনা শাহবাগের কাজ নয়।
লিগ শাহবাগবিরোধী যত অভিযোগ উত্থাপন করেছে; তা নিতান্তই ঠুনকো, হাস্যকর ও শিশুতোষ। লিগ আসলে শাহবাগকে ভেবেছিল নির্বাচনী মঞ্চ কিংবা সোনার-ডিম-পাড়া হাঁস। কিন্তু শাহবাগ নিয়ে লিগের যখন আশাভঙ্গ হলো, যখন লিগ দেখল শাহবাগকে নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না বা শাহবাগের জনতা কোনো নির্দিষ্ট দলের এজন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আসেনি; লিগ তখনই শাহবাগকে ব্যবহৃত পলিথিনের মতো ছুড়ে ফেলে দিল। ওপর-আকাশে সবুজ মেঘ দেখে লিগের ভার্চুয়াল লাঠিয়ালবাহিনী পেল বাঁদরনাচের নতুন মুদ্রা। একগাদা গালিগালাজ আর শূন্য মগজই যাদের সম্বল, শাহবাগকে দেয়া বিশটা গালির শেষে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ লিখেই যারা লিগের প্রতি দায়িত্বপালন শেষ বলে মনে করে, মুক্তিযুদ্ধ বা লিগের পক্ষে যাদের কারোর নেই নিদেনপক্ষে একটি আমলযোগ্য নিবন্ধ; সেই গালিবাজরা হয়ে গেল বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামি লিগার। বাঁশের কেল্লা শাহবাগকে যে-যে ভাষায় আক্রমণ করত, এই চক্রটি শাহবাগকে ঐ একই ভাষায় আক্রমণ করে চলছে; কখনও বা বাঁশের কেল্লাও এই স্বঘোষিত লিগারদের শাহবাগবিরোধী লেখাগুলো শেয়ার করেছে; অর্থাৎ‍ ভার্চুয়াল লিগারদের একেকজনই যেন বাঁশের কেল্লার একেকজন ভারপ্রাপ্ত অ্যাডমিন, শাহবাগবিরোধে এখন লিগ-জামায়াত ভাই-ভাই। অন্তত একটি ইস্যুতে লিগ ও জামায়াতকে ভাই বানাতে পারাটাও অবশ্য কম কৃতিত্বের বিষয় না!

লিগ বরাবরই মোশতাকদেরকে কাছে টেনে তাজউদ্দিনদেরকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। পঁচাত্তরের মতো লিগ আবারও ভুল করল। শাহবাগের যে কর্মীরা শাহবাগ আন্দোলন শুরুর আগ থেকে এখন পর্যন্ত লিগের পক্ষে অনলাইনে-অফলাইনে নিভৃতে কাজ করে গেছেন, পাননি বা চাননি কাজের স্বীকৃতি-কৃতিত্ব; তারাই আজ আওয়ামি পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটার শিকার হচ্ছেন। আওয়ামি পুলিশের লাঠিপেটায় জর্জরিত মঞ্চকর্মীদের মুখ মনের অজান্তেই জাতীয়তাবাদী পুলিশের লাঠিপেটায় আহত শহিদজননী জাহানারা ইমামের মুখটিকে মনে করিয়ে দেয়! ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে। ক্ষমতার বাইরে থাকাবস্থায় শেখ হাসিনা গণআদালতে নিজে হাজির হয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন, এখন তারই শাসনামলে পুলিশি পিটুনিতে আহত হন মঞ্চকর্মীরা! সময় ও ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, রাজাকারদের পক্ষ নেয়ায় ইতিহাস বিএনপিকে কালের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। গণজাগরণকর্মীদের ওপর এই নির্মমতার ফলও আওয়ামি লিগ ইতিহাস থেকে একদিন পেয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষের একজন নগণ্য কর্মী হিসেবে এত দিন গণজাগরণ মঞ্চকে সমর্থন করে গেছি। মঞ্চের কিছু অহেতুক কীর্তিকলাপে ক্ষুব্ধ হলেও প্রকাশ্যে তা নিয়ে হৈ-হল্লা না করে তা বরং মঞ্চনেতাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছি। আজ এই দীর্ঘ নিবন্ধে মঞ্চের স্বার্থেই মঞ্চ নিয় কিছু কথা বলার তাড়না ও প্রয়োজন বোধ করছি।

৩.
গণজাগরণ যখন কেবলই ‘গণজাগরণ’ ছিল, তখন সব মানুষ একই ছাতার নিচে ছিল; কিন্তু গণজাগরণ যখন ‘মঞ্চ’ হয়ে গেল, তখন সেটি আস্তে-আস্তে জনসম্পৃক্ততা হারাল। ফেব্র“য়ারিতে যারা শাহবাগে দিবা-নিশি থেকেছেন, মঞ্চসৃষ্টির পর তাদের অনেকে বাড়িমুখো হলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বড়ই বিচ্ছিন্ন ও ঐক্যহীন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির প্রত্যেকে একেকটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র; ব্যক্তিরূপী এই রাষ্ট্রদেরকে ধরতে পাসপোর্ট লাগে, ছুঁতে ভিসা লাগে; এই রাষ্ট্রদের সাথে কথা বলতে টিকেট কাটতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দুজন ব্যক্তি কখনোই পরস্পরকে মানেন-গোনেন না। ফলে গণজাগরণ মঞ্চে কখনোই কোনো কর্মী ছিল না, ছিল কেবল নেতা বা নেত্রী। শাহবাগে গেলে কুয়োর ব্যাঙটি কিংবা ছাগলের তৃতীয় ঠ্যাঙটিও নেতা বনে যায়। এ কারণে মঞ্চ কখনোই টেকসই হয়নি বা হবেও না। অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট হবার মতো অধিক নেতানেত্রীতে মঞ্চ নষ্ট হয়েছে। মঞ্চকে তবুও খতিয়ে দেখতে হবে কেন ও কী অভিমানে এককালের শাহবাগ-অন্তঃপ্রাণ ব্যক্তিরাও একে-একে মঞ্চ ছেড়ে গেছেন বা যাচ্ছেন এবং সম্ভব হলে ছেড়ে-যাওয়াদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে।

কাদের মোল্লার ফাঁসির পর মঞ্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলে তা হতো বীরোচিত প্রস্থান। তা না করে মঞ্চ রীতিমতো দেশোদ্ধারের দায়িত্ব নিয়েছে। প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ইস্যুতে সময়ে-অসময়ে ডজন-ডজন সভা-সমাবেশ-সেমিনার-কনসার্ট ডেকে মঞ্চ নিজেকে খেলো করে ফেলেছে। শাহবাগের যৌবনকালে মঞ্চকে দেখা যেত জামায়াতের হরতাল প্রতিরোধেও মিছিল-মিটিং করতে! সাকুল্যে একশো মানুষ নিয়ে শাহবাগ থেকে শহিদমিনার পর্যন্ত মিছিল করেই জামায়াতের হরতাল প্রতিরোধ করা হয়ে গেছে বলে আত্মতৃপ্তি বোধ হাস্যকর ছিল বটে। আবার গোলাম আজমের রায়ের পর দিন ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সাথে মঞ্চ হরতালও ডেকেছিল, যেটি কমিটি ও মঞ্চ উভয়ের জন্যই হাস্যস্পদ ছিল! মধ্যবিত্ত আটপৌরে জনতার অংশগ্রহণে গড়ে একটি আন্দোলনপ্রসূত মঞ্চ নষ্টভ্রষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর মতো হরতাল ডাকছে — ব্যাপারটা নেহায়েত কৌতুককর ও চাঞ্চল্যকর ছিল বটে! আবার মঞ্চকে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে কনসার্ট আয়োজন করতে, যেটা কোনোভাবেই মঞ্চের প্রত্যাশিত কার‌্যাবলির মধ্য পড়ে না। মঞ্চকে দেখা গেছে পাকিস্তানি পণ্য বর্জনের জন্য একেবারে বাণিজ্যমেলা অবধি চলে যেতে, আবার বাজারে-বাজারে গিয়ে লিফলেট বিতরণ করতেও দেখা গেছে মঞ্চের নেতাদেরকে। মঞ্চকে দেখে বোঝারই উপায় থাকে না মঞ্চটার স্বভাবধর্ম ঠিক কী — রাজনৈতিক, সামাজিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নাকি প্রাত্যহিক? গণজাগরণ মঞ্চ যখনই পাঁচমিশালি-গুরুচ-ালি কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলল, মঞ্চ তখন থেকেই গুরুত্ব হারাতে লাগল এবং ক্রমশ হাসির পাত্রেও পরিণত হলো। মঞ্চকে কে বা কারা বুদ্ধি দিয়েছিল পাঁচমিশালি কাজে নেমে ভর্তা হতে?

মঞ্চ চালানোর ব্যায়ের পরিমাণ ব্যাপক। একেকটি সভা, সমাবেশ, বেহুদা কনসার্ট ইত্যাদি আয়োজনে খরচের বহর কম নয়। নির্যাতিত হিন্দুদের জন্য মঞ্চ ত্রাণও নিয়ে গিয়েছিল। ইত্যাকার নানা ইশুতে মঞ্চের হাতে কোথাও-না-কোথাও থেকে টাকা এসেছে, জনগণের অংশগ্রহণে বেড়ে-ওঠা আন্দোলন বিধায় সেসব টাকার উৎ‍স ও খরচ নিয়ে জনমনে কৌতূহল থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। মঞ্চ যেহেতু অনলাইনের ফসল, সেহেতু অনলাইনে নিয়মিতভাবে মঞ্চের আয়ব্যয়ের হিসাব হালনাগাদ করলে এখন টাকাপয়সা নিয়ে এত অভিযোগ উত্থাপিত হতো না।

মঞ্চ এখন এতটাই জনবিচ্ছিন্ন যে, নিয়মিতভাবে যারা মঞ্চের কার্যক্রমে এখনও যুক্ত, তাদেরকে মঞ্চের পেশাদার কর্মী মনে হয়। বলতে বা শুনতে হয়তো কষ্ট হয় যে, মঞ্চ করাটাও আপাতদৃষ্টিতে যেন এখন একটি বৈতনিক বা অবৈতনিক পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে! মঞ্চের দোষেই গড়ে ওঠা এই ভাবমূর্তি মঞ্চকর্মীদের জন্য নিশ্চয়ই সুখকর কিছু নয়।

মঞ্চ এখন এতটাই রাজনৈতিক আচরণ করছে যে এবং দিন-দিন তুচ্ছ বিষয়াদি মঞ্চ এমনই বাহারি-বারোয়ারি-রকমারি রাজনৈতিক কর্মসূচি দিচ্ছে যে, মঞ্চটিকে এখন একটি ছোটখাটো রাজনৈতিক দল বলে মনে হয়! গণজাগরণ মঞ্চ ফেব্র“য়ারির ঐতিহাসিক গণজাগরণের ফসল এবং সেই জাগরণ ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত স্ফুরণ, জনগণের নিরেট আবেগ জড়িত সেই স্ফুরণের সাথে। মঞ্চসংশ্লিষ্ট কেউ যদি রাজনৈতিক দল গঠনের উচ্চাভিলাষ পোষণ করেন, তবে তাকে তা করতে হবে মঞ্চের পরিচয় ঝেড়ে ফেলে, মাঠে নেমে। জনগণের আবেগকে পুঁজি করে গড়ে-ওঠা গণজাগরণ মঞ্চকে মঞ্চসংশ্লিষ্ট যদি কেউ রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করে সেই দলের নেতা হতে চান, তাহলে তা হবে জনগণের সাথে সুস্পষ্ট গাদ্দারি ও প্রতারণা এবং তিনি নিমিষেই নিক্ষিপ্ত হবেন শাহবাগের আস্তাকুঁড়ে। রাজনৈতিক দল গঠন প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে-আসা জনতার আবেগকে বিক্রি করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইলে সেই লুটেরার পরিণতি হবে অতি ভয়াবহ ও করুণ।

মাত্র একজন রাজাকারের ফাঁসি হয়েছে, অন্য সব রাজাকারের ফাঁসি এখনও বাকি। মঞ্চের এখন উচিত সম্মানজনক বিদায় গ্রহণ কিংবা বেহুদা ও বিতর্কিত কর্মসূচিগুলো ছাঁটাই করে বাকি রাজাকারদের ফাঁসি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুনির্ধারিত কর্মসূচি দিয়ে নিজেদেরকে বেহুদা বিতর্ক থেকে দূরে রাখা। সেই সাথে মঞ্চের উচিত চৌদ্দ মাসের আয়-ব্যয়ের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। মঞ্চের ওপর সরকার যেভাবে ক্ষিপ্ত, তাতে মঞ্চনেতাদের বিরুদ্ধে যেকোনো সময়ে দুদকে মামলা হয়ে যেতে পারে। দুর্নীতির মামলা কাঁধে নিয়ে মঞ্চনেতারা আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়াবেন, এই দৃশ্য দেখতে আমাদের নিশ্চয়ই কারো ভালো লাগবে না!

আওয়ামি লিগ এখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির শেষ আশ্রয়স্থল। লিগকে মনে রাখতে হবে যে, মঞ্চ লিগের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। মঞ্চ বরং আওয়ামি লিগের মোশতাক অংশের বিরুদ্ধে জাগ্রত বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ আছে বা ছিল। লিগ এই সত্যটুকু বুঝুক এবং মঞ্চও তার এখতিয়ার নির্ধারণ করে এখতিয়ার অনুযায়ী কাজ করে নিজেদেরকে বিতর্কমুক্ত রাখুক — মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন নগণ্য মানুষ হিশেবে এইই আমার প্রত্যাশা! জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!

শেয়ার করুন