এবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের মুখে জামায়াতে ইসলামী

0
49
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হচ্ছে এবার। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শীঘ্রই অভিযোগপত্র দাখিল করতে যাচ্ছে প্রসিকিউশন। সূত্রমতে, দৈনিক সংগ্রামসহ জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের আবেদন থাকবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন ও সুপারিশ থেকে জামায়াতসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এখন পর্যালোচনা করছে প্রসিকিউশনের একটি টিম। জানা গেছে, গত মাসের শেষের দিকে ৩৭৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনসহ ৯ হাজার ৫৫৭ পৃষ্ঠার নথিপত্র প্রসিকিউশনে দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। একাত্তরে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধের জন্য জামায়াতে ইসলামী, এর তৎকালীন সহযোগী সংগঠন ও নেতা-কর্মীদের দায়ী করে সংশ্লিষ্টদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের সুপারিশ করে ওই সংস্থাটি। প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপসকান্তি বল বলেন, একাত্তরে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে জামায়াতে ইসলামী ও দৈনিক সংগ্রামসহ বেশকিছু সংগঠনকে। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে সর্বাত্দকভাবে কাজ করছে জামায়াতসংক্রান্ত মামলা পরিচালনায় গঠিত প্রসিকিউশনের একটি টিম। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র তৈরি করে শীঘ্রই তা দাখিল করা হবে ট্রাইব্যুনালে। সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামীর জন্ম, ইতিহাস, আদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মকৌশল-কর্মকাণ্ড, প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদিসহ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাংগঠনিক তৎপরতা, দলটির বিবৃতি ও দলটি সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ-নিবন্ধ এবং বই থেকে প্রাপ্ত দালিলিক প্রমাণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র। অভিযোগ প্রমাণের জন্য দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, চিকিৎসক, ধর্মীয় নেতা ও গবেষকদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সাক্ষী হাজির করা হবে ট্রাইব্যুনালে। এর আগে ২৭ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে নয় সহস াধিক পৃষ্ঠার নথিপত্র প্রসিকিউশনে দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। ওই প্রতিবেদনে গণহত্যাসহ সাত ধরনের অভিযোগ এনে জামায়াতের ব্যাপারে পেশ করা হয় সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতের হাইকমান্ড, ছাত্র শাখা, একাত্তরে জামায়াতের লিয়াজোঁ ও অপারেশন কমিটি এবং প্রপাগান্ডা। এসবের আওতায় পড়বে দলটির মজলিসে শুরা, ইসলামী ছাত্রসংঘ-শিবির, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও দৈনিক সংগ্রাম। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়- জামায়াতে ইসলামী, এর সহযোগী সংগঠন ইসলাম ছাত্রসংঘ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে গঠিত শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী এবং দলটির মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম অপরাধ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৪(১( ও (২) ধারা অনুযায়ী। এসব সংগঠনের নীতি, নীতিনির্ধারক ও সব নেতা-কর্মী এসব অপরাধে দায়ী। সূত্রমতে, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র এবং এসব অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতাসহ সাত ধরনের অভিযোগ রয়েছে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে প্রসিকিউশন টিম। তাই অভিযোগের ধরন ও সংখ্যায় হ্রাস-বৃদ্ধিও ঘটতে পারে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে। সূত্রমতে, তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে তথ্যের পর্যাপ্ততার বিষয়টিও পর্যালোচনা করে দেখছে প্রসিকিউটশন টিম। অর্থাৎ জামায়াতের ব্যাপারে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিচারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কি না? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করাই এখন প্রসিকিউশনের প্রথম কাজ। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়া হলে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে প্রসিকিউশন ও আসামি পক্ষে শুনানি হবে এরপর। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার। পরে সাক্ষ্য গ্রহণ। প্রসিকিউশনের পাশাপাশি সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ পাবে আসামি পক্ষও (জামায়াত)। উভয় পক্ষে যুক্তিতর্ক গ্রহণ শেষে আসবে রায়। তবে সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলটিকে কোনো দণ্ড দেওয়া যাবে কি না তা নিয়ে আইনগত ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়তে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডসহ আনুপাতিকহারে যে কোনো দণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে। এখানে এক অর্থে সংগঠনের কথা বলা হয়নি। এ কারণে অনেকে বলছেন, বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনের অভাবে জামায়াতে ইসলামী বা কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা যাবে না। প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা যায় বিদ্যমান আইনেই। এ ক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা অস্তিত্ব বিলোপই সংগঠনের ‘মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও মনে করেন তিনি। প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বলেন, জার্মানির ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দৃষ্টান্ত আছে আমাদের সামনে। এ অবস্থায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র তৈরির উদ্দেশ্যে পর্যালোচনা করা হচ্ছে তদন্ত প্রতিবেদন। দেখি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় জামায়াতের ব্যাপারে?

শেয়ার করুন