খরার কবলে বরেন্দ্রভূমি বোরোক্ষেত চৌচির, বিদ্যুত্ সংকটে চাষীরা

0
86
Print Friendly, PDF & Email

বিদ্যুত্ সঙ্কটে খরার কবলে পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের বোরো চাষ। ডিজেল পাম্পে বোরো ধানের জমিতে অতিরিক্ত খরচে সেচ দিতে গিয়ে উত্পাদন খরচ বাড়ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং-এর কারণে সময়মত সেচ দেয়া যাচ্ছে না। বোরো ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়েছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৫ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। ২ হাজার ৫০৯টি সেচ পাম্পের মাধ্যমে বোরো ধানের জমিতে সেচ দেয়া হয়। এর মধ্যে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন গভীর নলকূপ রয়েছে ৭১৯টি। প্রতিটি গভীর নলকূপসহ অধিকাংশ সেচ পাম্প বিদ্যুত্চালিত। কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় সময়মত বোরো ধানের জমিতে সেচ দেয়া যাচ্ছে না। একটানা ৫/৬ দিন সেচের পানি না থাকায় বোরো ধানের জমি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে।

কৃষকরা জানান, জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করার ২ সপ্তাহের মাথায় এ অঞ্চলের খরা বৃদ্ধি পায়। খরার কারণে প্রচণ্ড তাপমাত্রা দেখা দেওয়ায় বোরো ধানের জমিতে ২ থেকে ৩ বার সেচের প্রয়োজন হচ্ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং-এর কারণে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৫/৬ ঘন্টা সেচ পাম্প বন্ধ থাকছে। আর সেচ পাম্প চালু থাকলেও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ পাম্পগুলোতে কম পরিমাণে পানি উঠছে। ফলে সপ্তাতে একবার বোরো ধানের জমিতে সেচ দেয়া গেলেও ১ দিন পরেই বোরো ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলার কেশবপুরের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন সেচের অনিশ্চয়তার কারণে চলতি মৌসুমে মাত্র ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছে। আর ২০ বিঘা জমিতে ধানের পরিবর্তে গম ও ভুট্টা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত বছর ২৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেন। ভাল ফলন হলেও অতিরিক্ত সেচ ও সারের কারণে উত্পাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে করে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবার ধানের পরিবর্তে গম চাষ করে লাভবান হয়েছেন। মহিশালবাড়ীর কৃষক সাদিকুল ইসলাম ৭ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, জমিতে সেচের জন্য ২৪ ঘন্টায় সেচ পাম্পের কাছে বসে থাকেন। বিদ্যুতের লোডশেডিং-এর কারণে সময়মত জমিতে সেচ দিতে না পারায় বোরো ধানের চাষ নিয়ে চিন্তিত এই কৃষক।

এছাড়া ঘন ঘন লোডশেডিং-এর কারণে সেচ পাম্পে ট্রান্সফরমার ও মোটর পুড়ে নষ্ট হচ্ছে। মেরামত করতে গিয়ে বোরো ধানের জমিতে ১ সপ্তাহ সেচ দেয়া বন্ধ থাকছে বলে কৃষকরা জানান। এ প্রসঙ্গে বিএমডিএ গোদাগাড়ী জোন-১ সহকারী প্রকৌশলী শাহ মোহাম্মদ মুঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, গোদাগাড়ী উপজেলায় সেচ পাম্পগুলো বিদ্যুত্ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি ও পিডিপি। সেচ পাম্পগুলোতে প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয় না। ঘন ঘন লোডশেডিং-এর কারণেই মূলত সেচ পাম্পের ট্রান্সফরমার ও মোটর পুড়ছে। তবে ট্রান্সফরমার ও মোটর নষ্ট হওয়া মাত্রই মেরামত করা হচ্ছে।

পল্লীবিদ্যুত্ সমিতি কাকনহাট জোন সূত্রে জানা যায়, সেচ পাম্পে সার্বক্ষণিক ভাবে বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ মেগাওয়াট। সেক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। গোদাগাড়ী বিদ্যুত্ সরবরাহ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী কাছেদ আলী বলেন, সেচ পাম্পসহ আবাসিক ও অনাবাসিক বিদ্যুত্ গ্রাহক রয়েছে ১৬ হাজার। প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৮ মেগাওয়াট। সেক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে। তবে অধিকাংশ সময় এর চেয়েও কম বিদ্যুত্ পাওয়া যায়। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুত্ না পাওয়ায় সেচ পাম্প সচল রাখতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।

গোদাগাড়ী কৃষি কর্মকর্তা ড. সাইফুল আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ায় এ অঞ্চলে খরা প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ সেচের উপর নির্ভর করে বোরো চাষ হয়। বিদ্যুতের ঘাটতির সঙ্গে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ভূ-গভীরস্থ সেচ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হচ্ছে। সময়মত বোরো ধানের জমিতে সেচ দেয়া না গেলে ফলন ব্যাহত হবে। ধান চাষ করে লাভবান না হওয়ায় কৃষকরা বিকল্প ফসল চাষে ঝুঁকছে। এতে করে প্রতিবছর এ অঞ্চলে ধান চাষ কমছে। গোদাগাড়ী উপজেলায় গত বছরের চেয়ে এবার ৩ হাজার হেক্টর কম জমিতে বোরো ধান চাষ কম হয়েছে।

শেয়ার করুন