চরম অনিশ্চয়তার পথে গার্মেন্টস শিল্প

0
65
Print Friendly, PDF & Email

  ৯ মাস পার হলেও জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া অনিশ্চিত

  একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে

  সপ্তম দফা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

  কর্মসংস্থান হারিয়েছে ৫০ হাজার শ্রমিক

  কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে নতুন কোনো ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন না ক্রেতারা

কামাল উদ্দিন সুমন : কঠিন সময় পার করছে দেশের গার্মেন্টস খাত। একের  পর এক সংকট তৈরি হওয়ায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা রয়েছে চরম সংকটে। রফতানি আয়ে ৮০ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় তৈরি পোশাক শিল্পখাতে দেখা দিয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

সূত্র জানায়, গার্মেন্টস খাতের সংকটের পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। একদিকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, বন্দরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক পরিবেশের স্থায়ী উন্নতি না হওয়া, শ্রমিকদের মজুরি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানিমূল্য বৃদ্ধি না পাওয়া অপরদিকে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য নতুন নতুন শর্ত এখাতকে চরম অনিশ্চয়তা দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানায়, গার্মেন্টস খাতকে ধ্বংস করার জন্য দেশী বিদেশী চক্রান্তের পাশাপাশি ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার খবরদারি এবং সর্বশেষ সপ্তম দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করায় তৈরি পোশাক শিল্পকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, কারখানায় কাজের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার গত বছরের ২৭ জুন দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকা বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে। ইতোমধ্যে ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও জিএসপি চালু না হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রফতানির ওপর। আগামী ১৪ মে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ।

সূত্র জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের স্থগিত হয়ে যাওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) ফিরে পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে একটি শর্তের কারণেই। তা হলো সরকারের অনীহা এবং মালিকপক্ষের ঘোর আপত্তির কারণে আগামী ১০ বছরেও সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালুর শর্ত পূরণ হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা। তার ওপর ঘোষিত ১৬ শর্তের বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বেশকিছু নির্দেশনা, যেগুলো পূরণ করা সরকারের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব।

তবে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ একটি সেমিনারে জানিয়েছে, জিএসপি সুবিধা পাওয়ার জন্য সব ধরনের শর্ত মানা হয়েছে। নতুন নতুন শর্ত জুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন দেশের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

এদিকে দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। নতুন মজুরি কাঠামো আসার পর থেকে ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে শ্রমিক ছাঁটাই করছেন শিল্প মালিকরা। আবার ক্রেতাদের নির্ধারিত মানে উত্তীর্ণ হতে না পেরে এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কারখানা। ফলে বাড়ছে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়ে বেকার জীবন-যাপন করছেন।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, নতুন মজুরি কাঠামো-পরবর্তী শ্রমিক ছাঁটাই ও বর্তমানে কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা। আর নতুন নিয়োগ বন্ধ থাকায় তাদের অধিকাংশই চাকরি পাচ্ছেন না। পুরো প্রক্রিয়ায় বর্তমানে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।

সূত্র জানায়, কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে গত এক বছরে প্রায় ৫০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। সম্প্রতি বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে আছে ঢাকার সফটেক্স, আউটরাইট, কোস্ট টু কোস্ট, বেঙ্গল, ফেম অ্যাপারেল ও লিবার্টি। বিজিএমইএর কাছে এ ধরনের ২০টি কারখানার তালিকা রয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে আরো ছয়টি কারখানার শ্রমিকদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে  ইউরোপীয় ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড। এ কারখানাগুলো হলো ফোর উইং লিমিটেড, টেরি প্রাইভেট লিমিটেড, অল ওয়েদার ফ্যাশন, এলিগেন্ট, লিবাস টেক্সটাইল এবং চট্টগ্রামের মেনস অ্যাপারেল।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি অ্যাকর্ড কারখানা ভবনের অগ্নি ও স্থাপত্য নিরাপত্তা পরিদর্শন শেষে রাজধানীর মিরপুরের মোল্লা টাওয়ারে অবস্থিত সফটেক্স, ফেম ও ডায়মন্ড নামের তিনটি কারখানার উৎপাদন স্থগিত হয়। এর মধ্যে সফটেক্স কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক।

এদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে তারা মোটেও সন্তুষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন অ্যাকর্ডের পক্ষ থেকে প্রতিটি কারখানায় চলমান নিñিদ্র পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে আসছে নিরাপত্তাজনিত ত্রুটির পাহাড়। বন্ধ হয়ে যাওয়া জিএসপি চালুর জন্য সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালুর মার্কিন শর্ত দিতে হবে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি এসএম মান্নান কচি বলেন, গভীর সংকটে রয়েছে গার্মেন্টস খাত। ষড়যন্ত্রও চলছে। মূল্যায়নের লক্ষ্যে পরিদর্শন কার্যক্রমে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ আতঙ্কে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দিতে সাহস করছেন না মালিকরা। আমাদের আশঙ্কা, আরো অনেক কারখানা এ প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে যাবে। মালিক-শ্রমিক দুইপক্ষের জন্য আরো সংকট ঘনিয়ে আসছে।

তিনি বলেন,আমরা আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলাম যে, মূল্যায়ন কার্যক্রমে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এখন ঠিক তাই হচ্ছে। এতে আইন মেনেই শ্রম সমস্যা সমাধান করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মালিকরা একেবারে পথে বসে পড়বেন। কমপ্লায়েন্স ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্রেতারা নতুন কোনো ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন না

বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, তৈরি পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নতির নামে একটি গোষ্ঠী পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে। এখনই তা রুখতে না পারলে শিল্পটির পতন অনিবার্য।

তিনি বলেন, আমরা কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত করার বিষয়ে প্রতিশ্রতি। তবে এ জন্য সময় দিতে হবে। অনেক কারখানা আছে যারা ২০ বছর ধরে কাজ করছে। এখন তাদের ২০ ঘণ্টা সময় দিলে তো হবে না। চুক্তি অনুযায়ী জোটের পরিদর্শন শেষে সংস্কারের পরিকল্পনা দেয়ার কথা, তারপর সময় দিয়ে সেগুলোর উন্নতি করতে হবে। সে জন্য তহবিল দেয়ার কথা। এসব না করে তারা কথার বাইরে যাচ্ছে। কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে।

এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, আমাদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিশ্চয়ই বায়ারদের কাছে আমাদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরে পাওয়া।

তিনি বলেন, যেসব বায়ার বাংলাদেশে আসতে না পেরে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় চলে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, বন্দরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক পরিবেশের স্থায়ী উন্নতি না হওয়া, শ্রমিকদের মজুরি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানিমূল্য বৃদ্ধি না পাওয়া, সর্বশেষ সপ্তম দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি তৈরি পোশাক শিল্পের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

শেয়ার করুন