মাছ ও মুরগির মাংসে ক্যানসারের উপাদান

0
102
Print Friendly, PDF & Email

চাষ করা মাছ ও ফার্মের মুরগির মাংসে মাত্রাতিরিক্ত ক্যানসারের উপাদান পাওয়া গেছে। বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে মাছ ও মুরগির খাবার। এর নাম দেশী মিট ‘বোন বা ‘পোলট্রি ফিড’। আর এই ফিডের ভেতরেই ক্যানসার, কিডনি, লিভারের জটিল রোগের অন্যতম কারণ ক্রোমিয়ামের অস্তিত্ব পেয়েছেন গবেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের এক গবেষণায় ভয়ঙ্কর এ তথ্য উঠে এসেছে। রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল হোসেনের নেতৃত্বে ওই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল ‘ট্রান্সফার অব ক্রোমিয়াম ফ্রম ট্রেনারি টু হিউম্যান বডি’। গবেষণায় দেখা যায়, চাষ করা মাছ ও ফার্মের মুরগির মাংসে উচ্চ পরিমাণে ক্রোমিয়াম রয়েছে। যা ক্যানসারের অন্যতম সহায়ক উপাদান। এসব মাছ ও মাংস খাওয়ার ফলে ব্লাড, ব্রেন, স্কিন, পাকস্থলি, লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার হচ্ছে বলে জানান অধ্যাপক আবুল হোসেন। ক্যানসারের অন্যতম কারণ হলো খাবারে উচ্চ পরিমাণে ক্রোমিয়াম। ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরী ক্রোমিয়ামযুক্ত বিষাক্ত খাবার মুরগির চামড়া, মাংস, কলিজা, রক্ত, মস্তিষ্ক ও হাড়ে জমা হতে থাকে। মাছ ও মুরগির বয়স বাড়লে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি বাড়ে দ্রুতহারে। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে লিভার ও কিডনিতে জমা হতে থাকে। এক পর্যায়ে লিভার ও কিডনির কার্যক্রম ব্যাহত করে জটিল রোগের সৃষ্টি করে। মানবদেহের কোষই এক পর্যায়ে বিকল করে দেয়। গবেষণার উপাদান ফার্ম থেকে ও নিজে উৎপাদন করে প্রমাণ করা হয়। গবেষণা থেকে জানা যায়, মাছ ও মুরগির খাবারের জন্য যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয় তাতেই রয়েছে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি। পোলট্রি ফিড তৈরির জন্য গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়াসহ অন্যান্য প্রাণীর চামড়ার অতিরিক্ত অংশ ব্যবহার করা হয়। চামড়া সতেজ ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ব্যবহার করা হয় ক্রোমিয়াম। চামড়া বাজারজাত করার জন্য লেজ, মাথা, হাত-পা, শিং কেটে ফেলা হয়। আর বিভিন্ন অঞ্চলের ট্যানারি ব্যবসায়ীরা এসব অংশ ওষুধ দিয়ে মিশিয়ে গুঁড়ো করে ফেলেন এবং তার সঙ্গে অল্প পরিমাণে শুঁটকি মিশিয়ে তৈরি করেন মাছ ও মুরগির খাবার। এর নাম দেয়া হয় ‘দেশী মিট বোন’। বর্জ্য অংশ ও গরু-ছাগল, মহিষ ও অন্যান্য প্রাণীর অতিরিক্ত অংশ থেকে যে খাবার তৈরি করা হয় তাতে প্রতিকেজি খাবারে রয়েছে ১৪ হাজার মিলিগ্রাম ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি। আর মার্কেটে যে দেশী মিট বোন পাওয়া যায় তাতে রয়েছে ৮২০০ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকার এনভারমেন্টাল প্রটেকশন অব এজেন্সির (ইপিএ) আইন অনুযায়ী একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ সারাদিনে সর্বোচ্চ ৩৫ মাইক্রোগ্রাম ক্রোমিয়াম সহ্য করতে পারে। ১০০০ মাইক্রোগ্রামে হয় এক মিলিগ্রাম। আর মানুষ দৈনিক প্রতিকেজি মাছ-মাংস থেকে কমপক্ষে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম ক্রোমিয়াম খাচ্ছে। পৃথিবীতে ১২টি পদার্থকে অত্যন্ত বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে ধরা হয়। এরমধ্যে ক্রোমিয়াম একটি। মাছ-মাংস ছাড়াও, চাল, সাক-সবজি ও ফলমূলেও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাছ ও মুরগির বয়স যত বাড়তে থাকে ক্রোমিয়ামের পরিমাণও বাড়তে থাকে বলে প্রমাণিত হয়েছে গবেষণায়। বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য বাজার থেকে ২০-২৫টি মুরগির বাচ্চা পালন শুরু করেন অধ্যাপক আবুল হোসেন। তাদের খাবারের জন্য বাজার থেকে কেনেন দেশী খাবার। কিন্তু ওই খাবার খেয়ে এক মাসের আগেই ছোট কয়েকটি মুরগি মারা যায়। এক মাস পর কয়েকটি মুরগি জবাই করে ৭টি অংশ পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায় রক্তে দশমিক ৭ মিলিগ্রাম, ব্রেনে দশমিক ৮ মিলিগ্রাম, মাংসে দশমিক ৩ মিলিগ্রাম, হাড়ে এক মিলিগ্রাম, কলিজা ও চামড়ায় দশমিক ৬ মিলিগ্রাম এবং মলে ৭০.৪ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। দুই মাস পর আরও কয়েকটি মুরগি জবাই করে পরীক্ষা করে দেখা যায় ৬টি অংশেই ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মস্তিষ্কে। এখানে হয়েছে ৪.৬ মিলিগ্রাম। রক্তে হয়েছে দশমিক ৮ মিলিগ্রাম, মাংসে দশমিক ৫ মিলিগ্রাম, হাড়ে প্রায় ২ মিলিগ্রাম। কলিজায় আগের দশমিক ৬ মিলিগ্রামই রয়েছে। আর মলে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৪ মিলিগ্রাম। প্রক্রিয়া না করেই কখনও কখনও চামড়ার বর্জ্য ও উচ্ছিষ্ট অংশ সরাসরি মাছের খাবারের জন্য ব্যবহার করা হয়। যা আরও ভয়ঙ্কর। রাজধানীর হাজারীবাগ ও রায়েরবাজারেই রয়েছে কয়েক শতাধিক পোলট্রি ফিড তৈরির কারখানা। গবেষক অধ্যাপক আবুল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ক্রোমিয়াম কখনই শেষ হয়ে যায় না। এ পদার্থ মানুষের শরীরের রক্ত, ব্রেন, পাকস্থলী, হাড় কিডনি, চামড়াসহ বিভিন্ন অংশে জমা হয়ে কোষ বিকল করে দেয়। তিনি বলেন, খাবারে ক্রোমিয়ামের মাত্রারিক্ত উপস্থিতির কারণেই দেশব্যাপী ক্যানসারের রোগী দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ড. আবুল হোসেন বলেন, এই গবেষণা করার সময় ট্যানারির বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন পোলট্রি ফিডের নমুনা বাজার থেকে কেনা হয়েছে। এ ছাড়া সরাসরি কারখানা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। যেসব কারখানায় ট্যানারির বর্জ্য থেকে পোলট্রি ফিড উৎপাদন হচ্ছে তার মধ্যে ক্রোমিয়াম থাকবেই। তবে ট্যানারি বর্জ্য ছাড়াও অন্য উপাদান ব্যবহার করে দেশে পোলট্রি ফিড তৈরি হয়। সেখানে ক্রোমিয়ামের উপাদান থাকার সম্ভাবনা কম। তিনি জানান, ঢাকার ট্যানারি শিল্প এলাকা হাজারীবাগের আশপাশেই রয়েছে শতাধিক পোলট্রি ফিডের কারখানা। এগুলোতে তৈরি প্রায় সব খাবারেই রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি। তিনি বলেন, যে তাপমাত্রায় মাছ-মুরগি রান্না হয় তাতে ক্রোমিয়ামের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় না। এই রাসায়নিক উপাদান মানবকোষের ডিএনএ’র গঠন ভেঙে জেনেটিক্যাল রোগেরও সৃষ্টি করে।
ট্যানারি থেকে উৎপাদিত খাবার ব্যবহারের কারণ: প্রধানত দু’টি কারণে ট্যানারি থেকে উৎপাদিত ‘দেশী মিট বোন’ কিনে মাছ ও মুরগিকে খাওয়ানো হয়। এগুলো দামে কম। প্রতিকেজি মাত্র ১৭-১৮ টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য পদার্থে তৈরী (চাল, গম, ভুট্টা, ও শুঁটকি) প্রতিকেজির দাম ৪০-৪২ টাকা আর বিদেশী খাবার প্রতিকেজির দাম ৫০-৫২ টাকা। এছাড়া ট্যানারিতে তৈরী খাবার খেয়ে মাছ ও মুরগি দ্রুত বাড়ে।
অন্যান্য বস্তুতেও স্থানান্তরের আশঙ্কা: শুধু মাছ-মাংসই নয়, অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণেও ক্রোমিয়ারের বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। যেমন, চাল, সবজি, গমসহ অন্যান্য। কেননা মুরগির পায়খানা বা বিষ্ঠা সাধারণত শাকসবজি ও ধান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়া উচ্ছিষ্ট চামড়ার একটা অংশ কাপড় কাঁচার সাবান তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। এর ফলে স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে যায়।

শেয়ার করুন