ডিজিটাল দেশে এনালগ পুলিশ

0
79
Print Friendly, PDF & Email

অপরাধী ও অপরাধ শনাক্তে পুলিশ বাহিনীতে ‘ডিজিটাল’ হাওয়া লাগলেও অধিকাংশ সদস্য ‘এনালগ’ পদ্ধতিতেই কাজ করছেন। কোটি কোটি টাকার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজন ঘটলেও এর ব্যবহারে খুব একটা আগ্রহ নেই তাদের। শুধু মোবাইলফোন কললিস্ট বিশ্লেষণ আর গৎবাঁধা নিয়মে আবদ্ধ হয়ে আছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিকভাবেই এনালগে বন্দী হয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশ বিভাগে ভেহিকেল স্ক্যানার, ইলেকট্রনিক রোড ব্লকার, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ রোবট, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যন্ত্র (পলিগ্রাফ), অনলাইন জিডি, ফেসবুক পেজ, ফরেনসিক ল্যাবরেটরি, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ আরও অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের বিষয়টি ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয়। কিন্তু নিয়মিতভাবে ব্যবহার না করায় অনেক যন্ত্রপাতিই অকেজো হওয়ার পথে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী এসব ইউনিটে কাজ না করার কারণে অনেক কর্মকর্তার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতিতে ‘বাংলা ড্রোন’ সংযোজনের ঘোষণা দেওয়া হলেও এর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘কনস্টেবল থেকে শুরু করে কমপক্ষে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সেবাপ্রদান ও মানবাধিকারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রেষণার প্রয়োজন।’ সিসিটিভি ক্যামেরার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত অনেক পুলিশ সদস্যের কাছে এটি রীতিমতো আতঙ্কের কারণ। সবকিছু মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে এলে তাদের ফেঁসে যাওয়ার ভয় থাকে।’ জানা গেছে, ট্রাফিক ডিভিশনের সব কাজ ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে ই-ট্রাফিক প্রকল্প শুরু হয় ২০১০ সালের নভেম্বরে। এতে পুশ-পুল সার্ভিস, কেস-এন্ট্রি ও মনিটরিং পদ্ধতি, পেমেন্ট কালেকশন সিস্টেম এবং কুরিয়ার সার্ভিস কাজ করার কথা। প্রকল্পের আওতায় একটি মোবাইলফোন অপারেটরের মাধ্যমে অল্প সময়ে গাড়ি সংক্রান্ত যে কোনো মামলার জরিমানা পরিশোধ করা যায়। প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক স্বচ্ছ হওয়ায় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাড়তি আয় কমে যায়। কিন্তু ই-ট্রাফিক ব্যবস্থা এখন অনেকটাই অকার্যকর। ২০০৯ সালে বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে ভাড়াটিয়া ও আবাসিক হোটেলে অবস্থানকারীদের তথ্য সংগ্রহের জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ফরম দিয়ে থানাগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি। একই বছরের মার্চে উত্তরার থানাগুলোতে অনলাইন জিডির (সাধারণ ডায়েরি) ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালালেও কিছু দিনের মধ্যে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। সূত্রমতে, হত্যা মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তারা এখনো কার্যত এনালগ পদ্ধতির (সোর্স) ওপরই বেশি আস্থাশীল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা নির্ভর করেন লাশের সুরতহাল, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীর বক্তব্য এবং সন্দেহভাজন আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের ওপর। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ঘটনাস্থল থেকে আঙ্গুলের ছাপ তোলার জন্য সারা দেশের মোট ৬১৭টি থানায় সিআইডির (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) পক্ষ থেকে অত্যাধুনিক ‘কিট বঙ্’ দেওয়া হলেও বর্তমানে অধিকাংশ থানায়ই এর অস্তিত্ব নেই। সিআইডিতে হাতের ছাপ থেকে শুরু করে চুল, অাঁশ, ধুলো, রক্ত, বীর্য কিংবা যে কোনো ধরনের তরলের বায়োমেট্রিঙ্ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবরেটরি রয়েছে। বিস্ফোরক, অস্ত্র ও গাড়ির চেসিস নম্বর পরীক্ষা, ভিসেরা, অপরাধী কিংবা সাক্ষীর বক্তব্য সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যন্ত্র (পলিগ্রাফ) রয়েছে। তবে তদন্তে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এসব এড়িয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, থানার অনেক কর্মকর্তার আলামত সংগ্রহ ও ক্রাইম সিন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান নেই। অনেক কর্মকর্তা জানেনই না কীভাবে আঙ্গুলের ছাপ নিতে হয়। এমনকি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের কর্মকর্তারা সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আলামত যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে পারেননি। যথাযথভাবে আলামত সংগ্রহ করতে না পারায় আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার ক্লু বের করা যায়নি বলে জানিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা। ২০১২ সালের ২২ এপ্রিল সংসদ ভবন চত্বর থেকে উদ্ধার অজ্ঞাত নারীর পরিচয়ের কোনো সুরাহা হয়নি। রামপুরার বাসায় গত বছর ২৯ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলুর রহমানের হত্যা রহস্য উদঘাটিত হয়নি। গোপীবাগের আর কে মিশন রোডে গত ২১ ডিসেম্বর একটি বাড়িতে ইমাম মাহদীর কথিত প্রধান সেনাপতি লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে জবাই করে হত্যার কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। গত ৯ জুলাই ঢাকা-১৬ আসনে (মিরপুর-পল্লবী) আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ইলিয়াছ উদ্দিন মোল্লার ব্যক্তিগত সহকারী আমির হোসেন কাঞ্চনের হত্যা রহস্যও উদঘাটন হয়নি। জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান, পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আলামত সংগ্রহে দেশের প্রায় প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য রয়েছেন। যেসব থানায় নেই, পর্যায়ক্রমে আলামত ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাছাড়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলেই সিআইডির টিম ঘটনাস্থলে যায়।’ তিনি আরও বলন, ‘ফরেনসিক কিংবা বিশেষায়িত ইউনিটের জন্য চলমান নিয়মের পাশাপাশি এঙ্পার্টদের নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এতে কোনো পুলিশ সদস্য বদলি হয়ে গেলেও কার্যক্রম স্থবির হওয়ার অবকাশ থাকবে না। আর ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে এঙ্পার্টদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ ডিএমপি ২০১২ সালে ইলেকট্রনিক রোড ব্লকারের মাধ্যমে চেকপোস্ট চালু করলেও এখনো তেমন একটা সফলতা আসেনি। একই অবস্থা বোমা নিষ্ক্রিয়করণ রোবটের ক্ষেত্রেও। শুধু পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে দেখা মেলে এই যন্ত্রটির। বোমা খোঁজার জন্য মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশে গত বছর মাঝামাঝিতে মোবাইলফোনসেট আকৃতির লং ডিসটেন্স এঙ্প্লোসিভ ডিটেকটরের সংযোজন হয়। কিন্তু এটি দিয়ে এখনো তেমন সাফল্য আসেনি। ডিবির সংশ্লিষ্ট বিভাগের বাইরে অধিকাংশ পুলিশ সদস্যেরই এ যন্ত্র নিয়ে ধারণা নেই। অপরাধ দমন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে ৬১ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেলেও রাজধানীতে ১৫৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে টেকনিক্যাল টিম পরিদর্শনে গিয়ে ১৩৮টি ক্যামেরা সচল দেখতে পায়। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ৩১টি পয়েন্টে স্থাপিত ডিজিটাল ডিসপ্লেগুলোর বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি বছর বিপুল টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও অপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ হয়নি। ডিবির ক্রাইম সিন ইউনিটের জন্য একটি ভ্যান ও কিছু সরঞ্জাম রয়েছে, যদিও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। এসব সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বিশেষায়িত ইউনিটগুলোতে উপরি আয়ের সুযোগ না থাকায় অনেক পুলিশ সদস্য বেশি দিন থাকতেও চান না। ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমানের মতে, ‘সরকারের অন্য যে কোনো বিভাগের চেয়ে পুলিশ অনেক বেশি ডিজিটাল। প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার হয়। তবে ট্রাফিক বিভাগে পিওএস ডিভাইসের মতো অনেক যন্ত্র সংখ্যায় কম থাকায় এর সুবিধা থেকে সেবাগ্রহীতারা বঞ্চিত হচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘পিওএসের মাধ্যমে কোনো মামলা না হলে ভুক্তভোগীরা মোবাইলফোনের মাধ্যমে ফি দিতে পারেন না। আর ডাটাবেজ অনেক বড় একটি বিষয়। এর সঙ্গে পুলিশের সব ইউনিটের সংযোগ থাকতে হবে। এ জন্য ডাটাবেজ তৈরিতে কিছুটা সময় লাগছে।’

শেয়ার করুন