তালিবান ও সাম্রাজ্যবাদ কি অপসৃত হতে চললো

0
197
Print Friendly, PDF & Email

রোববার আফগানিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সূচিত হলো। যতদূর জানা যায় একরকম নির্বিঘ্নেই এই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আসলে নির্বিঘ্ন বলতে যা বোঝায় তা হয়নি। কিছু বিঘ্ন তো ঘটেছেই। কিন্তু সেটা অনুমিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম ছিল। হতে পারে এর অন্যতম অবদান সেই ৩ লাখ ৫০ হাজার নিরাপত্তারক্ষীর যারা পুরো আফগানিস্তান জুড়ে নিয়োজিত ছিলো।

লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, তালিবানরা দাবি করেছে তারা ১০০০ এরও বেশি আক্রমণ চালিয়েছে। এবং সে আক্রমণে নিহতও হয়েছেন অনেকে। তারা রাস্তার পাশে অসংখ্য বোমা পুঁতে রেখেছিল, ভোটকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। সাধারণ ভোটার ও নিরাপত্তারক্ষীদের অনেকে তাদের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে। সঠিক সংখ্যাটি জানা না গেলেও সেটি নিশ্চয়ই তুচ্ছ করার মতো কোন সংখ্যা নয়। কিন্তু তারা পুরো নির্বাচন বানচাল করে দেয়ার যে হুমকি দিয়েছিল এবং নৃশংসতায় তারা ইতোপূর্বে যেসকল উদাহরণ স্থাপন করেছিল, তার তুলনায় অনেক কমই ঘটেছে ধ্বংসযজ্ঞ, এটা সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন।

এই মৃত্যুগুলোও কিন্তু অন্য তাৎপর্য নিয়ে আসছে। তালিবানদের কথার বিরুদ্ধাচরণ করলে কী পরিণতি হতে পারে তা আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ ভালোই জানেন। বলতে গেলে তার একপ্রকার- প্রাণ হাতে করেই ভোট দিতে এসেছিলেন। সেই অবস্থান থেকেও দেশজুড়ে ৬০ ভাগের বেশি ভোটার যখন ভোটদানে আগ্রহী হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে আসেন, তখন আমাদের নতুন করে ভাবতে হয়, তালিবানদের কেউ সত্যিই চায় কী না। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১ কোটি ২০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ ভোট দিতে এসেছিলেন।

ভোটকেন্দ্রে অসংখ্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যগুলো। সাধারণ নাগরিকদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তারা বলেছে, এ নির্বাচন তালিবানদের কবর রচনা করতে চলেছে। তারা বলেছে, এবার তারা প্রগতির পথে এগোতে শুরু করবে যেটা দীর্ঘদিন ধরে আরাধ্য ছিল।তাদের কথা থেকে উঠে এসেছে, প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ তালিবান প্রভাবের অবসান চায়। এ চাওয়া কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। বলা চলে, বহুদিন ধরে জমতে থাকা অসন্তোষ সাধারণ মানুষকে এমন বেপরোয়া করে তুলেছিল।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ অবধি বিস্তৃত আফগান গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আল কায়েদার শরণে তালিবানরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তারা আফগানিস্তান শাসন করে। ২০০১ সালে যৌথ সামরিক শক্তির হাতে তাদের পতন ঘটে আরেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর চরমপন্থী ধর্মপন্থা অবলম্বন করার কারণে আফগানিস্তানের মানুষ বিশেষত নারী ও শিশুরা তালিবানদের হাতে নিপীড়িত হয়েছে চরমভাবে। সাধারণ মানুষ বাহিরের বিশ্বের দিকে খুব বেশি তাকানোর সামর্থ রাখতো না। তবুও মানুষের সহজাত প্রগতিশীলতা তাদের ভিন্ন পথে ভাবতে বাধ্য করতো, এ কথা মানব মন বিশ্লেষণেই বেরিয়ে আসে। পতনের পর তালিবানরা পুনরায় ক্ষমতা সঞ্চয় করে উঠলো মূলত ২০০৪ সাল থেকে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ আবার দেখে চলেছে সেই একই সহিংসতা, চরমপন্থা, পশ্চাদপসরতা- যার অংশ ইতোপূর্বে তারা হতে চায়নি। সঙ্গে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না, আফগানরা দারুণ ধর্মঅন্তঃপ্রাণ।

শোনা যাক এ নির্বাচন সম্পর্কে শুকরিয়া বারাকজাই-এর ভাষ্য। আফগানিস্তানের স্বনামধন্য নারীদের তিনি একজন, সেইসঙ্গে প্রাক্তন সাংবাদিক এবং একজন পার্লামেন্ট সদস্য। নারীদের ওপর তালিবানদের চাপিয়ে দেয়া অন্ধ নিয়মনীতির শিকার নারীদের আদর্শ তিনি। তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন আজ সফল হয়েছে। এ ঘটনা (নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ) আফগানিস্তানের শত্রুদের মুখে সপাট চপেটাঘাত, আর যারা এখনও বিশ্বাস করে না আফগানিস্তান সত্যিকার গণতন্ত্রের জন্যে তৈরি, তাদের মুখে মুষ্টাঘাত।

আজকের সংসদ সদস্য এ নারীকে কিন্তু ১৯৯৯ সালে তালিবান ধর্মপুলিশ দ্বারা রাস্তায় নৃশংসভাবে প্রহৃত হতে হয়েছিল। তালিবান ধর্মপুলিশ যেটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছিল সেটা হলো- একজন নারী (শুকরিয়া স্বয়ং) তার স্বামী ছাড়া রাস্তায় বেরিয়েছে। শুকরিয়া সেদিন মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন এবং তার স্বামী ঘরে ছিলেন না। বাধ্য হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে তাকে একাই বাহিরে বেরোতে হয়েছিল। সেদিনের সে প্রহারের জবাব তিনি জীবনে অসংখ্য সাফল্য আর ক্ষমতাশীলতায় অধিষ্ঠান লাভের মাধ্যমে আজও দিয়ে চলেছেন।

তালিবানদের এ চরমপন্থা কিন্তু আফগানিস্তানের ক্ষতি করেছে দু’ ভাবে। প্রথমত তারা তাদের মনগড়া ধর্মীয় অন্ধত্ববাদ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের শিক্ষাবঞ্চিত করে অনেকটা পথ পিছিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত শোষক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে পরোক্ষভাবে আফগানিস্তানের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ করে দিয়ে হেরে প্রস্থান করেছে। চোখের জল ফেলতে হয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র সাধারণ মানুষদেরই, যাদের চাহিদা কখনই খুব বেশি কিছু ছিল না। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের উদ্দেশ্য প্রায় শতভাগ সম্পন্ন করেছে। আর তালিবানরাও মানুষের মন থেকে ক্রমশ বিচ্যূত হয়েছে।

এখনও চূড়ান্তভাবে কিছু বলার সময় হয়তো আসেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আরও নাটক হয়তো মঞ্চস্থ হওয়া বাকি রয়ে গেছে। তারপরও এ কথা নিশ্চিত বলা যায়- আফগানদের মানসিকতায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এটা ধরে রাখতে পারলে- স্বকীয় সমুন্নত জাতি হিসেবে তাদের মাথা তুলে দাঁড়াবার সত্যিকার অভিযাত্রা এই শুরু হলো বলে।

শেয়ার করুন